Flash Flood

ভূমিকম্প নয়, হিমবাহধসেই নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান! মৃত ১৬২ জন, নিখোঁজ ৪৬৮ পর্যটক, বাড়ছে উদ্বেগ

বুধবার রাতে সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, প্রাথমিক ভাবে যে ভূতাত্ত্বিক কম্পনকে ভূমিকম্প বলে মনে করা হয়েছিল, তা আসলে হিমবাহধসের ফল। হিমবাহের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদামাটি নদীর অববাহিকার দিকে নেমে আসার ফলেই এই বিপর্যয় ঘটে বলে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দাবি ইউএসজিএসের।

নেপালে হড়পা বান।
নিজস্ব সংবাদদাতা, নেপাল
  • শেষ আপডেট: ২৭ আগস্ট ২০২৬ ১১:৪৯

ভূমিকম্পের কারণে নয়, বরং হিমবাহধস থেকেই নেপালের ভোটেকোশী নদীতে ভয়াবহ হড়পা বান হয়েছিল বলে মনে করছে আমেরিকার ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইউনাইটেড স্টেটস জিয়োলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস)। বুধবার রাতে সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, প্রাথমিক ভাবে যে ভূতাত্ত্বিক কম্পনকে ভূমিকম্প বলে মনে করা হয়েছিল, তা আসলে হিমবাহধসের ফল। হিমবাহের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদামাটি নদীর অববাহিকার দিকে নেমে আসার ফলেই এই বিপর্যয় ঘটে বলে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দাবি ইউএসজিএসের।

অন্য দিকে, নেপালের ভোটেকোশী নদীতে হড়পা বানের জেরে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১৬২ হয়েছে। নেপালের সংবাদমাধ্যম ‘কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখনও বহু মানুষের কোনও খোঁজ মেলেনি। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ৪৬৮ জন পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন নেপালের পর্যটন দফতরের মুখপাত্র সুরজ ঘিমিরে। সংবাদসংস্থা এএফপি জানিয়েছে, নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে ৩৯৩ জন বিদেশি নাগরিক এবং ৭৫ জন নেপালি। বিদেশিদের মধ্যে ১৪১ জন ভারতীয়, যাঁদের ৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয়। নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। ‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর দাবি, তাঁরা সকলেই কৈলাস-মানস সরোবর দর্শনের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। এ দিকে, সংবাদসংস্থা এপি চিনের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, হড়পা বানের প্রভাবে চিনের তিব্বতেও তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। সেখানে এখনও অন্তত ৫৫৮ জনের খোঁজ মিলছে না।

হড়পা বানে নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুয়া জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তুলনায় কম হলেও নুয়াকোট ও ধারিং জেলাতেও বিপর্যয়ের খবর মিলেছে। প্রবল কাদামাটির স্রোতে নেপাল সীমান্ত সংলগ্ন তিব্বতের স্থলবন্দর জিরঙেও ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। নেপালের সংবাদমাধ্যমের একাংশের আশঙ্কা, আগামী ২৪ ঘণ্টায় মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার দূরে রাসুয়া জেলায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। তিব্বত থেকে নেপালে ঢুকে এই জেলার মধ্য দিয়ে বয়ে গিয়েছে ভোটেকোশী নদী। বুধবার সকাল সাড়ে আটটার কিছু পর আচমকাই নদীর জলস্তর দ্রুত বাড়তে শুরু করে। স্থানীয় প্রশাসনের প্রাথমিক অনুমান, তিব্বতের দিক থেকেই বন্যার জল নেপালে ঢুকেছে। চিন সীমান্তের কাছে তিমুর ও স্যাব্রুবেসী এলাকাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর। রাসুয়ার জেলাশাসক নগেন্দ্র পারিয়ার রয়টার্সকে জানিয়েছেন, বেশ কয়েকটি গ্রামীণ এলাকা জলের তোড়ে ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, বিপুল সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি ব্যাপক প্রাণহানিও হয়ে থাকতে পারে। এ দিকে, নেপাল পার্লামেন্টে সে দেশের বিদেশমন্ত্রী শিশির খনাল জানিয়েছেন, বুধবার সকাল আটটা ৩৭ মিনিট নাগাদ একটি ভূমিকম্প হয়। এর পরেই তুষারধস এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে হড়পা বান নামে। ফলে আচমকা বিপর্যয়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

ইউএসজিএস জানিয়েছে, বুধবার সকাল আটটা ৩৭ মিনিটে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে কোনও ভূমিকম্প হয়নি। যে ঘটনাকে প্রথমে ৪.৪ মাত্রার ভূকম্পন বলে মনে করা হয়েছিল, সেটি আসলে ছিল হিমবাহধসের জেরে সৃষ্টি হওয়া কাদামাটির প্রবল স্রোত। ভূবিজ্ঞানীদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তুষারধসের ফলে পাথর ও বরফের বিশাল স্তূপ নদীর গতিপথ আটকে দেয়। পরে জমে থাকা জলের তীব্র চাপে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ আচমকাই ভেঙে গেলে ভয়াবহ হড়পা বানের সৃষ্টি হয়।

নেপালে প্রবেশের পর ভোটেকোশী নদী ত্রিশুলি নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এই দুর্যোগের জেরে ত্রিশুলি নদী সংলগ্ন এলাকাগুলিতেও স্থানীয় প্রশাসন সতর্কতা জারি করেছে। নেপালের দুর্যোগ মোকাবিলা দফতর রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং, চিতওয়ান ও গোর্খা জেলার নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি নদীর ধারের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

২০১৯ সালের এক গবেষণায় হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে হিমবাহ ভেঙে হড়পা বানের আশঙ্কা নিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। গবেষণায় বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে প্রতি বছর হিমালয়ের হিমবাহগুলিতে দেড় ফুটেরও বেশি বরফ গলে যাচ্ছে। ভারত, চিন, নেপাল, ভুটান এবং চিন-অধিকৃত তিব্বতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রায় ৪০ বছর ধরে উপগ্রহের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি করা হয়েছিল। পরে তা ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৯৭৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত হিমালয়ের হিমবাহগুলি যে হারে গলছিল, ২০০০ সালের পর সেই হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই তিব্বতের মানস সরোবরের কাছে আনসি হিমবাহ থেকে উৎপন্ন ইয়ারলুং সাংপো নদীর নিম্ন অববাহিকায় চিনের বৃহৎ বাঁধ নির্মাণ ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তিব্বত পেরিয়ে ভারতে ঢোকার পর ইয়ারলুং সাংপোর নাম ব্রহ্মপুত্র এবং বাংলাদেশে প্রবেশের পর তা যমুনা নামে পরিচিত। ফলে হিমবাহ ভেঙে হড়পা বান নেমে এলে এবং তার প্রভাবে চিনের বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভারত ও বাংলাদেশেও ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।


Share