Terrorism

বাংলাদেশে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে আল কায়েদার জঙ্গি! এনআইয়ের তালিকায় ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’, সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে দাবি হাসিনা-পুত্রের

সজিব ওয়াজেদ জানিয়েছেন, গত ২০২৩ সালে ঢাকার মাদারটেক এলাকা থেকে ইক্রামুল হক এবং তার স্ত্রী ফারিয়া পারভিনকে গ্রেফতার করা হয়। ১৬ দিন হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

ইসলামিক জঙ্গি ইক্রামুল হক (৩৩)।
নিজস্ব সংবাদদাতা, বাংলাদেশ
  • শেষ আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬ ০১:৫৮

বাংলাদেশে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ নেতা। সমাজমাধ‍্যমে পোস্ট করে এমই অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজিব ওয়াজেদ। বিষয়টি সম্পূর্ণ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ হলেও ভারতের জন‍্য যথেষ্ট উদ্বেগজনক বলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলি মনে করছে।

হাসিনা-পুত্র সজিব ওয়াজেদ যে ইসলামিক জঙ্গির নাম করেছে তার নাম ইক্রামুল হক (৩৩)। ইক্রামুল ইসলামিক জঙ্গি সংগঠন আল কায়েদা-উপমহাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা। ইক্রামুল বাংলাদেশের ময়মনসিংহের বাসিন্দা। জানা গিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য ২০১৮ সালে উত্তরপ্রদেশের দেওবন্দে এসেছিল। সেখানেই ইসলামিক জঙ্গি সংগঠন আল কায়েদার মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়। পরবর্তীতে উপমহাদেশে আল কায়েদা ইন সাব কন্টিনেন্ট (আকিস)-এর নিয়োগ বা ‘দাওয়া’ বিভাগের প্রধান হয়ে ওঠে। কোচবিহারের দিনহাটার এক দম্পতিকে বাবা-মা পরিচয় দিয়ে ভারতীয় নথি থেকে শুরু করে ভারতীয় পাসপোর্টও বানায়। জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)-র তদন্ত রিপোর্ট বলছে, ইক্রামুল পশ্চিমবঙ্গে প্রায় দু’বছর ছিলেন। তার মধ্যেই মধ্যপ্রদেশ থেকে শুরু করে গুজরাত পর্যন্ত একাধিক স্লিপার সেল এবং মডিউল তৈরি করেন।

গোয়েন্দাদের দাবি, ইসলামি জঙ্গি মডিউলের কয়েক জন গ্রেফতারও হয়েছিল। তার পরে ধরা পড়ার ভয়ে গত ২০২২ সালে চোরাপথে ইক্রামুল বাংলাদেশে পালায়। ঘটনাটি বাংলাদেশের হলেও ভারতের নিরাপত্তা জন‍্য যথেষ্ট উদ্বেগজনক বলে গোয়েন্দারা মনে করছে। এনআইএয়ের এক কর্তার কথায়, ইক্রামুল ওরফে আবু তালাহ ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় রয়েছে। এ দেশে অন্তত ১০টা জঙ্গি কার্যকলাপ সংক্রান্ত মামলায় সে অভিযুক্ত রয়েছে। ইক্রামুলের পাঁচটি ছদ্মনাম রয়েছে। তা হল— আবু তালহা, মৌলানা সাবেত, নুর হোসেন, মনসুর এবং মিলন। পাঁচটি মুখোশ, কিন্তু মানুষ একজনই।

শুধু ইক্রামুল নয়, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনাপ্রবাহ ভারতীয় গোয়েন্দাদের কপালের ভাঁজ ফেলেছে। অন‍্য দিকে, রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের আন্তর্জাতিক জঙ্গি এবং সন্ত্রাসবাদীদের কার্যকলাপে নজরদারি কমিটির রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশকে ব্যবহার করে আল কায়েদা- উপমহাদেশ তাদের সংগঠন বিস্তারের চেষ্টা করছে। চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে এই রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এই রিপোর্টকে গোয়েন্দারা কার্যত মেনে নিচ্ছেন।

রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের রিপোর্টে বলা হয়েছে, মূলত আফগানিস্তানের মাটি থেকেই তাদের সংগঠন পরিচালনা করছে আল কায়েদা-উপমহাদেশ। পুরনো দোসর জামাতুল মুজাহিদিন-বাংলাদেশ (জেএমবি)-র মতো সংগঠনকে অর্থ এবং অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহ করে চাঙ্গা করতে চাইছে। এর দ্বারা নিজেদের সংগঠন বিস্তার করতে চায় তারা। গত বছর নভেম্বর মাসে লালকেল্লার সামনে একটি গাড়ি বিস্ফোরণে ১০ জনের মৃত্যু হয়। সেই ঘটনার নেপথ্যে আল কায়েদা-উপমহাদেশ রয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, কী ভাবে তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম জঙ্গি সংগঠন হিসেবে উঠে আসছে। ছোট ছোট সেল বা মডিউল তৈরি করে গোটা সংগঠনকে বিকেন্দ্রীকরণ করা হচ্ছে। ফলে পশ্চিম এবং পূর্ব দুই সীমান্ত থেকেই ভারতের আশঙ্কা বাড়ছে। গত ২০১৬ সালে আমেরিকার পররাষ্ট্র দফতর আল কায়দার এই শাখাটিকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।

সজিব ওয়াজেদ জানিয়েছেন, গত ২০২৩ সালে ঢাকার মাদারটেক এলাকা থেকে ইক্রামুল হক এবং তার স্ত্রী ফারিয়া পারভিনকে গ্রেফতার করা হয়। ১৬ দিন হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরবর্তীতে ইক্রমুলকে কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়। অগস্টে ক্ষমতা হারান হাসিনা। আর ১০ অক্টোবর জামিন পান ইক্রামুল। তার পর থেকেই তিনি বেপাত্তা। সবুজবাগ থানায় দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় অভিযুক্ত এই ইক্রামুল হক।

ইক্রামুল ২০০৭ সালে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার অধীনে হিফজ পরীক্ষায় সারা দেশে প্রথম হয়েছিল। বাংলা, উর্দু, আরবি এবং ইংরেজি— চারটি ভাষাতেই তার দখল রয়েছে। প্রযুক্তিতেও ইক্রামুল দক্ষ। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমকে তাঁর বাবা জানিয়েছেন, ছেলে নারায়ণগঞ্জের কোনও মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করত। সে দেশের পুলিশের কাছেও এটুকুই খবর। কিন্তু এর থেকে বেশি তথ্য তারা দিতে পারেনি। ২২ মাস ধরে ইক্রামুলকে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি করা হয়েছে।

বাংলাদেশের এই সংগঠনটির শাখা হিসেবে পরিচিত আনসার-আল-ইসলাম নতুন কোনও নাম নয়। আফগানিস্তানের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শুরু করে ঝালকাঠিতে বিচারক হত্যাকাণ্ড এবং শেখ আবদুর রহমানের মৃত্যুদণ্ড— বাংলাদেশের একাধিক সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের ঘটনার সঙ্গে আল কায়দার দীর্ঘ ছায়া জড়িয়ে থাকার অভিযোগ রয়েছে।

এ দেশে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের দাবি, ইক্রামুল একা নয়, হাসিনা সরকারের পতনের পরে সরাসরি জঙ্গি কার্যকলাপে যুক্ত ৩৭০ জন জামিন পেয়েছে। এদের মধ্যে আনসার-উল-বাংলা টিমের মতো ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা মুফতি জসিমুদ্দিন রহমানি যেমন রয়েছে, তেমনই জামাতুল মুজাহিদিন-বাংলাদেশ সংগঠনের ১৮৫ জন নেতা-কর্মী রয়েছে। তারা প্রায় প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে গোয়েন্দারা দাবি করছে।

গত বছর ২৬ এবং ৩১ জুলাই আশুলিয়া এবং ঢাকার মোতিঝিল এলাকা থেকে দু’টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইম্প্রোভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) উদ্ধার হয়। ওই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত সন্দেহে যাকে গ্রেফতার করা হয়, সে ইসলামিক জঙ্গি সংগঠন জেএমবি-র কর্মী। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা শহরের একটি মাদ্রাসায় আইইডি বিস্ফোরণ ঘটে। তদন্তে দেখা যায়, সেখানে রীতিমতো আইইডি তৈরির কারখানা চলছিল।

বাংলাদেশ সীমান্তকে সুরক্ষিত করতে গত কয়েক বছর ধরেই কেন্দ্রীয় সরকার সক্রিয়। রাজ্যে পালাবদলের পর সেই তৎপরতা বেড়েছে। বারে বারে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রাজ্যে আসছেন। অন্য দিকে, এর মধ্যেই বাংলাদেশে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং (আরএডব্লিউ বা ‘র’) প্রধান পরাগ জৈন-সহ চার আধিকারিকের ঢাকা সফরে যান। বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। বাংলাদেশ এই সফর রুটিন বলে দাবি করেছে। তবে ভারতীয় গোয়েন্দাদের ইঙ্গিত, বাংলাদেশের বর্তমান জঙ্গি তৎপরতার বিষয়টিও এই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।

হাসিনা-পুত্র সজিব ওয়াজেদের বক্তব্য, “এই সমস্ত মামলার ফাইলে বর্তমানে ধুলো জমছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বাংলাদেশ জঙ্গি কার্যকলাপের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সেই সময় দেশের শাসনে যে রাজনৈতিক শক্তি ছিল তারাই এখন আবার ক্ষমতায়। সেই সময়ের হেফাজতে মৃত্যু, হত্যাকাণ্ড এবং ধারাবাহিক বোমা হামলার স্মৃতি এখনও তাজা। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলেই জঙ্গি নেটওয়ার্কের শিকড় বাংলাদেশে শক্ত হয়েছিল। আর এখন, ২০২৬ সালে, সেই একই রাজনৈতিক পরিসর ফের রাষ্ট্রক্ষমতায়।”

তাঁর আরও বক্তব্য, ইকরামুলের নিখোঁজ হওয়ার খবরকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে নাকি নিখোঁজ হওয়া ঘটনা শুধুই একটি ফাইল নম্বর হয়ে থাকবে? সজিবের এ-ও অভিযোগ, “এই ধরনের ‘অসহায়তা’ স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন তুলতে পারে— ক্ষমতার অলিন্দের কাছাকাছি থাকা কেউ কি এই পলাতক জঙ্গি নেতাকে আশ্রয় বা সুরক্ষা দিচ্ছে?”


Share