Land Scam

কেউ কিনত জমি, কেউ দিত হুমকি, ছাতার মতো আগলে রাখতেন শান্তনু সিংহ বিশ্বাস, জমি দখল মামলায় বড়সড় ষড়যন্ত্রের দাবি করল ইডি

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘনিষ্ঠ কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার শান্তনু সিংহ বিশ্বাসের দাবি, তিনি বিশ্বজিৎ পোদ্দার ওরফে সোনা পাপ্পুকে চেনেন না। পাঁচ বার ডাকার পরেও তিনি ইডির দফতরে যাননি। ধৃত শান্তনু সিংহ বিশ্বাসের দাবি, তিনি সরকারি কর্মী। তাই তিনি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি না নিয়ে তিনি যেতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে তাঁর কোনও দোষ নেই।

কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার শান্তনু সিংহ বিশ্বাস।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১৫ মে ২০২৬ ১০:২২

বেআইনি ভাবে জমি দখল মামলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘনিষ্ঠ কলকাতা পুলিশের প্রভাবশালী ডেপুটি কমিশনার শান্তনু সিংহ বিশ্বাসকে গ্রেফতার করেছে ইডি। তদন্তকারীরা জানতে পেরেছে, জমি দখলে বড়সড় চক্র হিসেবে কাজ করা হয়েছে। গোটা চক্রকে ‘ছাতার মতো’ আগলে রেখেছিলেন এই শান্তনু সিংহ বিশ্বাস।

বুধবার রাতে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পরে রাজ‍্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ শান্তনু সিংহ বিশ্বাসকে গ্রেফতার করে ইডি। বেআইনি জমি দখল মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে তাঁকে ইডির বিশেষ আদালতে হাজির করানো হয়। এ দিন ইডি আদালতকে শান্তনুর বিরুদ্ধে একাধিক বিস্ফোরক অভিযোগ করেছে।

ইডির বক্তব্য, এটা একটা সংগঠিত অপরাধ। কীভাবে হয়েছে, তা ব‍্যখ‍্যা করতে গিয়ে তদন্তকারীরা জানায়, এই অপরাধের মূলত তিনটি স্তর রয়েছে। এক, জয় কামদার এবং তাঁর দলবলের কাজ ছিল টাকা জোগাড় করা। তা দিয়ে কলকাতা-সহ রাজ‍্যজুড়ে জমি কেনা হয়েছে। দুই, সোনা পাপ্পু এবং তাঁর দলবল ‘নিরিহ’ জমির মালিকদের ভয় দেখাতো। তিন, পুলিশের কাজ ছিল দুষ্কৃতীদের রক্ষা করা।

ইডি আদালতকে জানিয়েছে, কোথাও কোনও একটা জমি রয়েছে, সেখানে ধৃত জয় কামদারের লোকেরা পৌঁছে যেত। জমির মালিককে বোঝানো হত। তার পরে চুক্তি করত। সেই চুক্তি জাল বলেই মনে করা হচ্ছে। তার পরে জমির মালিককে ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা নিত। নির্ধারিত বাজার দরের জমির দামের চেয়ে কমেই তা দখল করা হত। জমি কেনার প্রাথমিক টাকা জয় কামদার জোগাড় করত।

এটা পুলিশের একটি শ্রেণি এবং দুষ্কৃতীদের সরাসরি যোগসাজশে করা হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। অভিযোগ, থানায় ডেকে নিরিহ জমির মালিকদের ভয় দেখানো হত। মানসিক ভাবে তাঁদের হেনস্থা করা হত। এমনকী, বেশ কিছু থানাতে এই নিরিহ জমির মালিকদের বিরুদ্ধে মামলাও করেছে জয় কামদার। তার পরে সোনা পাপ্পু এবং তাঁর দলবল জমির মালিকদের জমি হস্তান্তর হওয়ার পরে ভয় দেখাত। চাপ দেওয়া হত। জমি হস্তান্তর হলেই সোনা পাপ্পুর কাছে টাকা পৌঁছে যেত। এই কাজে থানার কিছু ওসিদের ভূমিকা রয়েছে বলে জানিয়েছে ইডি। কোনও পুলিশ আধিকারিক যাতে শান্তনু সিংহ বিশ্বাসের গ‍্যাং-এর কাজে বাধা সৃষ্টি না করে, সেই কারণেই নিজের পছন্দের আধিকারিকে থানায় বদলি করানো হত। বদলে টাকা নেওয়া হত। সারা রাজ‍্যে শান্তনু সিংহ বিশ্বাস এটাই করত। কারণ তিনি পুলিশ ওয়েলফেয়ার বোর্ডের আহ্বায়ক ছিলেন। তিনি এই অপরাধের সিন্ডিকেটকে ‘ছাতার মতো’ আগলে রেখেছিলেন বলেই ইডি দাবি করেছে। সমস্ত থানার ওসিদের তিনিই নিয়ন্ত্রণ করতেন।

ইডি আরও জানিয়েছে, যে জমিতে নির্মাণকাজ কাজ হত, সেখানে নির্মাণ সামগ্রী বরাতের জন্য স্থানীয় সিন্ডিকেটের ওপরে নির্ভর করা হত। এই ক্ষেত্রে বেশ কিছু তৃণমূল কাউন্সিলর জড়িত থাকার কথা আদালতকে জানিয়েছে ইডি। সেক্ষেত্রে একটা টাকাও পৌঁছে দেওয়া হত। এ ভাবে কোটি কোটি টাকা প্রতারণা করা হয়েছে। অপরাধ করতে পুলিশের ক্ষমতাকে ব্যবহার করা হয়েছে বলেই আদালতকে ইডি জানিয়েছে।

শান্তনু সিংহ বিশ্বাস সাব-ইন্সপেক্টর থেকে ডেপুটি কমিশনার হয়েছেন। কালীঘাট খানায় দীর্ঘদিন ওসি ছিলেন। তিনি এখন কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার রয়েছে। কর্মজীবন শেষ হওয়ার পরেও তাঁকে রাখা হয়েছে। ইডির দাবি, তিনি যথেষ্ট প্রভাবশালী। তঁকে যথন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তখন তিনি কোনও প্রশ্নের উত্তর দেননি। কার্যত সব প্রশ্নই এড়িয়ে গিয়েছিলেন। তাঁকে জামিন দেওয়া ঠিক হবে না। তিনি তথ‍্যপ্রমাণ নষ্ট করতে পারেন। তাই তাঁকে ছাড়া ঠিক হবে না।

যদিও, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘনিষ্ঠ কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার শান্তনু সিংহ বিশ্বাসের দাবি, তিনি বিশ্বজিৎ পোদ্দার ওরফে সোনা পাপ্পুকে চেনেন না। পাঁচ বার ডাকার পরেও তিনি ইডির দফতরে যাননি। ধৃত শান্তনু সিংহ বিশ্বাসের দাবি, তিনি সরকারি কর্মী। তাই তিনি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি না নিয়ে তিনি যেতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে তাঁর কোনও দোষ নেই।

আদালত দু’পক্ষের সওয়াল-জবাব শোনার পরে প্রভাবশালী কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার শান্তনু সিংহ বিশ্বাসকে আগামী ২৮ মে পর্যন্ত ইডি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে।


Share