BJP And Land Mafia Ramesh Mahato

অ‍্যাম্বুলেন্সে করে বাড়ি ফিরবেন দেবেশ-রমেশ! হুঁশিয়ারি বিধায়কের, বিজেপির কেউ নয়, কড়া হুঁশিয়ারি শমীকের

প্রসেনজিৎ বাগ বলেন, “কিছু বিজেপির কর্মী ওর সাথে গিয়েছে। তবে তাঁরা এখন আর বিজেপির সঙ্গে জড়িত নয়। এর পরেও যদি তাঁরা যায়, মানুষ তাঁদের মতো বুঝবে। দলকে বিষয়টি জানিয়েছি। দল দলের মতো করে দেখবে। প্রশাসন তাঁদের মতো করে বুঝবে।”

জমি মাফিয়া রমেশ মাহাতো।
নিজস্ব সংবাদদাতা, জাঙ্গিপাড়া
  • শেষ আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:৫৫

দেবেশ কোলে এর পর কোথাও সভা করলে অ‍্যাম্বুলেন্সে করে ফিরবেন। এমনই হুঁশিয়ারি দিলেন জাঙ্গিপাড়ার বিজেপি বিধায়ক প্রসেনজিৎ বাগ। যদিও দেবেশ কোলের বক্তব্য, তিনি বিধায়কের কথার কোনও জবাব দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন না। আগামী দিনেও অনেক সভা তিনি করবেন বলে জানিয়েছেন। দেবেশ কোলের নাম না করে রাজ‍্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, তিনি দলের কেউ নন।

একাধিক খুন, তোলাবাজির মামলায় অভিযুক্ত জমি মাফিয়া রমেশ মাহাতোর বিজেপিতে যোগ নিয়ে রাজনৈতিক তরজা হুগলিতে চরমে উঠেছে। জাঙ্গিপাড়ার বিজেপি বিধায়ক প্রসেনজিৎ বাগের বৃহস্পতিবারের মন্তব‍্যের পরে তাতে আরও মাত্রা যোগ করেছে। তাঁর বক্তব্য, দেবেশ কোলে কোনও দিনই বিজেপিতে ছিলেন না। বিজেপিতে গোষ্ঠী কোন্দল বাধাতে দেবেশ ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তার জন‍্য টাকা লাগে। টাকার সমর্থন পেতে রমেশ মাহাতোকে নিয়ে ঘুরছেন।

বৃহস্পতিবার প্রসেনজিৎ বলেন, “জাঙ্গিপাড়ায় সংখ‍্যাগরিষ্ঠ মানুষ তপশিলি জাতির। এখানে নেশার দ্রব্য বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তাই নতুন করে গাঁজা, চরস, আফিম কোথায় বিক্রি করবেন বলে মার্কেট খুঁজতে এলাকায় দেবেশ কোলে আর রমেশ মাহাতো যাচ্ছেন। এতে দলের কোনও সম্পর্ক নেই।” কিন্তু ব‍্যক্তি সেখানে জড়িয়ে পড়েছেন। সেটা তিনি দলকে জানিয়েছেন বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, “দেবেশ কোনও দিনই বিজেপি করেননি। প‍্যাড ছাপিয়েছেন। স্ট‍্যাম্প তৈরি করেছেন। মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন। বিজেপির সাথে বিজেপির গোলমাল লাগাতেই তিনি এদিক ওদিক ঘুরছেন।”

বিজেপি বিধায়কের অভিযোগ, এই সমস্ত সভা সমিতি করার জন‍্য কয়েক জনের কাছ থেকে টাকা চেয়েছেন রমেশ মাহাতো। তিনি বলেন, “আমি খবর পেয়েই এ সব বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছি। আমি বিধানসভায় ছিলাম। সেই সময় খুড়িগাছিতে আমাকে চমকাতে রমেশকে নিয়ে সভা করছে। ৫৪টি গাড়ি আর বাউন্সার নিয়ে সভা করেছে।”

এর পরেই বিজেপি বিধায়ক হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “ক্ষমতা থাকলে দেবেশ-রমেশ-হাফিজুরেরা আমায় জানিয়ে আমার বিধানসভার কোথাও সভা করুক, মানুষ ঠিক উত্তর দিয়ে দেবে। কারণ মানুষ লুঠ, তোলাবাজির বিরুদ্ধে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। তিনি (দেবেশ কোলে) দাবি করেছেন— তাঁকে নাকি দিল্লি পাঠিয়েছে। এখন মানুষ বুঝে গিয়েছে, তিনি কে। ও (দেবেশ কোলে) যে বিজেপির কেউ না তা মানুষ বুঝে গিয়েছে। এর পরে যেখানে যাবেন, জেনে রেখে দিন, মানুষ তৈরি আছে। হয় তো তিনি যাবেন গাড়ি করে, ফিরবেন হয়ত অ‍্যাম্বুলেন্সে করে।”

তিনি আরও বলেন, “কিছু বিজেপির কর্মী ওর সাথে গিয়েছে। তবে তাঁরা এখন আর বিজেপির সঙ্গে জড়িত নয়। এর পরেও যদি তাঁরা যায়, মানুষ তাঁদের মতো বুঝবে। দলকে বিষয়টি জানিয়েছি। দল দলের মতো করে দেখবে। প্রশাসন তাঁদের মতো করে বুঝবে।”

এখন কলকাতা-কে দেবেশ কোলের অ‍্যাম্বুলেন্সে করে ফেরার ‘সৌভাগ্য’ হয়নি বলে দাবি করে বলেন, “আমারা বহুবার অ‍্যাম্বুলেন্সে করে গিয়েছি। যখন বিরোধীতে ছিলাম অনেক বার আমাদের কর্মীরা অ‍্যাম্বুলেন্সে করে গিয়েছেন।” স্থানীয় বিজেপির বিধায়ককে নজিরবিহীন আক্রমণ করে দেবেশ বলেন, “প্রসেনজিতের সঙ্গে আবার আলোচনা করার ইচ্ছেও নেই। ওর যোগ‍্যতা কতটুকু? যতটুকু যোগ্যতা ততটুকুই তিনি বক্তব্য রাখবেন। ওটা আমাদের দলীয় বক্তব্য নয়। বরং বিধায়কের ব‍্যক্তিগত বক্তব্য। তিনি নিজে যা সেটাই বলবেন। আমি নিজেকে ছোট করতে পারব না। দলকে ছোট করতে পারব না। আরএসএসকে ছোট করতে পারব না।”

মদ-গাঁজা বিক্রির প্রসঙ্গে দেবেশের বক্তব্য, এর জবাব রমেশ মাহাতোই দিতে পারবেন। তিনি নিজেকে রমেশের প্রতিনিধি নন বলে দাবি করেছেন। দেবেশের দাবি, রমেশ মাহাতো (জমি মাফিয়া) সিপিএম আমলে গত ২০০১ সালে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। রমেশ নাকি বিজেপির হয়েই কাজ করে গিয়েছেন। এমনকী, করোনাকালে রমেশ মাহাতো যা কাজ করেছেন, সেটাও নাকি বিজেপির কর্মী হিসেবে তিনি করতে পারিনি। রমেশ নাকি মানুষের বাড়ি বাড়ি চাল পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি বলেন, “এখন সমক্ষে এসেসছেন বলে সবার গাত্রদাহ হচ্ছে। কী কারণে হয়েছে তা রমেশ বাবু আর বিধায়ক জানেন। আমরা সমাজসেবার কাজ করি। প্রসেনজিৎ বাগ আমাদের দলেরই। আমি গোষ্ঠীদন্দের পক্ষে নই। আমি আলোচনার মধ‍্যে দিয়ে সমাধানের পক্ষে। আমি আগামীতেও অনুষ্ঠান করব। তাই বিধায়কও আসতে পারেন। তাঁকেও এই কাজে স্বাগত জানাব।”

উল্লেখ্য, ১৯৮৪ সালে রমেশ মাহাতোর উত্থান হয়। তিনি আদতে হাওড়ার বালির বাসিন্দা। তাঁর বালির বাড়িতে আগ্নিকান্ডের ঘটনায় তৎকালীন শাসকদল সিপিএম কর্মীদের নাম জড়ায়। তার পরে গা ঢাকা দেয় রমেশ। সাত দিন পর ফিরে এসে তার বদলা নেয় রমেশ। দুই ব‍্যক্তিকে খুনের ঘটনায় নাম জড়ায় রমেশের। তারপর থেকেই হাওড়া-হুগলির অপরাধ জগতে রমেশের প্রবেশ করেন। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার জমির ওপরেই তার প্রধান লক্ষ্য ছিল। জেকে স্টিল, শ্রী দুর্গা কটন মিল-সহ বেশ কয়েকটি কারখানায় লুটের ঘটনা নাম জড়িয়েছিল রমেশ মাহাতোর।

এ ছাড়াও, হাওড়ায় লোহার ছাঁটের কারবারও সে নিয়ন্ত্রণ করত। পরে হুগলির আরেক দুষ্কৃতী হুব্বা শ্যামলের গ‍্যাং-এ যোগ দেয়। ধীরে ধীরে হুব্বা শ‍্যামলের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। সিপিএম জামানা শেষের দিকে হুব্বা শ্যামলের সবথেকে বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিলেন এই রমেশ মাহাতো। ২০১১ সালে হুব্বা শ‍্যামল খুন হয়। ঘটনার পরে এলাকা ছেড়ে পালায় বাঘা। বাঘাও বিভিন্ন মামলায় জেল খেটেছেন। হুব্বা শ‍্যামল খুনের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত ছিল এই রমেশ মাহাতো। শ্যামলকে খুনের অভিযোগে জমি মাফিয়া রমেশ মাহাতোকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল।

শ্যামলের মৃত্যুর তাঁর সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ যায় 
রমেশ মাহাতোর হাতে। হুগলি, হাওড়া ছাড়াও সংলগ্ন উত্তর ২৪ পরগনাতেও নিজের প্রভাব বিস্তার করেছিল রমেশ মাহাতো। বিহার থেকে ভাড়া করা লোকদের নিয়ে রমেশ সিন্ডিকেট চালাত। রমেশের ‘কোর কমিটি’-তে ছিল নেপু, চিকুয়া, আক্রম-সহ বেশ কিছু দুষ্কৃতী। মূলত তোলাবাজি, খুন ছাড়াও হাওড়া-হুগলির প্রোমোটারদের মোটা অঙ্কের টাকা দিত রমেশ মাহাতো। সেই টাকাই নির্মাণকাজে ব‍্যবহৃত হত। নির্মাণসামগ্রীও সাপ্লাই করতো রমেশ মাহাতো। এ ভাবেই রমেশের সম্পত্তির বিস্তার ঘটেছে বলেই দাবি করা হয়। জেলে বসেই সেই সিন্ডিকেট পরিচালনা করত বলেও কেউ কেউ দাবি করেছেন।

জাঙ্গিপাড়ার খুড়িগাছির সভায় জমি মাফিয়া রমেশ মাহাতোকে দেখতে পাওয়ার পর থেকে হাওড়া ও হুগলি জেলার রাজনীতি উত্তপ্ত হয়েছে। কীভাবে এক চিহ্নিত দুষ্কৃতী বিজেপির ছত্রছায়ায় এসেছে তা নিয়ে বিতর্ক থামছে না। পরিস্থিতির ওপরে বিজেপি নজর রেখেছে বলেই সূত্রের খবর।

এই বিষয়ে রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, “হুব্বা শ‍্যামলের খুনি আমাদের হয়ে সভাসমিতি করে বেড়াচ্ছেন তা নিয়ে আমাদের কাছে কোনও খবর নেই। বিজেপির এমন কোনও সভা হচ্ছে না। মঞ্চ ভাঙার এমন যদি অভিযোগ থাকে তা হলে লকেট চট্টোপাধ্যায় আগামীকালই বিষয়টি দেখবেন।”

রাজ‍্য বিজেপির সভাপতির স্পষ্ট বার্তা, “যাঁরা বিক্ষুব্ধ হয়ে তৃণমূলে গিয়েছিল, তাঁদের জন‍্য দলের দরজা খোলা নেই। বরং বন্ধ রয়েছে। হাতে বিজেপির পতাকা থাকলে বিজেপি হয় না। লাইটপোস্ট থেকে পতাকা খুলবেন, মাথায় গেরুয়া আবির মেখে নেবেন তাতে ওই ব‍্যক্তি যে দলের কর্মী হবে এমনটা নয়। এত সহজেই একটা সংঘটিত রাজনৈতিক দলের কর্মী বা নেতা হতে পারে না।”


Share