IPS Officer Nagendra Nath Tripathi

ডিআইজি নগেন্দ্রনাথ ত্রিপাঠিকে সিআইএসএফ থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হল রাজ‍্যে, ভিলাই স্টিল প্লান্ট কাণ্ডের পরে সরানো হয়েছিল তাঁকে, বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক

গত ২৬ মে ছত্তীসগঢ়ের দুর্গ জেলায় স্টিল অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার ভিলাইয়ের প্ল্যান্ট থেকে বিপুল পরিমাণ লোহা ও ছাঁট চুরি হওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই দিন রাজ্য পুলিশ ভিলাইয়ের আকলোরডিহ এলাকায় অবস্থিত এ কে ট্রেডার্স নামে একটি লোহা ব্যবসায়ীর অফিসে অভিযান চালায়। সেখানে পুলিশ চক্রটিকে হাতেনাতে ধরে ফেলে। তাঁদের জেরা করেই লোহা চুরির চক্রের হদিশ মেলে।

আইপিএস অফিসার নগেন্দ্রনাথ ত্রিপাঠি
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৫:১১

‘উর্দিতে দাগ লাগতে দেব না’। ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে নির্বাচনের সময় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এমন কথা বলে ‘ভাইরাল’ হয়েছিলেন আইপিএস অফিসার নগেন্দ্রনাথ ত্রিপাঠি। তার পরে বীরভূমের পুলিশ সুপার হয়ে প্রায় তিন বছর কাটিয়ে দেন। এরপর কেন্দ্রীয় ডেপুটেশনে সিআইএসএফের ডিআইজি হয়ে চলে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মাস দুয়েক আগে ভিলাইয়ের স্টিল প্লান্টে কোটি কোটি টাকার লোহা ও লোহার ছাঁট চুরির ঘটনার পরে নিরাপত্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত নগেন্দ্রনাথ ত্রিপাঠিকে দিল্লিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ বার তাঁকে পের রাজ‍্যে ফেরত পাঠাচ্ছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক।

নগেন্দ্রনাথ ত্রিপাঠি ২০০৯ ব‍্যাচের পশ্চিমবঙ্গ ক‍্যাডারের আইপিএস অফিসার। তিনি ২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনের সময় নন্দীগ্রামের দায়িত্বে ছিলেন। সেই সময় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা-কাটাকাটিতে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। বলতে দেখা যায়, ‘উর্দিতে দাগ লাগতে দেব না’। সেই ভিডিয়ো সমাজমাধ‍্যমে ভাইরাল হয়। তার পরেই অষ্টম দফার ভোটের আগে তাঁকে বীরভূমের পুলিশ সুপার করে পাঠানো হয়। বীরভূমের বগটুই কাণ্ড এবং তিন তৃণমূলকর্মীকে খুনের ঘটনায় পরে ২০২৩ সালে জেলা সুপারের পদ থেকে সরিয়ে নগেন্দ্রনাথকে পুলিশ ডিরেক্টরেটে বদলি করা হয়। তার পরেই নগেন্দ্রনাথ সিআইএসএফে ডেপুটেশনে চলে যান।

সিআইএসএফে গিয়ে ডিআইজি পদমর্যাদায় নগেন্দ্রনাথ ত্রিপাঠি ভিলাই স্টিল প্লান্টে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর অধীনে প্রায় ৭০০ জন সিআইএসফের জওয়ান প্লান্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু ওই স্টিল প্লান্টে কোটি কোটি টাকা লোহার ছাঁট চুরি ও পাচার করে দেওয়ার ঘটনার পরে নিরাপত্তায় গাফিলতির অভিযোগ সামনে আসে। তার পরেই তাঁকে ওই পদ থেকে সরিয়ে দিল্লির সদর দফতরে বদলি করা হয়। এই বদলিকে নিয়মিত বলে দাবি করা হলেও লোহা চুরির ঘটনার বিতর্কের জেরে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে আলোচনা শুরু হয়েছিল।

গত ২৭ অগস্টের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, নগেন্দ্রনাথ ত্রিপাঠির ডেপুটেশনে থাকার সময় শেষ হওয়ার আগেই তাঁকে সিআইএসএফ ছেড়ে দিচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের নির্দেশিকা অনুযায়ী তাঁকে রাজ‍্যে ফিরে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর জায়গায় সিআইএসএফের ডিআইজি নির্বিকার-কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

কী ঘটনা ঘটেছিল?

গত ২৬ মে ছত্তীসগঢ়ের দুর্গ জেলায় স্টিল অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার ভিলাইয়ের প্ল্যান্ট থেকে বিপুল পরিমাণ লোহা ও ছাঁট চুরি হওয়ার ঘটনা ঘটে। ওই দিন রাজ্য পুলিশ ভিলাইয়ের আকলোরডিহ এলাকায় অবস্থিত এ কে ট্রেডার্স নামে একটি লোহা ব্যবসায়ীর অফিসে অভিযান চালায়। সেখানে পুলিশ চক্রটিকে হাতেনাতে ধরে ফেলে। তাঁদের জেরা করেই লোহা চুরির চক্রের হদিশ মেলে।

অভিযোগ, ওই প্ল‍্যান্ট থেকে লোহা এবং লোহার ছাঁট ‘ফ্লু ডাস্ট’-এর ভিতরে লুকিয়ে বাইরে আনা হত। তার পরে তা খোলা বাজারে বিক্রি করা হত। পাচারচক্রটি প্ল‍্যান্টের ভিতর থেকে লোহার প্লেট, বিম এবং বিভিন্ন পরিকাঠামো কেটে ছোট টুকরো করে বাইরে বের করে আনত। ‘ফ্লু ডাস্ট’ পরিবহণের জন্য নির্ধারিত গাড়ির ভিতরে সেই চুরি করা লোহা লুকিয়ে পাচার করা হতো বলে পুলিশ দাবি করেছে।

দুর্গের সিনিয়র পুলিশ সুপার বিজয় আগরওয়ালের বক্তব্য অনুযায়ী, পরিকল্পনা করেই লোহা চুরি করার উদ্দেশ্যেই চক্রটি সক্রিয় হয়েছিল। অভিযানের সময় পুলিশ প্রায় ২৫০ টন লোহার প্লেট ও বিম উদ্ধার করেছে। যার আনুমানিক মূল্য ৯০ লক্ষ টাকা বলে দাবি করা হয়। এ ছাড়াও, চুরি করা সামগ্রী উত্তোলন ও পরিবহণে ব্যবহৃত একাধিক গাড়ি এবং ভারী যন্ত্রপাতি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— দামি ট্রাক, টিপার, একটি বুলডোজার, একটি হাইড্রা ক্রেন, একটি চেন উত্তোলনের মেশিন এবং পাঁচটি বিশেষ ডাস্ট উত্তোলন মেশিন। বাজেয়াপ্ত সামগ্রীর মোট মূল্য সাড়ে তিন কোটি টাকারও বেশি বলে পুলিশ জানিয়েছিল।

পুলিশের বক্তব্য, গত ছ’মাসে একাধিক গ্যাং এই চক্রের নেপথ্যে কাজ করেছে। প্রায় তিন হাজার টনেরও বেশি উন্নতমানের স্টিল ও ভারী লোহা পাচার হয়ে গিয়েছে। এর ফলে মহারত্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটির আনুমানিক ১৭ কোটি ৮৭ লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

পুলিশ কী দাবি করেছে?

পুলিশের বক্তব্য, এই ঘটনার নেপথ্যে একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করেছে। চক্রের সঙ্গে প্রভাবশালী যোগও রয়েছে। প্রথমে তদন্তে নেমে পুলিশ ১৩ জনকে লোহা চুরি ও পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। পরে ভিলাই স্টিল প্লান্টের এসএসএস-৩ বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার হিমাংশুভূষণ মালিক (৫৪) এবং এই বিভাগেরই অ্যাসোসিয়েট ইঞ্জিনিয়ার মনোজকুমার দেবাঙ্গন (৫৮)-কে হেফাজতে নেওয়া হয়। প্রায় ছ’সাস ধরে এই চক্র কাজ করেছিল। এই ঘটনায় বর্তমানে ১৫ জন জেলে রয়েছেন।

নিরাপত্তায় গাফিলতির অভিযোগ পুলিশের

এই ভিলাই স্টিল প্ল্যান্ট অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি শিল্পাঞ্চল। গোটা প্ল‍্যান্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে সিআইএসএফ। নিরাপত্তায় যে ফাঁকফোকর ছিল তা মেনে নিয়েছিল পুলিশ। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীদেরও তদন্তের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।

পুলিশের বক্তব্য, সিআইএসএফের মতো পেশাদার আধাসামরিক বাহিনী ২৪ ঘণ্টা প্ল‍্যান্টে মোতায়েন থাকে। সিআইএসএফের উচ্চ নিরাপত্তাবলয়  এড়িয়ে কীভাবে চুরির ঘটনা ঘটল তা নিয়ে পুলিশের মধ্যেই সন্দেহ রয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, উদ্ধার হওয়া সামগ্রী গোটা চক্রের কার্যকলাপের সামান্য অংশ মাত্র। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তদন্তে আরও বড় একটি চক্রের অস্তিত্বের ইঙ্গিত মিলেছে। পুলিশের দাবি, প্ল্যান্টের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকর্মী, পরিবহণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ীদের সম্ভাব্য যোগসাজশ রয়েছে।

এই মামলায় দুর্গের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুখনন্দন রাঠোর জানিয়েছেন, পরিবহণকারী, অপারেটর এবং স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ে তৈরি একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই চক্রটি কাজ করত। তদন্ত আরও এগোলে প্রভাবশালী আরও কয়েক জনকে গ্রেফতার করা হতে পারে বলে পুলিশ জানিয়েছিল।

পুলিশ আরও জানিয়েছে, লোহা চুরি ও ছাঁট বেআইনি ভাবে সরিয়ে ফেলার সঙ্গে জড়িত আরও সন্দেহভাজনদের খোঁজে তল্লাশি চলছে। একই সঙ্গে গোটা চক্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

আর এই ঘটনার পরেই ভিলাই থেকে দিল্লি পাঠিয়ে দেওয়া হয় নগেন্দ্রনাথ ত্রিপাঠিকে। তারপরে তাঁকে ফের রাজ্য পাঠানো হল।


Share