CBI

সাইবার প্রতারণা চক্রের হদিশ পেতে দেশ জুড়ে সিবিআইয়ের অভিযান, ২০ রাজ্যে ৮৯ জায়গায় তল্লাশি, গ্রেফতার তিন জন

সাইবার প্রতারণার টাকা গ্রহণ, বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে তা ঘোরানো এবং পরে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগে সিবিআই তিনজনকে গ্রেফতার করেছে।

প্রতীকী চিত্র।
নিজস্ব সংবাদদাতা, দিল্লি
  • শেষ আপডেট: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৪:৪০

দেশজুড়ে সক্রিয় ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই বড়সড় অভিযান চালাল। শুক্রবার ‘অপারেশন চক্র-৬’-এর অধীনে ২০টি রাজ্যের মোট ৮৯টি জায়গায় একযোগে তল্লাশি চালানো হয়। সাইবার প্রতারণার টাকা গ্রহণ, বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে তা ঘোরানো এবং পরে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগে সিবিআই তিনজনকে গ্রেফতার করেছে।

সিবিআই জানিয়েছে, এই অভিযান তিনটি বড় অঙ্কের ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ প্রতারণা মামলার তদন্তের অংশ। তিনটি মামলায় ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে মোট ৪২ কোটি ৩৬ লক্ষ টাকা প্রতারণা করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রতারকরা নিজেদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার আধিকারিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে ভুক্তভোগীদের দীর্ঘ সময় ধরে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর মধ্যে রাখত বলে অভিযোগ।

প্রথম মামলাটি বিআইটিএস পিলানি-এর সঙ্গে যুক্ত। অভিযোগ, এক ভুক্তভোগীকে প্রায় তিন মাস ধরে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এ রেখে তাঁর কাছ থেকে ৭ কোটি ৬৭ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। পুলিশ আধিকারিকের পরিচয় দিয়ে প্রতারকরা লাগাতার মানসিক চাপ তৈরি করেছিল বলেও অভিযোগ।

দ্বিতীয় ঘটনায় গুজরাতের এক বাসিন্দাকেও প্রায় তিন মাস একই ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে রেখে ১৯ কোটি ২৪ লক্ষ টাকা প্রতারণা করা হয় বলে অভিযোগ।

তৃতীয় মামলাটি কর্নাটকের। তদন্তে অভিযোগ, সেখানে এক ভুক্তভোগীকে প্রায় এক মাস ধরে ভয় দেখিয়ে মোট ১৫ কোটি ৪৫ লক্ষ টাকা বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করানো হয়। তিনটি মামলায় সম্মিলিতভাবে আর্থিক প্রতারণার পরিমাণ ৪২ কোটি৩৬ লক্ষ টাকা।

এই ধরনের প্রতারণায় সাধারণত ফোন বা ভিডিয়ো কলের মাধ্যমে প্রতারকেরা ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। নিজেদের পুলিশ, সিবিআই, ইডি কিংবা অন্য কোনও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আধিকারিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে তারা দাবি করে, ভুক্তভোগী কোনও গুরুতর অপরাধের মামলায় জড়িত। এরপর গ্রেফতার বা আইনি ব্যবস্থার ভয় দেখিয়ে দীর্ঘ সময় ভিডিয়ো কলে থাকতে বাধ্য করা হয় ভুক্তভোগীদের। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য কিংবা প্রকৃত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও নিষেধ করা হয়। পরে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট যাচাই, জামিন, সিকিউরিটি ডিপোজিট অথবা বেআইনি সম্পত্তি যাচাইয়ের মতো নানা অজুহাতে প্রতারকেরা বিপুল অঙ্কের টাকা দাবি করে।

সিবিআইয়ের তদন্তে তিন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রতারণার টাকা সরানোর পরিকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে। সিবিআইয়ের মুখপাত্র বীণা যাদব জানিয়েছেন, গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে প্রতারণার টাকা গ্রহণ, বিভিন্ন স্তরে ঘোরানো এবং অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের নির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উঠে এসেছে। ধৃতরা হলেন- আকাশ, রাজা কর্মকার ও জ্যোতি রানি।

সিবিআইয়ের অভিযোগ, হরিয়ানার বাসিন্দা আকাশের নামে খোলা একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রতারণার টাকা থেকে প্রায় এক কোটি ৯৫ লক্ষ টাকা জমা পড়েছিল। তদন্তকারীদের দাবি, ওই অর্থ একই দিনে অন্য একটি অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়। কলকাতার বাসিন্দা রাজা কর্মকারের সংস্থার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টেও প্রায় এক কোটি পাঁচ লক্ষ টাকা জমা পড়েছিল বলে অভিযোগ।

অন্য দিকে, জ্যোতি রানির অ্যাকাউন্টেও প্রতারণার অর্থের একটি অংশ জমা পড়েছিল বলে সিবিআইয়ের দাবি। তদন্ত অনুযায়ী, তিনি ওই অর্থের একাংশ নগদে তুলে নেন এবং বাকি টাকা অন্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেন। আর্থিক লেনদেনের মূল উৎস আড়াল করার উদ্দেশ্যেই এইভাবে টাকা সরানো হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের অভিযোগ।

‘অপারেশন চক্র-৬’-এর আওতায় সিবিআইয়ের এই অভিযানে ২০টি রাজ্যের ৮৯টি জায়গায় তল্লাশি চালানো হয়েছে। অভিযানে ব্যাঙ্কিং সংক্রান্ত নথি, বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের রেকর্ড, ডিজিটাল ডিভাইস-সহ তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একাধিক সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে।

জব্দ করা নথি ও ডিজিটাল ডিভাইস ইতিমধ্যেই ফরেনসিক পরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতারণার টাকা কোন কোন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে, কারা সেই অর্থ গ্রহণ করেছে এবং বৃহত্তর চক্রে আর কারা জড়িত রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রতারকদের ব্যবহৃত প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোও তদন্তের আওতায় এনেছে সিবিআই। পাশাপাশি এখনও গ্রেফতার না হওয়া অভিযুক্তদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াও চলছে।

এই অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, গ্রেফতার হওয়া তিনজনের বিরুদ্ধে সরাসরি ভুক্তভোগীদের ফোন করে ভয় দেখানোর অভিযোগের পাশাপাশি প্রতারণার টাকা সরানোর নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগও রয়েছে। অর্থাৎ, ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ চক্র শুধু ফোন করে প্রতারণা করা ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর পিছনে একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, অর্থ গ্রহণকারী, টাকা ঘোরানোর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং বিভিন্ন জায়গায় অর্থ ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে যুক্ত একটি বৃহত্তর নেটওয়ার্ক থাকার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

শুক্রবারের এই অভিযান সিবিআইয়ের চলমান ‘অপারেশন চক্র-৬’-এর অংশ। সংগঠিত সাইবার-নির্ভর আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে চলা এই অভিযানে বিভিন্ন আন্তঃরাজ্য নেটওয়ার্কের সন্ধান করা হচ্ছে। ২০টি রাজ্যের ৮৯টি জায়গায় একযোগে তল্লাশি চালিয়ে তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা, ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ প্রতারণা বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ফোন কলের ঘটনা নয়। এর নেপথ্যে একাধিক রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা আন্তঃসংযুক্ত আর্থিক নেটওয়ার্ক থাকতে পারে।

‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ প্রতারণার বাড়বাড়ন্ত নিয়ে সুপ্রিম কোর্টও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রতারকদের পাশাপাশি এই অপরাধে ব্যবহৃত নেটওয়ার্কগুলির বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ, প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার, অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং প্রতারিত অর্থ উদ্ধারের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সিবিআই জানিয়েছে, তিনটি মামলাতেই তদন্ত এখনও চলছে। প্রতারণার বাকি টাকা কোথায় রয়েছে, তা চিহ্নিত করার পাশাপাশি আরও অভিযুক্তকে শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।


Share