Bonded Labour

২৫ বছর ‘বন্দি’ হিমঘরে! ক্রীতদাসের মতো খাটানো শ্রমিক উদ্ধার, মিলল দুই নাবালকও

তাঁকে উদ্ধার করতে গিয়ে পুলিশ সুন্দরবনের আরও দুই নাবালকের খোঁজ পায়, যাদেরও ‘বন্ধকি শ্রমিক’ হিসেবে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ। তাদেরও উদ্ধার করা হয়েছে।

উদ্ধার করা হয়েছে কালীপদকে।
নিজস্ব সংবাদদাতা, আলিপুরদুয়ার
  • শেষ আপডেট: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৫৭

এক-দুই বছর নয়, টানা ২৫ বছর ধরে এক শ্রমিককে কার্যত ‘ক্রীতদাস’-এর মতো কাজে লাগানো হয়েছে বলে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে আলিপুরদুয়ারে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবনের নন্দকুমারপুর এলাকার বাসিন্দা, প্রায় ৫০ বছরের কালীপদ মণ্ডলকে শুক্রবার আলিপুরদুয়ার-১ ব্লকের পলাশবাড়ি সংলগ্ন একটি বেসরকারি হিমঘর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁকে উদ্ধার করতে গিয়ে পুলিশ সুন্দরবনের আরও দুই নাবালকের খোঁজ পায়, যাদেরও ‘বন্ধকি শ্রমিক’ হিসেবে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ। তাদেরও উদ্ধার করা হয়েছে। এ দিকে, অভিযোগের পর থেকেই অভিযুক্ত হিমঘর মালিক পলাতক। তাঁর খোঁজে পুলিশ তল্লাশি শুরু করেছে।

উদ্ধারের পর পুলিশকে কালীপদ মণ্ডল জানিয়েছেন, প্রায় আড়াই দশকে একবারের জন্যও তাঁকে বাড়ি ফেরার ‘অনুমতি’ দেওয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, তাঁর চলাফেরা, খাওয়াদাওয়া—সব ক্ষেত্রেই ছিল কড়া বিধিনিষেধ। নিজের ইচ্ছেমতো কোথাও যাওয়ার বা স্বাভাবিক জীবনযাপনের কোনও স্বাধীনতাই ছিল না বলে অভিযোগ তাঁর। কালীপদর দাবি, প্রায় ২৫ বছর আগে শ্রমিক সরবরাহকারী একটি সংস্থার মাধ্যমে তাঁকে ওই হিমঘরে নিয়ে আসা হয়। অভিযোগ, সেই সময় তাঁর পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। ওই টাকার বিনিময়েই তাঁকে ‘বন্ধকি শ্রমিক’ হিসেবে হিমঘরে কাজে লাগানো হয়। তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কাজ করে ওই ২৫ হাজার টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত তাঁকে সেখানেই থাকতে হবে। কিন্তু দীর্ঘদিন কাজ করার পরেও বারবার তাঁকে বলা হত, এখনও নাকি সেই টাকা শোধ হয়নি। ফলে বাড়ি ফেরার সুযোগও আর মেলেনি। কালীপদ জানিয়েছেন, হিমঘরের সীমানা প্রাচীর পেরিয়ে বাইরে যাওয়ার অনুমতি তাঁর ছিল না। তাঁর নিজের কোনও মোবাইল ফোন বা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টও নেই। অসুস্থ হলেও কাজ থেকে রেহাই মিলত না বলে অভিযোগ। দিনের পর দিন প্রায় আধপেটা খেয়ে তাঁকে কাজ করতে হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী জেলার অন্য হিমঘরেও তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হত। বর্তমানে ওই হিমঘরে প্রায় ১৫০ জন শ্রমিক কাজ করেন। তাঁদের অধিকাংশই অস্থায়ী। কাজের সময় তাঁরা হিমঘরে আসেন, কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরে যান। কিন্তু কালীপদর জীবন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তিনিই একমাত্র শ্রমিক, যিনি বছরের পর বছর হিমঘরের ভিতরে একটি ছোট্ট কুঠুরিতে থাকতেন। অভিযোগ, কালীপদ যাতে পালিয়ে যেতে না পারেন, সে জন্য হিমঘরে সর্বক্ষণ ‘বাহুবলী’ ধরনের নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন থাকত। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে কার্যত নজরবন্দি অবস্থায় তাঁকে দিয়ে কাজ করানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে।

কয়েক মাস আগে কাজের জন্য ওই হিমঘরে সুন্দরবন থেকে আরও দুই নাবালককে নিয়ে আসা হয়েছিল বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। অভিযোগ, তাঁদের পরিবারের হাতেও একই ভাবে মোটা অঙ্কের টাকা তুলে দেওয়া হয়েছিল। উদ্ধারের পর আপাতত দুই নাবালককে কাউন্সেলিংয়ের জন্য চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির মাধ্যমে জলপাইগুড়ির একটি হোমে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ তাঁদের কাউন্সেলিংয়ের রিপোর্ট জেলা সিডব্লিউসির কাছ থেকে সংগ্রহ করবে। পাশাপাশি, দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে হিমঘরে কাজ করার সময় কালীপদ মণ্ডলের অভিজ্ঞতা এবং তাঁর করা অভিযোগগুলিও তদন্তকারীরা নথিবদ্ধ করবেন। পুলিশের প্রাথমিক সন্দেহ, এই ঘটনার পিছনে শুধু একজন হিমঘর মালিক নন, আরও বড় কোনও শ্রমিক পাচার বা বন্ধকি শ্রমিক চক্র সক্রিয় থাকতে পারে। সেই কারণেই পুলিশ তদন্তের স্বার্থে এখনই এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আনতে চাইছে না।

এ দিকে, ওই হিমঘরের ম্যানেজার সঞ্জয় ঘোষ বলেন, 'শ্রমিকদের সব দায়িত্ব সরবরাহকারী ঠিকাদারদের। ওখানে আমরা নাক গলাই না।' তবে নাবালক শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছিল, সেটা তিনি স্বীকার করেছেন। বলেন, 'বিষয়টা আমাদের দেখা উচিত ছিল।' এর বেশি তিনি আর কোনও মন্তব্য করতে চাননি। উদ্ধার হওয়া তিন জনের অভিযোগ এবং বক্তব্য যাচাই করার পরে অভিযুক্ত হিমঘর কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছেন জেলার পুলিশ সুপার অমিতকুমার শাহ। তিনি বলেন, 'খুবই গুরুতর অভিযোগ। আইন কখনই বন্ধকি শ্রমিক প্রথাকে প্রশ্রয় দেয় না।'


Share