Delimitation

কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস নিয়ে শুনানি, ওয়ার্ডের সীমানা-ভোটার সংখ্যা নিয়ে একাধিক আপত্তি, অভিযোগ জানাতে হাজির সব দলের প্রতিনিধিরা

কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন নিয়ে শনিবার থেকে শুরু হল শুনানি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ও প্রাক্তন কাউন্সিলররা ওয়ার্ডের সীমানা, ভোটার সংখ্যা ও পার্ট নম্বর নিয়ে একাধিক অভিযোগ ও আপত্তি জানান। আগামী সোমবার, মঙ্গলবার ও বুধবারও সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত শুনানি চলবে।

কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস নিয়ে শুরু শুনানি।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:৫২

কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন নিয়ে শুরু হয়েছে শুনানি। শনিবার সকাল ১১টা থেকে কলকাতা পুরসভায় এই শুনানি শুরু হয়। পুর ও নগর উন্নয়ন দফতরের তরফে শুনানির জন্য ১০ জন অফিসারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রথম দিনে ন'জন অফিসার শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন। বিজেপি, সিপিএম, তৃণমূল কংগ্রেস ও কংগ্রেস-সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ও প্রাক্তন কাউন্সিলররা শুনানিতে এসে নিজেদের অভিযোগ ও আপত্তির কথা জানান।

শুনানির প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখতে কলকাতা পুরসভার কমিশনার তথা প্রশাসক স্মিতা পাণ্ডেও ঘটনাস্থলে যান। শনিবারের পর আগামী সোমবার, মঙ্গলবার এবং বুধবারও একইভাবে সকাল ১১টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত শুনানি চলবে।

স্মিতা পাণ্ডে জানান, পুর ও নগর উন্নয়ন দফতর থেকে ১০ জন অফিসারকে শুনানির জন্য পাঠানো হয়েছে। যাঁরা ডিলিমিটেশন নিয়ে আবেদন বা আপত্তি জানিয়েছিলেন, তাঁদের জন্যই এই শুনানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সোমবার সাংবাদিক বৈঠক করে পুরো বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানানো হবে বলেও তিনি জানান। পুজোর আগে বিষয়টি কিছুটা পরিষ্কার করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন পুর প্রশাসক।

এ দিনের শুনানিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের তরফে ওয়ার্ডের সীমানা, ভোটার সংখ্যা, পার্ট নম্বর-সহ একাধিক বিষয়ে অভিযোগ জানানো হয়। বিজেপির লিগাল সেলের কো-অর্ডিনেটর অশোক সিনহা জানান, অনেক ওয়ার্ডেই ভোটার সংখ্যা বেশি। কোথাও আবার কম। পাশাপাশি কিছু পার্ট এক ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে চলে গিয়েছে। সেই বিষয়গুলিই তাঁরা প্রশাসনের সামনে তুলে ধরেছেন।

সিপিএমের প্রাক্তন কাউন্সিলর নন্দিতা রায়ও শুনানির পদ্ধতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর দাবি, পুরনো সন্তোষপুর ওয়ার্ডের কয়েকটি পার্ট নম্বর নিয়ে তাঁদের আপত্তি রয়েছে। সেই বিষয়গুলি এদিন অফিসারদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।

তৃণমূল কংগ্রেসের তরফেও উত্তর কলকাতা, জোড়াসাঁকো বিধানসভা-সহ একাধিক এলাকার ডিলিমিটেশন নিয়ে অভিযোগ জানানো হয়। তৃণমূলের যুবনেতা মৃত্যুঞ্জয় পাল ও সৌম্য বক্সী এদিন তাঁদের অভিযোগ জানান। দলের আরও কয়েকজন নেতা এবং প্রাক্তন কাউন্সিলরও শুনানিতে অংশ নেন।

ডিলিমিটেশন নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন কালীঘাট তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান ওয়ার্ড বিন্যাসে একাধিক অসঙ্গতি রয়েছে। রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যেই তাড়াহুড়ো করে এই কাজ করা হয়েছে। জনসংখ্যার বদলে ভোটার সংখ্যাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তাঁর আরও অভিযোগ, কোথাও কম ভোটার থাকা ওয়ার্ডের সঙ্গে ভারসাম্য না করে বেশি ভোটার থাকা ওয়ার্ডে আরও ভোটার যুক্ত করা হয়েছে।

ধর্ম ও ভাষার ভিত্তিতেও কোথাও কোথাও ওয়ার্ডের সীমানা পরিবর্তন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন কুণাল ঘোষ। তাঁর দাবি, উত্তর কলকাতা-সহ বিভিন্ন এলাকার বিষয়ে তাঁরা অভিযোগ জমা দিয়েছেন। প্রশাসনের তরফে ফিজিক্যাল ভেরিফিকেশনের কথা বলা হয়েছে। সেই সময় তাঁদের প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকার সুযোগ দেওয়ার দাবিও তিনি জানান।

জনগণনার সময়ের মধ্যে ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেও সরব হন কুণাল ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, জনগণনার ভিত্তিতে জনবিন্যাস অনুযায়ী ডিলিমিটেশন করতে হলে সেই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। তাড়াহুড়ো করে বর্তমান প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে বলে তাঁর তরফে দাবি করা হয়।

এদিন যাদবপুরে বিজেপি যুব মোর্চার দুই নেতাকে মারধরের অভিযোগ নিয়েও কুণাল ঘোষকে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে তিনি বলেন, অসামাজিক কাজকর্মের অভিযোগ থাকলে পুলিশ-প্রশাসনই ব্যবস্থা নেবে। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের আইন হাতে তুলে নেওয়া উচিত নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ক্যামাক স্ট্রিটে তৃণমূলের অফিসের ভাড়া বাকি থাকা নিয়েও প্রশ্নের মুখে পড়েন কুণাল ঘোষ। তিনি জানান, ওই অফিসের ভাড়া বা ব্যবহারের সঙ্গে তাঁর সরাসরি সম্পর্ক নেই। তবে কলকাতার সমস্ত রাজনৈতিক দলের অফিসের ভাড়া ও লাইসেন্স একসঙ্গে পরীক্ষা করার দাবি জানান তিনি। তাঁর অভিযোগ, কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিকে নিশানা করে তদন্ত হলে বিষয়টির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সামনে চলে আসে।

শিক্ষাক্ষেত্রে ক্যাগ রিপোর্ট এবং শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি নিয়েও বক্তব্য রাখেন কুণাল ঘোষ। তাঁর দাবি, কোথাও অনিয়ম থাকলে প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া দুর্নীতিমুক্ত করার বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যকে স্বাগত জানালেও বিজেপি শাসিত রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় স্তরে বিভিন্ন পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিজেপিকে পাল্টা আক্রমণ করেন তিনি।

পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়েও কুণাল বলেন, কোনও রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে সিলেবাস পরিবর্তন করা উচিত নয়। সিঙুর আন্দোলনের ইতিহাস পাঠ্যসূচিতে রাখার বিষয়টি নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। ‘বাংলার হিন্দু হোমল্যান্ড’ প্রসঙ্গে অবশ্য বিষয়টি ইতিহাসবিদদের বিশ্লেষণের উপর ছেড়ে দেন তিনি।

অন্যদিকে, তৃণমূল নেতা বৈশানর চট্টোপাধ্যায় ক্যামাক স্ট্রিটের অফিস সংক্রান্ত বিষয়ে বলেন, ভাড়া না দেওয়া হয়ে থাকলে মালিক-ভাড়াটে আইনে ব্যবস্থা নেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু বিষয়টি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে তিনি অভিযোগ করেন। খাবারে ভেজাল নিয়ে সরকারি অভিযান প্রসঙ্গেও সরকারের ভূমিকা নিয়ে তিনি কটাক্ষ করেন।

তৃণমূল নেতা জাভেদ আহমেদ খান বলেন, বিধানসভা এলাকার পার্ট বা সীমানা পরিবর্তন নিয়ে তাঁরা অভিযোগ জানিয়েছেন। অফিসাররা তাঁদের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে শুনেছেন। তবে এবার ফিজিক্যাল হিয়ারিং বা সরেজমিনে যাচাই প্রক্রিয়াটিই গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করেন তিনি।

বিজেপির চিত্তরঞ্জন দে-ও শুনানিতে অংশ নেন। বিজেপির তরফে ডিলিমিটেশন সংক্রান্ত একাধিক বিষয় তুলে ধরা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

কলকাতা পুরসভার তরফে জানানো হয়েছে, আগামী বুধবার পর্যন্ত এই শুনানি চলবে। অভিযোগ ও আপত্তিগুলি খতিয়ে দেখার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ফিজিক্যাল ভেরিফিকেশনও করা হবে। পুর প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, বিভিন্ন এলাকার পরিদর্শনে গিয়ে ইতিমধ্যেই একাধিক ঘাটতি নজরে এসেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফায়ার লাইসেন্স এবং বিল্ডিং সংক্রান্ত কিছু সমস্যা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা সেই ঘাটতি পূরণ করলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে একটি গাইডলাইন প্রকাশ করা হবে।


Share