Laxmi Puja

মাটির প্রতিমা নয়, নিজের মেয়েকেই লক্ষ্মীরূপে পুজো! নারী নির্যাতন রুখতে, যথাযথ সম্মান দিতে কৃষ্ণগঞ্জে বিশ্বাস দম্পতির অভিনব বার্তা

দেবাশীষ বিশ্বাসের কথায়, মেয়ে সন্তান কখনও পরিবারের বোঝা হতে পারে না। ছেলে ও মেয়ের মধ্যে বিভেদ টেনে তাদের আলাদা চোখে দেখার মানসিকতা বদলানো জরুরি। নদিয়ার কৃষ্ণগঞ্জে নিজের মেয়েকে লক্ষ্মী রুপে পুজো করে সমাজকে অভিনব বার্তা দিলেন দম্পতি।

নিজের মেয়েকে লক্ষ্মী রূপে পূজা করলেন দম্পতি
নিজস্ব সংবাদদাতা, নদিয়া
  • শেষ আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:১৯

একসময় ঘরে মেয়ে জন্মানো মানে ছিলনা কোনও শঙ্খ ধ্বনি। জীবন কাটত পর্দার আড়ালেই। কিন্তু লক্ষ্মী ঠাকুর ! তিনিও তো মেয়েরই রূপ। আজ ঘরে ঘরে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। আর লক্ষ্মী মানেই ধন-সম্পদ ও সুখ-সমৃদ্ধির কামনায় দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা। কিন্তু নদিয়ার কৃষ্ণগঞ্জে এবারের লক্ষ্মীপুজোয় এক অন্য ছবি ধরা পড়ল। মাটির প্রতিমা নয়। নিজেদের আট বছরের মেয়ে শ্রুতিকেই লক্ষ্মীরূপে সাজিয়ে পুজো করলেন পরিযায়ী শ্রমিক দম্পতি দেবাশীষ বিশ্বাস ও লক্ষ্মী বিশ্বাস। তাঁদের এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছে এক গভীর সামাজিক বার্তা। সমাজে নারী ও শিশুর প্রতি হিংসা বন্ধ হোক, কন্যাসন্তানকে অবহেলা নয়, দেওয়া হোক যথাযথ সম্মান।

নদিয়ার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী কৃষ্ণগঞ্জ থানার শিবনিবাসের হালদারপাড়ায় বিশ্বাস পরিবারের বাড়িতে কোজাগরী পূর্ণিমায় দেখা গেল এই অভিনব আয়োজন। পুরোহিত ডেকে ধর্মীয় রীতি মেনে আট বছরের শ্রুতিকে চেয়ারে বসিয়ে লক্ষ্মীরূপে আরাধনা করেন পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের প্রার্থনা, আর যেন কোনও শিশুকে নির্যাতনের শিকার হতে না হয়। কোনও নারীকে ধর্ষণ বা খুনের মতো নৃশংসতার মুখে পড়তে না হয়। নারী ও শিশুর নিরাপত্তা এবং সম্মানের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।

পশুবৃত্ত সমাজে সুরক্ষিত নয় নারী ও শিশুরা। তার দৃষ্টান্ত বারংবার উঠে এসেছে। তাঁদের সাথে ঘটা একের পর এক অপরাধের ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। আর জি করের নৃশংস ঘটনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ—এমন ঘটনা বারবার প্রশ্ন তুলেছে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে। সেই পরিস্থিতিতে কেবল দেবীকে পুজো করাই নয়, বাস্তবের মেয়েদেরও সমান সম্মান দেওয়ার বার্তা দিতে চেয়েছেন বিশ্বাস দম্পতি। তাঁদের বিশ্বাস, ঘরের মেয়েকে দেবীর আসনে বসিয়ে সম্মান জানানোর মধ্য দিয়েই সমাজের মানুষের মনে কন্যাসন্তান সম্পর্কে ইতিবাচক ভাবনা তৈরি করা সম্ভব।

দেবাশীষ বিশ্বাসের কথায়, মেয়ে সন্তান কখনও পরিবারের বোঝা হতে পারে না। ছেলে ও মেয়ের মধ্যে বিভেদ টেনে তাদের আলাদা চোখে দেখার মানসিকতা বদলানো জরুরি। তাঁর কথায়, মেয়ের জন্মের পর থেকে তাঁদের পরিবারে অনেক উন্নতি হয়েছে। তাই নিজের কন্যাকে লক্ষ্মীরূপে পুজো করে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, মেয়েরা অবহেলার পাত্র নয়, বরং পরিবারের আশীর্বাদ।

শ্রুতির মা লক্ষ্মী বিশ্বাসের বক্তব্য, প্রতিটি পরিবারেই মেয়েকে লক্ষ্মী হিসেবে দেখা উচিত। নারী মাতৃশক্তির প্রতীক। সেই ভাবনা থেকেই মাটির প্রতিমার পাশাপাশি নিজের মেয়েকেও লক্ষ্মীরূপে আরাধনা করার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। নিজের সন্তানকে এভাবে পুজো করতে পেরে তাঁরা গর্বিত বলেও জানান তিনি।

এই বিশেষ পুজোয় উপস্থিত ছিলেন এলাকার পুরোহিত তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মতে, কন্যাসন্তানকে লক্ষ্মীরূপে পুজো করার মধ্যে কোনও বাধা নেই। মেয়েদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধার মনোভাব প্রতিটি পরিবারে গড়ে ওঠা জরুরি। শিশু নির্যাতন বন্ধ করতে এবং কন্যাসন্তান সম্পর্কে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে এমন উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা নিতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।

শুধু নারী ও শিশুর নিরাপত্তাই নয়, লক্ষ্মীর কাছে আরও কিছু প্রার্থনা রয়েছে বিশ্বাস পরিবারের। যোগ্য হয়েও যাঁরা চাকরি হারিয়েছেন, যাঁরা নিজেদের অধিকার ফিরে পাওয়ার আশায় আন্দোলন করছেন, তাঁরাও যেন আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন—সেই কামনাও করেছেন দেবাশীষ। সকলের ঘরে যেন সন্তানদের নিয়ে আনন্দে উৎসব পালনের পরিবেশ ফিরে আসে, প্রার্থনায় উঠে এসেছে সেই আশাও।

বিশ্বাস পরিবারের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখতে বাড়িতে ভিড় জমান আশপাশের বাসিন্দারা। কন্যাসন্তানকে দেবীর আসনে বসিয়ে তাঁদের এই বার্তা অনেকেরই নজর কেড়েছে। ধর্মীয় আচারকে সামাজিক সচেতনতার সঙ্গে মিলিয়ে বিশ্বাস দম্পতির এই প্রয়াস যেন মনে করিয়ে দিল—দেবী লক্ষ্মীর আরাধনার প্রকৃত তাৎপর্য শুধু পুজোর আয়োজনেই সীমাবদ্ধ নয়, নারীর প্রতি সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মধ্যেও তার প্রকাশ রয়েছে।


Share