Death

প্রয়াত বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী, ৮৭ বছর বয়সে থামল জীবনযুদ্ধ! শিল্পীর মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ শিল্প-সংস্কৃতি মহল

সম্প্রতি মূত্রনালীর সংক্রমণ ধরা পড়ায় তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও শেষরক্ষা হল না। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় আধুনিক শিল্পকলার জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হল।

প্রয়াত বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:২২

প্রয়াত বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী। রবিবার সকাল ১০টা নাগাদ দক্ষিণ কলকাতার রুবি জেনারেল হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। দীর্ঘদিন ধরে ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন শিল্পী। সম্প্রতি মূত্রনালীর সংক্রমণ ধরা পড়ায় তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও শেষরক্ষা হল না। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় আধুনিক শিল্পকলার জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হল।

গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্লাড ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন যোগেন চৌধুরী। নিয়মিত চিকিৎসার পাশাপাশি গত ১৪ মাসে একাধিকবার কেমোথেরাপিও দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। সম্প্রতি দুর্গাপুজোর সময় মূত্রনালীর সংক্রমণ ধরা পড়লে বাইপাসের ধারে রুবি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। চিকিৎসক তুফান কান্তি দোলাইয়ের তত্ত্বাবধানে চলছিল চিকিৎসা। কিন্তু শারীরিক অবস্থার ক্রমশ অবনতি হওয়ায় পরিবারের সম্মতিতে শনিবার তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ে হার মানেন শিল্পী।

১৯৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরের দাহারপাড়া গ্রামে জন্ম যোগেন চৌধুরীর। তাঁর বাবা প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন জমিদার ও শিল্পানুরাগী। মা আলপনা আঁকায় দক্ষ ছিলেন। পরিবারের শিল্পচর্চার পরিবেশ থেকেই ছোটবেলায় ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। দেশভাগের সময় পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন তিনি। ১৯৫৫ সালে গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফটে ভর্তি হন। ১৯৬০ সালে পড়াশোনা শেষ করে হাওড়া জেলা স্কুলে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে কলকাতার হ্যান্ডলুম বোর্ডে ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন। মাদ্রাজেও টেক্সটাইল ডিজাইনারের দায়িত্ব সামলান।

১৯৬৫ সালে ফরাসি সরকারের বৃত্তি নিয়ে শিল্পশিক্ষার জন্য প্যারিসে যান যোগেন চৌধুরী। পরবর্তীকালে তাঁর শিল্পকর্ম আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিতি লাভ করে। গ্রামীণ বাংলার জীবন, সংস্কৃতি ও সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা তাঁর ছবিতে স্বতন্ত্র শিল্পভাষা পেয়েছিল। নিজের অসামান্য তুলির টানে ভারতীয় আধুনিক শিল্পকলায় তৈরি করেছিলেন স্বতন্ত্র পরিচিতি। শিল্পী হিসেবে খ্যাতির পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি ভবনের আর্ট গ্যালারিতে কিউরেটরের দায়িত্বও পালন করেছিলেন তিনি।

শিল্পকলার পাশাপাশি রাজনীতির জগতের সঙ্গেও যোগেন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ ছিলেন যোগেন চৌধুরী। ২০১২ সালে তাঁকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করা হয়। তবে গত কয়েক বছর ধরে অসুস্থতার কারণে তাঁকে আর সেভাবে প্রকাশ্যে দেখা যেত না।

শিল্পীর প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এক্স হ্যান্ডেলে শোকবার্তায় তিনি লেখেন, যোগেন চৌধুরী বাংলা ও ভারতের গর্ব। বিশ্বজুড়ে শিল্পীদের কাছে, এমনকী তাঁর নিজের কাছেও যোগেন ছিলেন বিরাট অনুপ্রেরণা। তাঁর মৃত্যুতে শিল্প ও সংস্কৃতির জগতে যে অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হল, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। শোকসন্তপ্ত পরিবার, বন্ধু এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শিল্পীর অনুরাগীদের প্রতি সমবেদনা জানান প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।

শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লেখেন, বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ও কিংবদন্তি যোগেন চৌধুরীর প্রয়াণে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত। শিল্পীর স্বতন্ত্র তুলির টান ভারতীয় আধুনিক শিল্পকলাকে নতুন দিশা দেখিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর অসামান্য অবদান পশ্চিমবঙ্গকে আন্তর্জাতিক স্তরে বিশেষ পরিচিতি এনে দিয়েছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্য সরকার ও রাজ্যবাসীর পক্ষ থেকে শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবার, বন্ধু, সহযোগী এবং অগণিত অনুরাগীর প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন তিনি।


Share