BJP And Mafia Ramesh Mahato

শাসকদলের মঞ্চে জেল ফেরত জমি মাফিয়া রমেশ মাহাতো! তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক খুনের মামলা, বিজেপিতে যোগদান নিয়ে জল্পনা

বিজেপি বিধায়ক এ-ও বলেন, “রমেশ মাহাতো একজন দুষ্কৃতী। তাঁর বিরুদ্ধে ৩০টি-র মামলা রয়েছে। তার সাম্রাজ্য হাওড়া, হুগলির বিস্তীর্ণ এলাকায় বিস্তৃত রয়েছে। তাঁকে জাঙ্গিপাড়ায় এনে মানুষকে ভুল বার্তা দেওয়া হচ্ছে।”

বিজেপি নেতা দেবেশ কোলের সঙ্গে জমি মাফিয়া রমেশ মাহাতো।
প্রীতম সাধুখাঁ, শ্রীরামপুর
  • শেষ আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:১৯

এ বার বিজেপির মঞ্চে দেখা গেল জমি মাফিয়া রমেশ মাহাতোকে। হাওড়া এবং হুগলি জেলার একাধিক খুনের মামলায় তিনি অভিযুক্ত রয়েছেন। জেল থেকে ছাড়া পেয়েই শাসকদলের ছত্রছায়ায় যাওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। বিষয়টি নজরে আসতেই বিজেপির অন্দরেই ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তদন্তের দাবি জানিয়েছেন বিজেপি বিধায়ক প্রসেনজিৎ বাগ।

জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে হুগলির জাঙ্গিপাড়ার খুড়িগাছি গ্রামে একটি সভার আয়োজন করা হয়েছিল। দাবি করা হচ্ছে, বিজেপি নেতা দেবেশ কোলের নেতৃত্বে ওই সভার আয়োজন করা হয়েছে। একটি ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই ভাইরাল হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, দেবেশ বিপুল সংখ্যক বেসরকারী নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। সেই অনুষ্ঠানের মঞ্চেই জমি মাফিয়া রমেশ মাহাতোকে দেখা যায়। তাঁর পরনে সাদা শার্ট, চোখে কালো সানগ্লাস এবং সাদা ট্রাউজার ছিল। এমনকী, জেল ফেরত মাফিয়া রমেশ মাহাতোকে উত্তরীয় পরিয়ে দিতে দেখা যাচ্ছে। সেই উত্তরীয়তে বিজেপির প্রতীক আঁকা রয়েছে।

১৯৮৪ সালে রমেশ মাহাতোর উত্থান হয়। তিনি আদতে হাওড়ার বালির বাসিন্দা। তাঁর বালির বাড়িতে আগ্নিকান্ডের ঘটনায় তৎকালীন শাসকদল সিপিএম কর্মীদের নাম জড়ায়। তার পরে গা ঢাকা দেয় রমেশ। সাত দিন পর ফিরে এসে তার বদলা নেয় রমেশ। দুই ব‍্যক্তিকে খুনের ঘটনায় নাম জড়ায় রমেশের। তারপর থেকেই হাওড়া-হুগলির অপরাধ জগতে রমেশের প্রবেশ করেন। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার জমির ওপরেই তার প্রধান লক্ষ্য ছিল। জেকে স্টিল, শ্রী দুর্গা কটন মিল-সহ বেশ কয়েকটি কারখানায় লুটের ঘটনা নাম জড়িয়েছিল রমেশ মাহাতোর।

এ ছাড়াও, হাওড়ায় লোহার ছাঁটের কারবারও সে নিয়ন্ত্রণ করত। পরে হুগলির আরেক দুষ্কৃতী হুব্বা শ্যামলের গ‍্যাং-এ যোগ দেয়। ধীরে ধীরে হুব্বা শ‍্যামলের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। সিপিএম জামানা শেষের দিকে হুব্বা শ্যামলের সবথেকে বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিলেন এই রমেশ মাহাতো। ২০১১ সালে হুব্বা শ‍্যামল খুন হয়। ঘটনার পরে এলাকা ছেড়ে পালায় বাঘা। বাঘাও বিভিন্ন মামলায় জেল খেটেছেন। হুব্বা শ‍্যামল খুনের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত ছিল এই রমেশ মাহাতো। শ্যামলকে খুনের অভিযোগে জমি মাফিয়া রমেশ মাহাতোকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল।

শ্যামলের মৃত্যুর তাঁর সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ যায় রমেশ মাহাতোর হাতে। হুগলি, হাওড়া ছাড়াও সংলগ্ন উত্তর ২৪ পরগনাতেও নিজের প্রভাব বিস্তার করেছিল রমেশ মাহাতো। বিহার থেকে ভাড়া করা লোকদের নিয়ে রমেশ সিন্ডিকেট চালাত। রমেশের ‘কোর কমিটি’-তে ছিল নেপু, চিকুয়া, আক্রম-সহ বেশ কিছু দুষ্কৃতী। মূলত তোলাবাজি, খুন ছাড়াও হাওড়া-হুগলির প্রোমোটারদের মোটা অঙ্কের টাকা দিত রমেশ মাহাতো। সেই টাকাই নির্মাণকাজে ব‍্যবহৃত হত। নির্মাণসামগ্রীও সাপ্লাই করতো রমেশ মাহাতো। এ ভাবেই রমেশের সম্পত্তির বিস্তার ঘটেছে বলেই দাবি করা হয়। জেলে বসেই সেই সিন্ডিকেট পরিচালনা করত বলেও কেউ কেউ দাবি করেছেন।

যদিও দেবেশ কোলের দাবি, তিনি বিজেপির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তিনি সক্রিয় বিজেপির কর্মী। তাঁর এ-ও দাবি, তিনি ১৯৮২ সাল থেকে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তিনি প্রাক্তন বিজেপি নেতা তপন শিকদারের সহকর্মী ছিলেন। তবে বিজেপি নেতা কেন রমেশ মাহাতের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে নিলেন তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। গুরুতর মামলা থেকে বাঁচতেই কী তিনি শাসকদলের ঘনিষ্ঠ হতে চাইছেন রমেশ নাকি আবার পুরোনো দিনের মতো নিজের মাফিয়া সিন্ডিকেটকে সক্রিয় করতে চাইছেন— তা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এ ছাড়াও, জেল ফেরত জমি মাফিয়া রমেশ মাহাতোর বিজেপিতে যোগ দেওয়ারও জল্পনাও শুরু হয়েছে।

যদিও দেবেশ কোলে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের দক্ষিণবঙ্গ প্রান্তের প্রচারপ্রমূখ বিপ্লব রায় বলেন, “তিনি নিজেকে সঙ্ঘের কর্মী বলে দাবি করতেই পারেন। তাই বলে তিনি সঙ্ঘের স্বয়ংসেবক হবেন এমনটা নয়। যদি বিজেপির ব‍্যানারে অনুষ্ঠান করা হয়ে থাকে তা হলে এর উত্তর বিজেপিই দেবে।”

ভিডিয়ো ভাইরাল হতেই বিতর্ক ছড়িয়েছে। বিজেপির ব‍্যানারে নীচে এমন ‘চিহ্নিত’ জমি মাফিয়াকে দেখা যাওয়ায় নিজেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জাঙ্গিপাড়ার বিজেপি বিধায়ক প্রসেনজিৎ বাগ। তিনি ঘটনার দলীয় পর্যায়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। বিজেপি বিধায়ক প্রসেনজিৎ বাগ বলেন, “ওই অনুষ্ঠানে বেশ কিছু বিজেপির কর্মী উপস্থিত ছিলেন। কেন তাঁরা এই সমাজবিরোধীকে এ ভাবে বিজেপির মঞ্চে তুললেন, এর জন‍্য কার অনুমতি নেওয়া হয়েছিল— বিষয়টি জানতে হবে।” রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এবং জেলা সভাপতি সুমন ঘোষকে এই সংক্রান্ত রিপোর্ট দেবেন বলে জানিয়েছেন জাঙ্গিপাড়ার বিজেপি বিধায়ক প্রসেনজিৎ বাগ।

বিজেপি বিধায়ক এ-ও বলেন, “রমেশ মাহাতো একজন দুষ্কৃতী। তাঁর বিরুদ্ধে ৩০টি-র গুরুতর মামলা রয়েছে। তার সাম্রাজ্য হাওড়া, হুগলির বিস্তীর্ণ এলাকায় বিস্তৃত রয়েছে। তাঁকে জাঙ্গিপাড়ায় এনে মানুষকে ভুল বার্তা দেওয়া হচ্ছে।”


Share