School Service Commission

কর্মরত শিক্ষকদের ফের টেট! ২০২৮-এর মধ্যে পরীক্ষা, চাকরি নিয়ে বাড়ছে আশঙ্কা

কবে এই পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব, তা জানতে প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ এবং স্কুল সার্ভিস কমিশনের (এসএসসি) কাছে স্কুলশিক্ষা দফতর দিনক্ষণ চেয়েছে।

বিকাশ ভবন।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:০৩

প্রাথমিক ও উচ্চপ্রাথমিক স্তরে কর্মরত শিক্ষকদের টেট নেওয়ার তোড়জোড় শুরু করল রাজ্য সরকার। কবে এই পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব, তা জানতে প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ এবং স্কুল সার্ভিস কমিশনের (এসএসসি) কাছে স্কুলশিক্ষা দফতর দিনক্ষণ চেয়েছে। শুক্রবার দুপুরে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্য জুড়ে শিক্ষক মহলে উদ্বেগ ও বিতর্ক  তৈরি হয়েছে।

শিক্ষকদের একাংশের প্রশ্ন, কর্মরত অবস্থায় যাঁদের টেট-এ বসার ন্যূনতম যোগ্যতা নেই, তাঁদের ক্ষেত্রে কি ফের চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হবে? এই প্রশ্ন ঘিরেই ইতিমধ্যে লক্ষাধিক শিক্ষকের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ এবং এসএসসি সূত্রে খবর, দ্রুত পরীক্ষার সম্ভাব্য দিনক্ষণ ঠিক করে স্কুলশিক্ষা দফতরকে জানানো হবে। পর্ষদের এক আধিকারিকের কথায়, শুক্রবারই দফতর থেকে এ বিষয়ে নির্দেশিকা এসেছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে ২০২৮ সালের অগস্টের মধ্যে টেট নেওয়ার কথা রয়েছে। সেই কারণেই দফতর পর্ষদের কাছে পরীক্ষার সম্ভাব্য দিনক্ষণ জানতে চেয়েছে। পর্ষদের এক আধিকারিক বলেন, “শুক্রবার দফতর থেকে নির্দেশিকা এসেছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে ২০২৮ সালের অগস্টের মধ্যে টেট নিতে হবে। দফতর আমাদের কাছে দিনক্ষণ জানতে চেয়েছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে দফতরকে জানিয়ে দেব।”

গত বছরই এক রায়ে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, দেশের প্রাথমিক ও উচ্চপ্রাথমিক স্তরে কর্মরত শিক্ষকদের টেট উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক। যাঁরা এখনও টেট উত্তীর্ণ নন, তাঁদের প্রাথমিক ভাবে ২০২৭ সালের মধ্যে শীর্ষ আদালত পরীক্ষায় পাশ করার নির্দেশ দিয়েছিল। পরে সেই সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৮ সাল করা হয়। তবে যাঁদের অবসরের পাঁচ বছর বা তার কম সময় বাকি, তাঁদের এই নির্দেশের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। রাজ্য সরকারের তরফে কর্মরত শিক্ষকদের টেট নেওয়ার তোড়জোড়ের খবর প্রকাশ্যে আসতেই শিক্ষা মহলে নতুন করে আলোড়ন তৈরি হয়েছে। শিক্ষকদের একাংশের আশঙ্কা, টেট-এ বসার ন্যূনতম যোগ্যতা না থাকলে তাঁদের চাকরির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে ফের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

শিক্ষকদের অভিযোগ, রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এ রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলে শিক্ষকদের স্বার্থরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো ছবিই দেখা যাচ্ছে বলে দাবি তাঁদের। টেট নিয়ে নতুন করে রাজ্যের এই উদ্যোগকে ঘিরে তাই ক্ষোভ ও আশঙ্কা আরও বাড়ছে শিক্ষক মহলে।

শিক্ষকদের একাংশের দাবি, শিক্ষার অধিকার আইন (আরটিই) ২০০৯ সালে কার্যকর হলেও তা বাস্তবায়িত হয় ২০১০ সালে। ওই আইনের ভিত্তিতে শিক্ষকদের যোগ্যতা সংক্রান্ত বিধি তৈরি করে ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর টিচার এডুকেশন (এনসিটিই)। পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালের জুলাই থেকে শিক্ষকদের যোগ্যতা সংক্রান্ত সেই নিয়ম কার্যকর হয়। সেই সময় থেকেই শিক্ষকতার ক্ষেত্রে টেট পাশ বাধ্যতামূলক করা হয়।

শিক্ষকদের একাংশের যুক্তি, ২০১১ সালের আগে যাঁরা শিক্ষক হিসাবে কাজে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁদের নতুন করে টেটের আওতায় আনা উচিত নয়। এই মর্মে তাঁরা আবেদনও জানিয়েছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, আইন কার্যকর হওয়ার আগে থেকেই যাঁরা শিক্ষকতায় কর্মরত, তাঁদের এই নির্দেশের বাইরে রাখা হোক। হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ২০ লক্ষ শিক্ষক রয়েছেন, যাঁরা এখনও টেট উত্তীর্ণ নন। পশ্চিমবঙ্গে এই সংখ্যা ৯০ হাজারেরও বেশি। আরটিই ২০০৯ এবং এনসিটিই-র ২০১০ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষকতার ক্ষেত্রে টেট পাশ করা ন্যূনতম এবং বাধ্যতামূলক যোগ্যতা।

সুপ্রিম কোর্টও স্পষ্ট করেছে, প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষকতার ক্ষেত্রে টেট একটি আবশ্যিক যোগ্যতা। কিন্তু জটিলতা তৈরি হয়েছে ২০১১ সালের আগে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের নিয়ে। আইন কার্যকর হওয়ার আগে যাঁরা শিক্ষকতায় নিযুক্ত হয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে কি না, তা নিয়েই মূল প্রশ্ন উঠেছে। নতুন করে টেট নেওয়ার উদ্যোগ শুরু হওয়ায় সেই পুরনো বিতর্কই ফের সামনে এসেছে।

টেট সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ পুনর্বিবেচনার আর্জি জানিয়ে নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি সম্প্রতি রিভিউ পিটিশন দায়ের করেছিল। কিন্তু সেই আর্জিতেও টেট-এর বাধ্যতামূলক শর্তে কোনও পরিবর্তন করেনি শীর্ষ আদালত। এর পরেই কর্মরত শিক্ষকদের টেট থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি আরও জোরালো হয়।

শিক্ষকদের একাংশের দাবি ছিল, বাদল অধিবেশনেই অধ্যাদেশ জারি করে কর্মরত শিক্ষকদের এই সমস্যা থেকে রেহাই দেওয়া হোক। কিন্তু বাদল অধিবেশনে এ নিয়ে সংসদে কোনও প্রস্তাব বা অধ্যাদেশ আনা হয়নি। ফলে ক্ষোভ আরও বাড়ে। গত কয়েক মাসে শিক্ষকরা একাধিক বার এই দাবিতে পথে নেমেছেন। বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডলের অভিযোগ, প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি অবস্থান বদল করেছে বিজেপি। তিনি বলেন, “বিজেপি সরকার আমাদের রাজ্যে ক্ষমতায় আসার আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ক্ষমতায় এলে কর্মরত শিক্ষকদের যাতে টেট দিতে না হয় তার ব্যবস্থা করবে। ক্ষমতায় এসেই একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গেল। শিক্ষকসমাজকে প্রতারণা করা হল।” তাঁর দাবি, কয়েক দিন আগেও শাসকদলের শিক্ষক নেতারা বলেছেন, ওদের সঙ্গে যুক্ত হলে টেট দিতে হবে না।

নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ধ্রবশেখর মণ্ডল বলেন, “আমাদের টেট বিরেধী লড়াই জারি থাকবে। আমাদের প্রশ্ন যে সব শিক্ষকেরা টেট-এর জন্য যোগ্যতা এখনও অর্জন করেনি তাঁদের কী হবে? টেটে যদি তাঁরা বসতে বা উত্তীর্ণ হতে না-পারেন তা হলে কি তাঁদের চাকরি থাকবে না? সরকারের কাছে আমাদের প্রশ্ন তাঁদের নিয়ে কী ভাবছে?”


Share