Sumana Sarkar

মুখে মাস্ক, ডাক্তারি ছাত্রীর ছদ্মবেশে মধ্যরাতে জেএনএম হাসপাতালে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী! হানা দিতেই ফাঁস একের পর এক অব্যবস্থা, সিনিয়র চিকিৎসক না থাকায় ক্ষোভ

পরে মন্ত্রীর প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ্যে আসতেই চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। আকস্মিক এই পরিদর্শনের খবর ছড়াতেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে তৎপরতা শুরু হয়।

বুধবার রাতে কল্যাণী জেএনএম হাসপাতালে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী সুমনা সরকার।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কল্যাণী
  • শেষ আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৬ ০৩:৩০

ডাক্তারি ছাত্রীর ছদ্মবেশে গভীর রাতে আচমকা কল্যাণীর জওহরলাল নেহরু মেমোরিয়াল হাসপাতালে হাজির হলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী সুমনা সরকার। বুধবার রাতে মুখে মাস্ক পরে হাসপাতালে প্রবেশ করায় প্রথমে কেউ তাঁকে চিনতে পারেননি। সেই সুযোগে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে পরিষেবা, পরিকাঠামো ও সামগ্রিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন তিনি। পরে মন্ত্রীর প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ্যে আসতেই চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। আকস্মিক এই পরিদর্শনের খবর ছড়াতেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে তৎপরতা শুরু হয়।

বুধবার গভীর রাতে আচমকাই হাসপাতালে পৌঁছে যান স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী সুমনা। রাত প্রায় ১২টা ৪০ মিনিটে কোনও নিরাপত্তার বহর ছাড়াই, শুধুমাত্র সাদা পোশাকের এক মহিলা নিরাপত্তারক্ষীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রবেশ করেন। মুখে ছিল সার্জিক্যাল মাস্ক। পরিচয় গোপন রেখেই জরুরি বিভাগের সামগ্রিক পরিস্থিতি ও পরিষেবার বাস্তব চিত্র খতিয়ে দেখেন তিনি। পরিদর্শনের সময় জরুরি বিভাগে কোনও সিনিয়র চিকিৎসক উপস্থিত না থাকায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। পরে তিনি মাস্ক খুলে নিজের পরিচয় দিতেই চিকিৎসক ও হাসপাতালের অন্যান্য কর্মীরা বিস্মিত হয়ে পড়েন। পরিদর্শনের সময় হাসপাতালের একাধিক পরিষেবাগত ত্রুটি ও অব্যবস্থাও তাঁর নজরে আসে।

রোগীর পরিবারের অভিযোগ শোনার পাশাপাশি জুনিয়র চিকিৎসকদের সঙ্গেও কথা বলেন মন্ত্রী। এরপর রাতেই হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে পরিদর্শন করেন তিনি। পরিদর্শনের সময় হাসপাতালের একাধিক জায়গায় অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি চান সুমনা। পাশাপাশি হাসপাতাল চত্বরে যত্রতত্র কুকুর-বিড়ালের অবাধ বিচরণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। বিষয়টি স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নজরে আনা হবে বলেও জানান সুমনা।

মন্ত্রী বলেন, “প্রচুর অভিযোগ আসছে যে রাত ১০টার পরে বেশির ভাগ সময়ে কোনও সিনিয়র ডাক্তার থাকেন না। আমি দেখতে এসেছিলাম।” হাসপাতাল চত্বরে পরিচ্ছন্নতার অভাব নিয়েও উষ্মাপ্রকাশ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, “প্রতিটা জায়গায় নোংরা। এমন কোনও বিভাগ নেই, যেটা নোংরা নয়। এটা আমাদের কাছে অত্যন্ত নিন্দনীয়। হাসপাতালের কী অবস্থা! কী দুর্দশা! দেখে খারাপ লাগছে।”

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমি পুরো স্টুডেন্টের মতো সেজে রাত সাড়ে ১২টায় ওখানে ঢুকেছিলাম। ইমার্জেন্সিতে দেখেছি কোনও ডাক্তার নেই। রাত ১০টার পরে সিনিয়র ডাক্তার কেউ থাকে না। সব জুনিয়র (ডাক্তার) দিয়েই করায়।”

হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড পরিদর্শনের পর হস্টেলও ঘুরে দেখেন মন্ত্রী। সেখানে পৌঁছে পরিকাঠামো ও সামগ্রিক পরিস্থিতি দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। বিশেষ করে হস্টেলের বেহাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দেন সুমনা এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। “হস্টেলটার কী অবস্থা! কোনও সিকিউরিটি নেই, কিছু নেই, একদম পুরো ওপেন টু অল।” মন্ত্রীর কথায়, “হস্টেলগুলির অবস্থা খুবই খারাপ। ভিতরে নোংরা পড়ে আছে। আমি মিডিয়া নিয়ে যেতেই পারতাম। কিন্তু আমি ছেলেগুলোর ফিউচার নষ্ট করতে চাইনি। আমি ভিতরে গিয়ে ওদের ওয়ার্নিং দিয়ে এসেছি।”

সুমনার দাবি, আগের সরকারের আমলেই হস্টেলগুলিতে এই ধরনের অব্যবস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। বর্তমান রাজ্য সরকার সেই পরিস্থিতির পরিবর্তনে বদ্ধপরিকর বলেও আশ্বাস দেন তিনি। জেএনএম হাসপাতালের হস্টেল কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশও দিয়েছেন মন্ত্রী। তিনি জানান, হস্টেলে কে কখন প্রবেশ করছেন এবং কখন বেরোচ্ছেন, তার পূর্ণাঙ্গ নথি রাখতে হবে। পাশাপাশি, পড়ুয়ারা গভীর রাত পর্যন্ত কী কারণে হস্টেলের বাইরে থাকছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সুমনা এবং নজরদারি আরও কড়া করার নির্দেশ দেন।


Share