Jaggu Bhagwanpuria

পঞ্জাবের জেল থেকে ক‍্যালিফোর্নিয়ার মাদক পাচার, কীভাবে কাজ করত জগ্গু ভগবানপুরিয়ার আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র, এফবিআইয়ের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় নীতিশ প্রকাশ

চাঁদাবাজির ক্ষেত্রেও বিদেশে থাকা ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য করত জগ্গুর দলবল। কেউ টাকা দিতে অস্বীকার করলে, পঞ্জাবে থাকা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের ভয় দেখানো হতো। প্রাণে মেরে ফেলার হামলার হুমকিও দেওয়া হতো বলে অভিযোগ এই গ‍্যাংয়ের বিরুদ্ধে রয়েছে।

জগ্গু ভগবানপুরিয়া।
নিজস্ব সংবাদদাতা, আমেরিকা
  • শেষ আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৬ ০১:৫৯

গত ১৪ জুলাই আমেরিকার ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন ভারতীয় নাগরিক নীতিশ কৌশল ওরফে ‘লালা’-কে তাদের ‘ওয়ান্টেড’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। অভিযোগ, তিনি জগ্গু ভগবানপুরিয়ার সংগঠিত অপরাধচক্রের অন্যতম সক্রিয় সদস্য। অপহরণ, হামলা-সহ একাধিক অপরাধের সঙ্গে নীতিশ জড়িত রয়েছেন। নীতিশকে এফবিআইয় ‘অত‍্যন্ত বিপজ্জনক’ বলে দাবি করেছেন। এর আগে, গত ২৫ জুন ক্যালিফোর্নিয়ার সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্টের জেলা আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। তাঁর বিরুদ্ধে  রিকো (Racketeer Influenced and Corrupt Organizations) আইনের আওতায় অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে।

জগ্গু ভগবানপুরিয়া এবং আরও ১৬ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আমেরিকার অভিযোগপত্র প্রকাশ্যে আনার পর এই পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। আমেরিকার আইনজীবীদের দাবি, পঞ্জাবে গড়ে ওঠা এই অপরাধচক্র পরে আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউ জিল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। সে দেশের তদন্তকারীরা মনে করেন , এই গ‍্যাংয়ের বিশ্বজুড়ে এক হাজারের বেশি সদস্য রয়েছে। যার মধ্যে ১০০ জনেরও বেশি আমেরিকার মাটিতে সক্রিয়।

রিকো আইন কী?

Racketeer Influenced and Corrupt Organizations (RICO) আইন হল আমেরিকার একটি ফেডারেল আইন। এই আইন সংগঠিত অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে ব‍্যবহার করা হয়। এই আইনের মাধ্যমে হত্যা, অপহরণ, তোলাবাজি, মাদক পাচার, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা-সহ একাধিক অপরাধকে একটি সংগঠিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে বিচার করা যায়। ফলে শুধু অপরাধী নয়, পুরো অপরাধচক্রের নেতা, পরিকল্পনাকারী ও সহযোগীদেরও একই মামলায় অভিযুক্ত করা সম্ভব হয়।

কে এই জগ্গু ভগবানপুরিয়া?

জগ্গু ভগবানপুরিয়ার প্রকৃত নাম জগদীপ সিংহ। পঞ্জাবের গুরদাসপুর জেলার ভগবানপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পরে তিনি ‘ভগবানপুরিয়া’ নামে পরিচিত হন। একসময় তিনি কাবাডি খেলোয়াড় ছিলেন বলে জানা যায়। প্রায় ১৪ বছর আগে— ২০১২ সালে মাদক উদ্ধারের মামলায় প্রথম পুলিশের নজরে আসেন জগ্গু। পরে সেই মামলায় বেকসুর খালাস পেলেও, তদন্তকারীরা মনে করেন, সেখান থেকেই জগ্গু সংগঠিত অপরাধ জগতে প্রবেশ করে। তার বিরুদ্ধে হত্যা, তোলাবাজি, মাদক পাচার, অবৈধ অস্ত্র রাখা-সহ প্রায় ১২৮টি ফৌজদারি মামলা রয়েছে। বহু বছর তিনি পঞ্জাবের বিভিন্ন জেলে বন্দি ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, জেলের ভিতর থেকেই অপরাধচক্র পরিচালনা করে গিয়েছেন।

জেল থেকেই কীভাবে চালাতেন অপরাধচক্র?

তদন্তকারী সংস্থাগুলির দাবি, জেলের ভিতরে পাচার হওয়া মোবাইল ফোন ব্যবহার করা হত। তা থেকেই ভগবানপুরিয়া সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। আমেরিকার অভিযোগ,  জেল থেকেই জগ্গু এফবিআইয়ের সদস্যকে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে ২০ কেজি কোকেন পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। লেনদেন যাচাই করতে তিনি একটি নির্দিষ্ট নোটের সিরিয়াল নম্বরও দেন। পরে আমেরিকার কর্তৃপক্ষ ওই চালান বাজেয়াপ্ত করে। আমেরিকার আইনজীবীদের মতে, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, জেলে বন্দি থাকলেও ভগবানপুরিয়া আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের প্রতিটি ধাপে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

লরেন্স বিষ্ণোইয়ের সহযোগী থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী

একসময় জগ্গু ভগবানপুরিয়া গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোই-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। ২০২২ সালে পাঞ্জাবি গায়ক সিধু মুসেওয়ালা হত্যাকাণ্ডের তদন্তেও দু’জনের নাম উঠে আসে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের দাবি, পরবর্তীতে দু’জনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। পরবর্তীতে জগ্গু ভগবানপুরিয়া নিজের স্বাধীন অপরাধচক্র গড়ে তোলেন। ২০২৩ সালে গোইন্দওয়াল সাহিব জেলের সংঘর্ষের পর এই দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে বলে দাবি করা হয়।

কীভাবে কাজ করত জগ্গু ভগবানপুরিয়ার আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক?

আমেরিকার তদন্তকারীদের দাবি, সংগঠনটির সদর দফতর ভারতে। ভারতে বসে তাঁদের কার্যকলাপ আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউ জিল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ে ছিল। স্থানীয় নিয়োগকারী, মাদক পরিবহণকারী, অস্ত্র সরবরাহকারী, তেলাবাজ, বিদেশে অবস্থানকারী সমন্বয়কারী এবং হিংসার ঘটনায় যুক্ত অপারেটিভেরা এই নেটওয়ার্কে অংশ ছিল। আমেরিকায় ক্যালিফোর্নিয়াকে তাঁদের প্রধান ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হতো বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

সমাজমাধ‍্যমে নিয়োগ থেকে পাচারচক্র

পঞ্জাব পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, ইনস্টাগ্রাম-সহ বিভিন্ন সমাজমাধ্যমকে ব্যবহার করে অর্থকষ্টে থাকা তরুণদেরকে সংগঠনে টানা হতো। দ্রুত অর্থ, প্রভাব, বিদেশে যাওয়ার সুযোগ এবং অপরাধী হিসেবে পরিচিতদের এই লোভ দেখিয়ে গ‍্যাং-এ অন্তর্ভুক্ত করানো হতো। এদেরকে ব‍্যবহার করেই মাদক ও চাঁদাবাজির আন্তর্জাতিক রুট তৈরি করা হয়েছিল। তাঁদের অভিযোগ অনুযায়ী, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ কোকেন ও হেরোইন কানাডায় পাচার করা হতো। গতবছর প্রায় ৯৯.২ কেজি কোকেন ও এক কেজি হেরোইনয়ের একটি চালান বাজেয়াপ্ত করে আমেরিকার কর্তৃপক্ষ।

চাঁদাবাজির ক্ষেত্রেও বিদেশে থাকা ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য করত জগ্গুর দলবল। কেউ টাকা দিতে অস্বীকার করলে, পঞ্জাবে থাকা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের ভয় দেখানো হতো। প্রাণে মেরে ফেলার হামলার হুমকিও দেওয়া হতো বলে অভিযোগ এই গ‍্যাংয়ের বিরুদ্ধে রয়েছে।

দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশের এই চক্রে যোগসাজশের অভিযোগ

আমেরিকার অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, পঞ্জাবে কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশকর্মীরা জগ্গু এবং তাঁর গ‍্যাং-কে সহযোগিতা করেছে। তাঁদের মতে, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ভুয়ো মামলা দায়ের করানো হত। সেই ভয় দেখিয়ে বিপুল অর্থ আদায় করা হতো। তবে এই অভিযোগগুলির সত্যতা আদালতেই প্রমাণিত হতে হবে।

অপারেশন হার্ড বল’

আমেরিকার দাবি, ভগবানপুরিয়া-সহ একাধিক ভারতীয় বংশোদ্ভূত আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। সেই অভিযানের নাম রাখা হয়েছিল ‘অপারেশন হার্ড বল’। যৌথ অভিযানে আমেরিকা, কানাডা ও ইউরোপের তদন্তকারী সংস্থাগুলি অংশ নিয়েছে। অভিযানে ৩৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট গঠন করা হয়। ২৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়। প্রায় এক হাজার কেজি কোকেন উদ্ধার করা হয়েছে। এক কেজি হেরোইন বাজেয়াপ্ত করা হয়। এ ছাড়াও, আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল নগদ অর্থ উদ্ধার করা হয় বলে জানা গিয়েছে।

আমেরিকার তদন্তকারীদের অভিযোগ অনুযায়ী, জগ্গু ভগবানপুরিয়ার গ‍্যাং পঞ্জাবভিত্তিক একটি স্থানীয় গ্যাং ছিল। তা থেকে ধীরে ধীরে বহু দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। একটি আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রে পরিণত হয়। জেল থেকে যোগাযোগ, মাদক পাচার, অস্ত্র ব্যবসা, তোলাবাজি, হিংসা এবং প্রবাসী ভারতীয়দের লক্ষ্য করে পরিচালিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাঁরা আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে বলে অভিযোগ। যদিও এই সমস্ত অভিযোগ বর্তমানে আমেরিকার আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। আদালতের রায়ে দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তরা আইনত নির্দোষ বলে বিবেচিত হবেন।

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার পাঁচ রাজ‍্যের ডিজিদের সঙ্গে নিয়ে এনআইয়ের কর্তারা বৈঠক করেছেন। পঞ্জাব, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ, রাজস্থান ও দিল্লির পুলিশের ডিজি-দের সঙ্গে এনআইএর শীর্ষ আধিকারিকেরা এই বৈঠক করেছেন। পঞ্জাব পুলিশ এই বৈঠকের আয়োজন করে। সূত্রের খবর, লরেন্স বিষ্ণোই ও জগ্গু ভগবানপুরিয়া গ্যাংয়ের বিভিন্ন অপরাধচক্র পঞ্জাবের বাইরে হরিয়ানা, রাজস্থান এবং দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলেও নিজেদের নেটওয়ার্ক বিস্তার করেছে। বিভিন্ন রাজ্যে শ্যুটার, অস্ত্র ও লজিস্টিক সহায়তা ভাগাভাগি করে এই চক্রগুলি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত গ্যাংস্টার নেটওয়ার্ক ভাঙতে সমন্বিত কৌশল, তথ্যের আদানপ্রদান এবং যৌথ অভিযান পরিচালনা করা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে সূত্র মারফত জানা গিয়েছে।


Share