Red Terror

‘লাল সন্ত্রাস’, গুড়াপে তৃণমূল কর্মী খুনের ঘটনায় পনেরো বছর পরে আট সিপিএম কর্মীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিল আদালত

গত ৭ নভেম্বর সাজা ঘোষনার কথা থাকলেও তা অজ্ঞাত কারণে পিছিয়ে যায়। আদালত নির্দেশ দেয় তৃণমূল কর্মী খুনের মামলায় দোষী আট জনকে পৃথক সেলে রাখার নির্দেশ দেয়। আজ হয় চূড়ান্ত রায় দান। আজ, মঙ্গলবার সাজা ঘোষনা করার দিন ধার্য করা হয়েছিল।

পনেরো বছর পরে বিচার পেল তৃণমূল কর্মীর পরিবার।
নিজস্ব সংবাদদাতা, চুঁচুড়া
  • শেষ আপডেট: ১২ নভেম্বর ২০২৫ ১২:২৫

আজ থেকে পনেরো বছর আগে ২০১০ সালের মার্চ মাসে ‘লাল সন্ত্রাস’-এর শিকার হয়েছিলেন এক তৃণমূল কর্মী। দীর্ঘ পনেরো বছর পরে বিচার পেল মৃতের পরিবার। আট জন সিপিএম কর্মীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দিল চুঁচুড়া আদালত। মোট অভিযুক্তের সংখ্যা ছিল ১০ জন। বিচার চলাকালীন দু’জন মারা গিয়েছেন। মঙ্গলবার বাকি অভিযুক্তদের সাজা ঘোষণা করেন বিচারক সঞ্জয়কুমার শর্মা।

সেদিন কী হয়েছিল?

আজ থেকে পনেরো বছর আগে ২০১০ সালের ১৮ মার্চ হুগলির গুড়াপের গুড়বাড়ি-১ পঞ্চায়েত এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। মৃত তৃণমূল কর্মীর নাম ক্ষুদিরাম হেমব্রম। ওই দিন ক্ষুদিরামের ছেলে সুনীল হেমব্রমের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা ছিল। ক্ষুদিরাম মাঠে কাজ করে বন্ধু তপন রুইদাসের মেয়ের দেখাশোনার জন্য তাঁর বাড়ি গিয়েছিলেন।তারপর আর বাড়ি ফেরেননি। পরের দিন ১৯ তারিখ ডিভিসি’র ক্যানেল থেকে বস্তা বন্দী রক্তাক্ত ক্ষুদিরামের মৃতদেহ উদ্ধার হয়। তৃণমূল কর্মী ক্ষুদিরাম হেমব্রমকে কুপিয়ে খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় কয়েক জন সিপিএম নেতা ও কর্মীদের বিরুদ্ধে আঙুল ওঠে। তৃণমূল কংগ্রেস করার জন্য ক্ষুদিরামকে খুন হতে হয় বলেও অভিযোগ ওঠে। এমনকি খুনের পরে বাড়ির মহিলাদের দিয়ে রক্ত মোছানো হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

পুলিশের তদন্তে কী উঠে আসে? 

১৯ শে মার্চ রাতে হুগলির গুরাপ থানায় অভিযোগ দায়ের করেন বন্ধু তপন রুইদাস। অভিযোগপত্রে গুড়বাড়ি-১ পঞ্চায়েতের প্রধান লালু হাঁসদা-সহ দশ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। তদন্তের নেমে সিপিএম-এর পঞ্চায়েত প্রধান লালু হাঁসদা-সহ একে একে ১০ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ধৃতদের নাম, লালু হাঁসদা, রবি বাস্কে, লক্ষীরাম বাস্কে, সিদ্ধেশ্বর মালিক, সনাতন মালিক, গণেশ মালিক, লক্ষ্মীনারায়ন সোরেন, নাড়ু টুডু, অমর রুইদাস এবং নেপাল মালিক। ধৃতদের বিরুদ্ধে খুন, তথ্যপ্রমান লোপাট, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, অস্ত্র আইন-সহ একাধিক ধারায় মামলা রুজু করা হয়। সময় মতো চুঁচুড়া আদালতে চার্জশিট জমা দেয় পুলিশ।

তদন্ত শেষ, শুরু বিচার

২০১১ সালে সিপিএমকে পরাজিত করে লালবাড়ি দখল করে তৃণমূল। পালাবদলের ছ’বছর পর ২০১৭ সালে ২৭ জুন চার্জগঠন হয় চুঁচুড়া আদালতে। শুরু হয় বিচার প্রক্রিয়া। এই মামলায় ধৃত সিপিএম কর্মীদের বিরুদ্ধে মোট ১২ জন সাক্ষ দেন। জানা গিয়েছে, ওই দিনের নৃশংস ঘটনার চার জন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। বিচারপর্ব চলাকালীন অমর রুইদাস ও নেপাল মালিক নামে অভিযুক্ত দুই সিপিএম কর্মীর মৃত্যু হয়। বাকি আট জন দুষ্কৃতী জামিনে ছাড়া পায়। 

বিচার শেষ, সাজা ঘোষণা করল আদালত

গত ৬ নভেম্বর এই আট ‘লাল সন্ত্রাসী’-দের দোষী সাব্যস্ত করেন চুঁচুড়া আদালতের বিচারক সঞ্জয়কুমার শর্মা। গত ৭ নভেম্বর সাজা ঘোষনার কথা থাকলেও তা অজ্ঞাত কারণে পিছিয়ে যায়। আদালত নির্দেশ দেয় তৃণমূল কর্মী খুনের মামলায় দোষী আট জনকে পৃথক সেলে রাখার নির্দেশ দেয়। আজ হয় চূড়ান্ত রায় দান। আজ, মঙ্গলবার সাজা ঘোষনা করার দিন ধার্য করা হয়েছিল।

এ দিন বিচারক সঞ্জয়কুমার শর্মা রায় ঘোষনার আগে দু পক্ষের আইনজীবীর কাছ থেকে তাদের মতামত জানতে চান। এর পরেই তিনি দোষীদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ পড়ে শোনান। এর পাশাপাশি ১০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করেছে আদালত। অনাদায়ে আরও এক বছর জেলের সাজা শুনিয়েছেন বিচারক সঞ্জয়কুমার শর্মা।

আইনজীবীরা কী বললেন?

এই মামলায় সরকার পক্ষের আইনজীবী চন্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আমরা দোষীদের সর্বোচ্চ সাজার আবেদন জানিয়েছিলাম। আদালত তাদের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডের সাজা শুনিয়েছে। এর সঙ্গে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করেছে আদালত। অনাদায়ে আরও এক বছর জেলের সাজা শুনিয়েছেন। নৃশংস ভাবে ক্ষদিরামকে খুন করা হয়েছিল।

হুগলি জেলা আদালতের মুখ্য সরকারি আইনজীবী শঙ্কর গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “এই মামলার রায়দান হতে প্রায় ১৫ বছর সময় লেগে গেল। তবে এর জন্য সরকারি আইনজীবী বা আদালত কেউই দায়ী নয়।মামলা চলাকালীন আসামি পালিয়ে গিয়েছিল। তাকে ধরে এবং উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ যোগাড় করে পুলিশ চার্জশিট দিয়েছিল। তার পরই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই ঘটনায় নৃশংসতা ছিল। সেই কারণেই আদালত আট জন দোষীকেই যাবজ্জীবন সবসময় কারাদণ্ড সাজা শুনিয়েছে।”

কে কী বললেন?

স্বামীর বিচার পেয়ে ক্ষুদিরামের স্ত্রী মালতি হেমব্রম বলেন, “দোষীদের ফাঁসি হলে ভালো হত। আমার স্বামী চিরজীবনের মত চলে গেল। ছেলেমেয়েরা ছোটো ছিল। তাদের অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছি।”

এই বিষয়ে ধনেখালির বিধায়ক অসীমা পাত্র বলেন, “ধনেখালিতে সিপিআইএম অনেক তৃণমূল কর্মীকে খুন করেছে। তাদের হার্মাদ বাহিনী অত্যাচার চালাতো। ২০১১ সালে আমরা ক্ষমতায় আসার পর সেই পরিবারগুলোকে বিচার দেওয়ার চেষ্টা করছি। ক্ষুদিরাম হেমব্রমকে তপন রুইদাসের বাড়িতে তার পরিবারের সামনে নৃশংস ভাবে কুপিয়ে খুন করা হয়। তারপর মেঝেতে পড়ে থাকা সেই রক্ত বাড়ির মহিলাদের দিয়ে মুছতে বাধ্য করা হয়।”

তৃণমূল বিধায়ক অসীমা আরও বলেন, “মৃতদেহ লোপাট করার উদ্দেশ্যে টেনে নিয়ে গিয়ে ডিভিসির খালে ফেলে দেয়। এমনকি এই ঘটনা যারা প্রত্যক্ষদর্শী তাদেরকে হুমকিও দেওয়া হয়। আদালত তাদের সঠিক বিচার করেছ।”

সিপিএমের আমলে ঘটনার দায় অস্বীকার করেছে দোষীরা। আদালত থেকে বেরোনোর সময় সাজাপ্রাপ্ত সিপিএম কর্মীদের দাবি, তারা সিপিএম করেন। তাই তাদের ফাঁসানো হয়েছে।


Share