Prashanta Burman

কীর্তিমান প্রশান্ত! নিয়মিত ক্লাস না করেই একের পর এক আইনের ডিগ্রি হাতিয়ে নিয়েছেন, সরকারি নিয়মকে বুড়ো আঙুল বিডিওর

এই বিষয়ে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন রেজিস্ট্রার তাপসকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কথা, “এ ক্ষেত্রে পদে পদে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ভাঙা হয়েছে। গোটা বিষয়টির তদন্ত হওয়া উচিত।”

রাজগঞ্জের প্রাক্তন বিডিও প্রশান্ত বর্মন।
নিজস্ব সংবাদদাতা
  • শেষ আপডেট: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৫০

সরকারি নিয়মকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়েছেন। নিয়মিত ক্লাস না করেই পেয়ে গিয়েছেন একের পর এক আইনের ডিগ্রি। দত্তাবাদের স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে খুনের মামলার অভিযুক্ত বিডিও প্রশান্ত বর্মনের আরেক কীর্তি প্রকাশ্যে এসেছেঅভিযুক্ত বিডিও প্রশান্ত বর্মন হাত পাকিয়েছেন শিক্ষা দুর্নীতিতেও।

শুধু তা-ই নয়, কীর্তিমান বিডিও প্রশান্তের কুকর্মে নাম জড়িয়েছে কলকাতা হাই কোর্টের জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল জয়জিৎ চৌধুরীর। জয়জিৎ শিলিগুড়ির মাটিগাড়ার যে আইন কলেজের চেয়ারম্যান সেই কলেজ থেকেই এই আইনের ডিগ্রিগুলি পেয়েছেন। আর তা পেতে বিধি ভঙ্গের অভিযোগ উঠছে। অভিযোগ, বিডিও প্রশান্ত সেখান থেকে রেগুলার কোর্সে তিন বছরের আইনে স্নাতকের (এলএলবি) ডিগ্রি পেয়েছেন। আবার সেখান থেকেই বর্তমানে রেগুলার কোর্সে আইনে স্নাতকোত্তর (এলএলএম) পড়ছেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট আইন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কোর্সগুলিতে পরীক্ষায় বসতে হলে প্রতি সেমেস্টারে কমপক্ষে ৭৫ শতাংশ উপস্থিতি জরুরি। কিন্তু বিডিও'র মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলে প্রশান্ত যে ৭৫ শতাংশ ক্লাসে উপস্থিত ছিলেন না তা বুঝতে রকেট সায়েন্সের প্রয়োজন হয় না। কেন বারবার বিধি ভেঙে প্রশান্তকে পরীক্ষায় বসার সুযোগ দেওয়া হল তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।

অতীতে ডব্লিউবিসিএসে নম্বর কেলেঙ্কেরিতে অভিযুক্ত প্রশান্ত আদৌ পরীক্ষায় বসেছিলেন নাকি পরীক্ষা না দিয়েই পাশ করে গিয়েছিলেন তা তদন্ত করে দেখারও দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। সূত্রের খবর, আইনের স্নাতকোত্তর কোর্সের প্রথম এবং দ্বিতীয় দুই সেমেস্টারের পরীক্ষা দিয়ে পাশ মার্কশিটও পেয়ে গিয়েছেন প্রশান্ত (রোল নম্বর- ২৪১০২৩১৪০০০৪, রেজিস্ট্রেশন নম্বর- ০৮১১৪০৬০১০০০৯)। জানা গিয়েছে, প্রথম সেমেস্টারে তাঁর এসজিপিএ-৯.১৩ এবং দ্বিতীয় সেমেস্টারে ৮.৬৩ পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের খবর, ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে এলএলএমের তৃতীয় সিমেস্টারের পরীক্ষা শুরু হবে। ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ফর্ম ফিলআপ চলবে। যদিও খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত রাজগঞ্জে বিডিও প্রশান্ত সেই পরীক্ষায় বসতে পারবেন কি না তা নিশ্চিত নয়।

জয়জিৎ অবশ্য জানিয়েছেন, বিধি ভেঙে কাউকে তাঁরা পরীক্ষায় বসতে দেবেন না। তাঁর কথায়, এলএলএমের ক্ষেত্রে প্রত্যেকেই বিধি মেনে ক্লাসে উপস্থিত থাকে না। তবে এলএলবি’র ক্ষেত্রে ক্লাসে উপস্থিতি কড়াকড়ি করা হয়ে থাকে। প্রশান্ত বিশেষ কেউ নন। যদি প্রয়োজনীয় উপস্থিতি না থাকে তাহলে ফর্ম ফিলআপ করতে দেওয়া হবে না বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘শুধু শুধু অপবাদ নেব না আমরা।' এখন একথা বললেও শুরু থেকে বিধি মানার ক্ষেত্রে কেন কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, কীভাবে প্ৰশান্ত বিধি ভেঙে একের পর এক পরীক্ষায় পাশ করলেন, সেসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর অবশ্য জয়জিতের কাছ থেকে মেলেনি।

শুধু আইনের ডিগ্রি নিয়েই থেমে থাকেননি প্রশান্ত। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় পিএইচডি'র কোর্স ওয়ার্কও করেছেন তিনি। সেখানেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি বলছে ‘কোর্স ওয়ার্ক' ছ’মাসের রেগুলার কোর্স। অন্য আর পাঁচটা কোর্সের মতো সেখানে নিয়মিত ক্লাস করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রশান্তকে ছ’মাস ধরে ক্লাস করতে দেখেননি কেউই। কোর্স ওয়ার্ক করতে হলে ছ’জন্য ছুটি নিতে হত প্রশান্তকে। নবান্ন সূত্রের খবর, প্রশান্ত টানা ছয় মাসের জন্য ছুটি নেননি। তাহলে কীসের ভিত্তিতে তিনি কোর্স ওয়ার্কের পরীক্ষায় বসার সুযোগ পেলেন, কে তাঁকে সুযোগ পাইয়ে দিল তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রশান্তর কোর্স ওয়ার্কের ফলাফলের স্বীকৃতির জন্য গত ২০২১ সালে ১ ডিসেম্বর বিভাগীয় গবেষক কমিটির জরুরি বৈঠক হয়। সেই বৈঠকেই প্রশান্তর ফলাফলকে মান্যতা দেওয়া হয়।

বিস্ময়কর বিষয় হল, ২০২১ সালে যখন প্রশান্ত কোর্স ওয়ার্ক করছেন তখন তিনি আইনের (রেগুলার কোর্স)-র ছাত্র। অর্থাৎ একইসঙ্গে দুটি রেগুলার কোর্সে পড়াশোনা করেছেন প্রশান্ত। যা আইনে কোনও ভাবেই সম্ভব নয় বলেই জানিয়েছেন শিক্ষাবিদরা।

এই বিষয়ে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন রেজিস্ট্রার তাপসকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কথা, “এ ক্ষেত্রে পদে পদে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ভাঙা হয়েছে। গোটা বিষয়টির তদন্ত হওয়া উচিত।”

সুবীরেশ ভট্টাচার্য উপাচার্য থাকাকালীনই একের পর এক আইন ও বিধি ভেঙে নানা অপকর্ম করেছেন প্রশান্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও আধিকারিকই প্ৰশান্ত ইস্যুতে মুখ খুলতে চাইছেন না। তবে প্রশান্তর কুকীর্তিতে জড়িতদের কঠোর শাস্তির দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। প্রশান্তর দুর্নীতি নিয়ে আলাদা তদন্ত কমিটি গঠনেরও দাবি উঠেছে।


Share