Indian Railways

চার দশক বাদে ফের বক্সা জঙ্গল দিয়ে ছুটবে ট্রেন, ব্যাঘ্র সংরক্ষণ নিয়ে উঠছে প্রশ্ন, ডুয়ার্সের স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত পরিবেশকর্মীরা

সেই সময়ের পর দীর্ঘ চার দশক পেরিয়ে গিয়েছে। এরপর চার দশক বাদে সেই রেলপথ পুনরুদ্ধারের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। আর তাতেই শুরু হয়েছে বির্তক। ডুয়ার্সের স্বাস্থ্য নিয়ে পরিবেশকর্মীরা চিন্তায় রয়েছে।

প্রতীকী চিত্র।
নিজস্ব সংবাদদাতা, রাজাভাতখাওয়া
  • শেষ আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৪:৫৬

সেই ৮০-এর দশক, তারপর আর রাজাভাতখাওয়া-জয়ন্তী রেলপথে আর চলেনি ট্রেন। বিভিন্ন সময় আলিপুরদুয়ারে ডলোমাইট, চা এবং কাঠ সংগ্রহ করা হত। এর ফলে ওই রেলপথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে পরিবেশ সংক্রান্ত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। তখন থেকেই বন্ধ হয়ে যায় ট্রেন চলাচল। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রেলপথের দু'ধারে জনবসতি গড়ে ওঠে।

সেই সময়ের পর দীর্ঘ চার দশক পেরিয়ে গিয়েছে। এরপর চার দশক বাদে সেই রেলপথ পুনরুদ্ধারের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। আর তাতেই শুরু হয়েছে বির্তক। ডুয়ার্সের স্বাস্থ্য নিয়ে পরিবেশকর্মীরা চিন্তায় রয়েছে। রেলপথের সংরক্ষণ এবং নতুন করে ট্রেন চালানোর উদ্যোগের কারণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

প্রসঙ্গত, ১৯৮৩ সাল বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প মান্যতা পাওয়ার পর থেকে রাজাভাতখাওয়া থেকে জয়ন্তী ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরিবেশের কথা ভেবেই ট্রেন চলাচল বন্ধের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। গত শুক্রবার একটি বিবৃতিতে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক কপিঞ্জলকিশোর শর্মা জানান, সংশ্লিষ্ট রেলপথ পুনরুদ্ধারের জন্য ১৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। ১৫.১৩ কিলোমিটার রেলপথ সংস্কার হলে আবার রাজাভাতখাওয়া থেকে জয়ন্তী পর্যন্ত ট্রেন ছুটবে। ওই রেলপথ ঘিরে যে সকল বসতি রয়েছে, সেগুলো অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। এই ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

প্রশ্ন উঠছে, যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য রাজাভাতখাওয়া-জয়ন্তীর রেলপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, সেই বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ কীভাবে হবে? যে রেলপথ জয়ন্তীতে গিয়ে শেষ হচ্ছে, সেখানে কাদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা করল রেল মন্ত্রক? ব্যাঘ্র প্রকল্পের মাঝখান দিয়ে ট্রেন ছুটিয়ে আখেরে কার কী লাভ?

উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের আলিপুরদুয়ার ডিভিশনের ডিআরএম দেবেন্দ্র সিংহ বলেন, ‘‘রেলপথটি পুনর্নির্মাণের জন্য ১৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে।এর বাইরে সম্পূর্ণ রিপোর্ট বা আরও কোনও তথ্য আমাদের হাতে পৌঁছোয়নি।’’ বন দফতরের ছাড়পত্র কি আছে? ডিআরএমের জবাব, ‘‘এখনও সে সব নিয়ে আলোচনা হয়নি। ছাড়পত্র বা বাকি যে সব ক্লিয়ারেন্স প্রয়োজন, সেগুলো নিয়ে আলোচনা হবে।’’ কিন্তু শুধুমাত্র পর্যটনের সুবিধার জন্য এমন উদ্যোগ নেওয়া হল কি না, রেলের তরফ থেকে সেই সদুত্তর দেওয়া হয়নি।

সংশ্লিষ্ট কাজে অর্থ বরাদ্দের আগে পরিবেশের উপর প্রভাব সংক্রান্ত কোনও সমীক্ষা করা হয়েছিল কি না, কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রক ছাড়পত্র দিয়েছে কি না-সমেত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর বা ব্যাখ্যা উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের কাছে নেই। এ হেন পরিস্থিতিতে বন্যপ্রাণের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন পরিবেশ এবং বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ সংগঠন চিন্তিত।

বন্ধ হয়ে যাওয়া এই রেলপথ দিয়ে রাজ্যের প্রাক্তন পর্যটনমন্ত্রী গৌতম দেব এক সময় টয় ট্রেন চালানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। রেলের এই বিবৃতির পর তৃণমূল নেতা বলছেন, ‘‘রাজাভাতখাওয়া থেকে জয়ন্তী পর্যন্ত যে রেললাইনটি রয়েছে, ওই জায়গাটি ভীষণই সুন্দর। পর্যটনের স্বার্থে সেখানে ছোট ট্রেন চালানোর প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু তার বাস্তবায়ন হয়নি।’’ শিলিগুড়ির মেয়র দাবি করেন, এই ঘোষণার নেপথ্যে রাজনীতি রয়েছে। সামনেই পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোট। তার আগে এমন নানাবিধ ঘোষণা এবং পরিকল্পনার কথা বলে মানুষকে আকর্ষিত করার চেষ্টা করছে বিজেপি। তাতে পরিবেশের উপর কী প্রভাব পড়বে কিংবা আদৌ মানুষের কাজে কতটা আসবে, সে নিয়ে ভাবনাচিন্তাই করা হয়নি।

যদিও আলিপুদুয়ারের বিজেপি সাংসদ মনোজ টিগ্গার দাবি, মানুষের কথা ভেবে সুচিন্তিত ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওই রেলপথ ফের চালু হলে আঞ্চলিক অর্থনীতির উন্নয়ন হবে। তবে বিতর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘রাজ্য এবং কেন্দ্র, দুই সরকার মিলে এই সিদ্ধান্ত নেবে। সকলের ভালর জন্য যা হবে সে-ই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’’

বক্সার ব্যাঘ্র প্রকল্প দিয়ে রেলপথ চালু হলে পর্যটনে তার সুফল কতটা মিলবে তা নিয়ে পেশাদার এবং বিশেষজ্ঞেরাও দ্বিধায় রয়েছেন। হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজ়ম ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের সম্পাদক সম্রাট সান্যাল বলেন, ‘‘আগে এই পথে ট্রেন চলত এটা সত্যি। কিন্তু বক্সার টাইগার রিজার্ভ ঘোষণার পর পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের কথা ভেবেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ট্রেন। সে সব মাথায় রেখে নিশ্চয়ই রেলের তরফে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। আমার মনে হয় বন এবং পরিবেশ দফতরের সঙ্গে কথা বলেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।’’

বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের ফিল্ড ডিরেক্টর অপূর্ব সেন জানান, তাঁদের কাছে এই মুহূর্তে নিয়ে কোনও তথ্য নেই। রেল থেকে এ সংক্রান্ত কোনও চিঠিও পাননি।


Share