Jagannath Chatterjee

সাত দিন পর যাদবপুর-কাণ্ডে মুখ খুললেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী, ‘উটকো ঝামেলা’ বন্ধ করে শান্তির বার্তা জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের

এরপর থেকেই বাম ও দক্ষিণপন্থী শিবিরের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। ঘটনার পর থেকে বিজেপি নেতৃত্ব যাদবপুরের বামপন্থী ছাত্রদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলেছে।

উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০২৬ ০৭:২৫

প্রায় সাত দিন পর যাদবপুর কাণ্ড নিয়ে মুখ খুললেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। গত বুধবার সন্ধ্যা থেকেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনা ছড়ায়। গভীর রাতে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি)-এর বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে হামলার অভিযোগ ওঠে। এরপর থেকেই বাম ও দক্ষিণপন্থী শিবিরের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। ঘটনার পর থেকে বিজেপি নেতৃত্ব যাদবপুরের বামপন্থী ছাত্রদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলেছে। তবে উচ্চশিক্ষামন্ত্রী সেই বিতর্কে না গিয়ে ক্যাম্পাসে দ্রুত শান্তি ও স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার পক্ষেই সওয়াল করেছেন।

এ দিকে, ক্যাম্পাসে শান্তি ফেরাতে সব পক্ষকে নিয়ে সোমবার রাতে যে বৈঠক ডাকা হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত অসম্পূর্ণই থেকে যায়। পড়ুয়াদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ফের এক দফা আলোচনা হতে পারে বলে জানা গিয়েছে। এর মধ্যেই এ দিন পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে যায়। রেজিস্ট্রার সেলিমবক্স মণ্ডলের সঙ্গেও পুলিশের কথা হয়েছে বলে খবর।

মঙ্গলবার জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে উপাচার্যদের কর্মশালায় যোগ দিয়েছিলেন। সেখানেই সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি স্পষ্ট বলেন, “কোনও প্ররোচনা বা তার প্রতি-প্ররোচনায় যা যা ঘটে চলেছে তার নিন্দা করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, গবেষক এবং অন্যদের কাছে আমার আবেদন, শান্তি বজায় রাখুন। শিক্ষা ও উৎকর্ষের পীঠস্থান হিসাবে নিজের স্থান ধরে রাখতে হলে যাদবপুর ক্যাম্পাসে শান্তি বজায় রাখতে হবে। এ ধরনের উটকো ঝামেলার কারণে যেন সারা বিশ্বে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বদনাম না হয়।”

গত ১৯ অগস্ট গভীর রাত থেকেই উত্তপ্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। যাদবপুরের বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বহিরাগতদের তাণ্ডবে ইন্ধন জোগানোর অভিযোগ উঠেছিল। একইসঙ্গে, ঘটনার সময় যাদবপুরের প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য তথা গণিতের অধ্যাপক বুদ্ধদেব সাউয়ের উপস্থিতির প্রমাণ সিসি ক্যামেরার ফুটেজে মিলেছে বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে ঘটনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ঘটনার পরের দিন, শুক্রবার রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত শিক্ষার উৎকর্ষ নিয়ে বক্তব্য রাখেন। তিনিও বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে শান্তি ও স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার পক্ষে সওয়াল করেন। তবে যাদবপুর-কাণ্ডের সূত্র ধরে বার বার সামনে এসেছে জাতীয়তাবাদ বনাম বামপন্থার বিতর্ক। দক্ষিণপন্থী পড়ুয়া ও শিক্ষকদের একাংশের অভিযোগ, যাদবপুর ক্যাম্পাসে দেশবিরোধী স্লোগান দেওয়া এবং পোস্টার লেখার ঘটনা ঘটে। স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মনও এই প্রসঙ্গে দেশবিরোধিতার অভিযোগের কথা তুলে ধরেছেন।

সোমবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও মুখ খুলেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগের ছাত্রদের হস্টেল চত্বরে দেশবিরোধী দেওয়াল লিখন ও ছবি রয়েছে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কোনও ভাবেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিসরকে বিকৃত প্রচার বা ভারত-বিরোধী মনোভাব ছড়ানোর মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। তবে মুখ্যমন্ত্রীর এই অভিযোগ নিয়ে উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় কোনও মন্তব্য করেননি। তাঁর বক্তব্য, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের উচ্চশিক্ষা, উৎকর্ষ ও গবেষণার অন্যতম পীঠস্থান। উচ্চশিক্ষা দফতর চায়, অতীতের গৌরব ও সুনাম বজায় রেখেই ভবিষ্যতেও যাদবপুর তার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখুক।

ক্যাম্পাসে শান্তি ফেরাতে সোমবারই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সব পক্ষকে নিয়ে বৈঠকে বসেছিল। তবে বৈঠক শুরুর আগেই দক্ষিণপন্থী ছাত্র ও শিক্ষক-কর্মীদের একাংশ সেখান থেকে বেরিয়ে যান। পরে বামপন্থী পড়ুয়াদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের বৈঠকও কার্যত নিষ্ফল হয়। পড়ুয়াদের ঘেরাওয়ের মধ্যে নিরাপত্তারক্ষীরা উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্যকে বার করে আনার চেষ্টা করেন। সেই সময় অরবিন্দ ভবনের বারান্দায় উপাচার্য কোনও ভাবে পড়ে যান। জানা গিয়েছে, ঘটনায় তাঁর হাঁটুতে চোট লেগেছে।

মঙ্গলবার পড়ুয়ারা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, নিজেদের দাবিতে তাঁরা অনড়। এসএফআই-এর তরফে অঞ্জিল দাস জানান, সোমবারের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী ২৭ অগস্ট তদন্ত কমিটির প্রথম বৈঠক হবে। সেখানে পড়ুয়ারা তাঁদের দাবি জানাতে পারবেন। কিন্তু পড়ুয়ারা চেয়েছিলেন কমিটিতে ছাত্র প্রতিনিধিদের রাখা হোক। কর্তৃপক্ষ সে দাবি মানেননি। অঞ্জিল বলেন, “তদন্ত কমিটির সদস্য হিসাবে পড়ুয়াদের অন্তর্ভুক্তি না করালেও পর্যবেক্ষক হিসাবে আমাদের রাখা হোক। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বা অন্য কোনও তথ্য যেন বিকৃত না করা হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য নিরপেক্ষতা প্রয়োজন। আমরা জানি, অনেক রকম চাপ থাকবে কর্তৃপক্ষের উপর, সে জন্যই আমরা থাকতে চাইছি।”

সোমবার পড়ুয়ারা দাবি করেছিলেন, অধ্যাপক বুদ্ধদেব সাউয়ের ভূমিকা নিয়ে যেহেতু প্রশ্ন উঠেছে, তাই তাঁকে ‘স্টুডেন্টস গ্রিভান্স রিড্রেসাল সেল’-এর চেয়ারম্যান-সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত প্রশাসনিক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হোক। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বামপন্থী পড়ুয়ারা তাঁকে কোনও ক্লাস না নেওয়ার দাবিও জানিয়েছিলেন। তবে কর্তৃপক্ষ সেই দাবি সরাসরি মেনে নেয়নি। পরিবর্তে ‘স্টুডেন্টস গ্রিভান্স রিড্রেসাল সেল’ ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

ছাত্রনেতা অঞ্জিলের দাবি, যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি কোনও অভিযোগ নিষ্পত্তির কমিটির সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন না। তাঁর অভিযোগ, ‘‘ছাত্রদের খুন করার যে যড়যন্ত্র করা হয়েছিল, হয়তো ওই অধ্যাপক সেখানে ‘মাস্টারমাইন্ড’। তাই তাঁর মতো পক্ষপাতদুষ্ট মানুষের কাছেছাত্রছাত্রীরা কোনও অভিযোগ জানাতে যাবেন এটা হতেই পারে না।’’ এই দাবিতেও পড়ুয়ারা এখনও অনড় রয়েছেন।

যদিও মঙ্গলবার বুদ্ধদেব সাউ দাবি করেন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতেই সমস্যা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমি খুব খুশি যে এই দায়িত্ব আমাকে আর নিতে হবে না। আমাকে আর কাউকে শাস্তি দিতে হবে না। কারণ প্রবেশিকা পরীক্ষায় যে দুর্নীতি হয়, তা আমি ধরে ফেলেছিলাম। সে কারণে তাঁরাই ভয় পেয়ে আমাকে ওই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছেন।”

পড়ুয়ারা তাঁদের দাবিতে এখনও অনড়। তাঁদের দাবি, ওই রাতের ঘটনার সময় সিসি ক্যামেরায় যাঁদের দেখা গিয়েছে, তদন্ত চলাকালীন তাঁদের যেন ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না দেওয়া হয়। তদন্তের প্রয়োজনে শুধুমাত্র জিজ্ঞাসাবাদ বা তদন্তের মুখোমুখি হতে তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার অনুমতি দেওয়া হোক। এই বিষয়ে এখনও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অবস্থান স্পষ্ট নয়। পড়ুয়ারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকের অপেক্ষায় রয়েছেন।

সোমবার রাতেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিসি ক্যামেরার ফুটেজের কিছু অংশ পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিল। মঙ্গলবার আরও কিছু ফুটেজ দেখতে চাওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এ দিকে, পঠনপাঠন ও গবেষণার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে সোমবারই সমস্ত পক্ষের কাছে আবেদন জানিয়েছে শিক্ষক সংগঠন জুটা।


Share