Mamata Banerjee

অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে প্রতারণা করেছে বিজেপি! অভিযোগ মমতার, পাল্টা জবাব মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর

অন্য দিকে, মমতার ‘যোগ্য-অযোগ্য’ প্রশ্নকে সামনে রেখে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পাল্টা তৃণমূল সরকারের দিকেই আঙুল তুলেছেন। ফলে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র টাকা নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও তীব্র হয়েছে।

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২৪ আগস্ট ২০২৬ ১০:৫৩

পশ্চিমবঙ্গে মহিলাদের জন্য ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্প চালু করেছিল তৃণমূল সরকার। অন্য দিকে, বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’। বিজেপির দাবি ছিল, এই প্রকল্পে রাজ্যের মহিলাদের মাসে তিন হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। কিন্তু বর্তমানে সেই টাকা না পাওয়ার অভিযোগ তুলে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে মহিলারা বিক্ষোভে সামিল হচ্ছেন। কোথাও রেল অবরোধ, কোথাও আবার বিডিও অফিস ঘেরাও করে প্রতিবাদ চলছে। এই পরিস্থিতিতে বিক্ষোভকারী মহিলাদের পাশে দাঁড়িয়ে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বিজেপি সরকার। অন্য দিকে, মমতার ‘যোগ্য-অযোগ্য’ প্রশ্নকে সামনে রেখে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পাল্টা তৃণমূল সরকারের দিকেই আঙুল তুলেছেন। ফলে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র টাকা নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও তীব্র হয়েছে।

তৃণমূল জমানায় যাঁরা লক্ষ্মীর ভান্ডারের সুবিধা পেতেন, তাঁদের প্রত্যেকেই যে বর্তমানে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পাবেন, এমনটা নয়। শুভেন্দুর সরকার শুরু থেকেই জানিয়েছে, লক্ষ্মীর ভান্ডারের উপভোক্তাদের যাচাই-বাছাইয়ের পর যাঁরা যোগ্য, তাঁরাই অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা পাবেন। এই প্রকল্পের জন্য নতুন করে আবেদনও করতে হয়েছে। তবে অভিযোগ, আবেদন করার পরেও বহু মহিলা এখনও অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পাচ্ছেন না। এই পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশ্ন, অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতার মাপকাঠি ঠিক করবে কে? বিজেপিই কি সেই সিদ্ধান্ত নেবে?

সোমবার ফেসবুক লাইভে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিক বিষয় নিয়ে বক্তব্য রাখেন। অন্নপূর্ণা যোজনায় ‘বঞ্চিত’ মহিলাদের পাশে থাকার বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি শুভেন্দুর সরকারের বিরুদ্ধে তিনি তীব্র সমালোচনা করেন। মমতার অভিযোগ, অন্নপূর্ণা যোজনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষকে ‘প্রতারিত’ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, নির্বাচনের আগে বিজেপির কর্মী ও এজেন্সির প্রতিনিধিরা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে মহিলাদের দিয়ে অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য ফর্ম পূরণ করিয়েছিলেন। সেই সময় বিজেপি ক্ষমতায় এলে এই প্রকল্পের সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও কোনও শর্ত বা যোগ্যতার মাপকাঠির কথা জানানো হয়নি বলে দাবি মমতার। মমতার প্রশ্ন, ‘‘নির্বাচনের আগে বিজেপির কর্মী বা এজেন্সি এলাকায় এলাকায় গিয়ে মা-বোনেদের দিয়ে ফর্মফিলাপ করিয়েছিলেন, প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বিজেপি ক্ষমতায় আসলে অন্নপূর্ণা যোজনা দেবে। তখন কোনও কারণ বা শর্ত আরোপ ছিল না। আর এখন আপনারা বলছেন, যোগ্যতা নেই। কই সে দিন তো যোগ্যতার কথা বলেননি! বিজেপি ঠিক করবে কার যোগ্যতা আছে আর কার নেই!’’ তাঁর কথায়, ‘‘দেখে, দেখে, চেখে চেখে দিচ্ছেন। বর্ণ দেখে দিচ্ছেন।’’

লক্ষ্মীর ভান্ডারের সঙ্গে তুলনা টেনেছেন মমতা। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা প্রায় দু'কোটি ৪২ লক্ষ মা-বোনকে লক্ষ্মীর ভান্ডার দিতাম। নির্বাচনের আগে মার্চ মাসেও দিয়েছি।’’ তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাঁর লক্ষ্মীর ভান্ডারের সঙ্গে বিজেপির সরকারের অন্নপূর্ণা যোজনার পার্থক্যটা কোথায়! কেন তিনি লক্ষ্মীর ভান্ডার চালু করেছিলেন, তা-ও মনে করিয়ে দেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘আমি বার বার বলতাম, আজও বলছি, আমাদের সরকার থাকলে লক্ষ্মীর ভান্ডার থাকবে। কোনও প্রকল্প করতে গেলে আগে টাকাটা জমা রাখতে হয়। আমরা লক্ষ্মীর ভান্ডার করেছিলাম মা-বোনেদের আত্মসম্মান, আত্মমর্যাদা, আত্মনির্ভরতা এবং নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য।’’

তৃণমূল সরকারের আমলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় বঞ্চনা নিয়েও সরব হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, তাঁর সরকারের সময়ে কেন্দ্র একাধিক প্রকল্পের টাকা ইচ্ছাকৃত ভাবে আটকে রেখেছিল। তবে বর্তমানে সেই সমস্যা নেই বলেই দাবি করেন তিনি। তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ কেন সরকারি পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, মমতা সেই প্রশ্ন তোলেন। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘‘১০০ দিনের প্রকল্পে টাকা দেননি, গ্রামীণ উন্নয়নে টাকা দেননি, সড়ক যোজনায় টাকা দেননি। আজ আপনারা তো টাকা পাচ্ছেন। টাকা যাচ্ছে কোথায়? অন্নপূর্ণা যোজনায় টাকা দিন সাধারণ মানুষকে।’’ তাঁর অভিযোগ, বিজেপি সরকার বেছে বেছে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা দিচ্ছে।

অন্নপূর্ণা যোজনা থেকে যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাসও দেন মমতা। তিনি বলেন, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যাঁরা প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন না, তাঁদের নাম, ঠিকানা, বুথ এবং পেশা-সহ তালিকা তৈরি করতে হবে। পরে তৃণমূলের তরফে একটি ব্যবস্থা করে সেই তথ্য সংগ্রহ করা হবে বলেও তিনি জানান। মমতা আরও বলেন, কোনও প্রকল্প চালু বা বাস্তবায়ন করতে হলে আগে থেকেই তার জন্য অর্থের সংস্থান রাখতে হয়। মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পাল্টা কটাক্ষ করেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, মমতা ‘বিরাট বাজেট’ বোঝেন বলেই রাজ্যের উপর আট লক্ষ কোটি টাকার ঋণের বোঝা রেখে গিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, সরকারি কর্মীদের ডিএ না দিয়ে শুধু বড় বড় কথা বলা হয়েছে।

যাদবপুরের ঘটনায় বিজেপি সরকারের ভূমিকা নিয়েও সরব হয়েছেন মমতা। তাঁর কথায়, ‘‘যাদবপুরে গিয়ে তাণ্ডব করে এলেন। মনে রাখবেন যাদবপুর ভারতের মধ্যে র‌্যাঙ্কিংয়ে নম্বর ওয়ান। আমার সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতে পারে। কখনও কখনও হয়েছে। তবে আমি কখনও তাঁদের অশ্রদ্ধা করিনি। কারণ ওঁরা আমার বন্ধু। ওঁরা ছাত্রছাত্রী। ওঁরা যখন অনশন করছিলেন, তখন আমি ওঁদের কাছে ছুটে গিয়েছিলাম।’’

মমতার অভিযোগ, বেছে বেছে তৃণমূল বিশেষত কালীঘাটপন্থী তৃণমূলকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। পুলিশের ‘অতিসক্রিয়তা’ নিয়ে অভিযোগ তৃণমূলনেত্রীর। এ-ও জানান, তাঁর কোনও কর্মসূচিতে অনুমতি দিচ্ছে না পুলিশ। আদালত থেকে অনুমতি আনতে হচ্ছে। তাঁর কথায়, ‘‘২৮ অগস্টের জন্য অনুমতি চেয়েছি। কিন্তু এখনও পর্যন্ত অনুমতি পাইনি। সকলকে ভয় দেখানো হচ্ছে।’’ মমতার হুঙ্কার, ‘‘বিজেপির নেতারা যদি ভেবে থাকেন মিটিংয়ের অনুমতি আমাকে দেবেন না, তা হলে আমি সন্ন্যাস গ্রহণ করব, ভুল ভাবছেন। আমি সন্ন্যাসী নই। মনে রাখবেন, বিজেপিকে সন্ন্যাসে না পাঠানো পর্যন্ত আমাদের লড়াই থামবে না।’’

হকার উচ্ছেদ এবং বুলডোজার চালানোর বিরোধিতাতেও সরব হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন হকারদের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা করা হচ্ছে না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। মমতার অভিযোগ, ‘‘লক্ষ লক্ষ হকারকে উচ্ছেদ করে তাঁদের জীবন-জীবিকা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আমরা হকারদের জন্য আইডি কার্ড করে দিয়েছিলাম। আপনারা যাঁদের টাকা আছে, তাঁদের দালালি করছেন।’’ এর পরেই বিজেপিকে কটাক্ষ করে তৃণমূলনেত্রী বলেন, ‘‘কেউ কেউ বলেন, নির্বাচনে জিতলে চার মাস ‘হানিমুন পিরিয়ড’ চলে। কিন্তু এখন তো ‘মানিমুন পিরিয়ড’ চলছে। বিজেপি কর্মীদের গিয়ে জিজ্ঞাসা করুন।’’ মমতার আরও অভিযোগ, রাজ্যে বর্তমানে শুধু নাম বদলের রাজনীতি চলছে। তাঁর দাবি, উন্নয়নের কাজ কার্যত থমকে গিয়েছে।

দিল্লি পুলিশের ছর্‌রা গুলি ছোড়ার ঘটনায় দায়ের হওয়া এফআইআরের নেপথ্যে তৃণমূল নেতা সাকেত গোখলের করা আরটিআই রয়েছে বলে দাবি করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা আরটিআই করেছিলাম। সাকেত করেছিল। তার উপরই কেস হয়েছে।’’ এ দিন জনগণনা নিয়েও মমতা সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। অন্য দিকে, অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে মমতার অভিযোগের জবাব দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর প্রশ্ন, ‘‘কী হয়েছে অন্নপূর্ণাতে? যাঁরা যোগ্য পাবেন। যাঁরা যোগ্য, তাঁরা পেয়েছেন। তৃণমূল না বিজেপি, দেখা হয়নি। বাছাবাছি উনি করেছেন।’’ শুভেন্দুর বক্তব্য, যোগ্য-অযোগ্য সব কিছুতেই রয়েছে।


Share