Encounter

বিজেপি কর্মী সুজিত মণ্ডলের দেহের ডিএনএ রিপোর্ট এসেছিল কিছুদিন আগেই, ভুটু মার্কেটের সেই ঘরেই হয়েছে এনকাউন্টার, তদন্ত করছিল সিআইডি

দুপুর ২টো ৪৫ মিনিট নাগাদ পুলিশ কর্মীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু করে। সূত্রের খবর, অভিযোগ, সেই ধস্তাধস্তির মধ্যেই পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেয়। এমনকী, তিন রাউন্ড গুলি চালায় বলেও অভিযোগ। আত্মরক্ষার জন‍্য সামাউনকে রক্ষা করে পাল্টা গুলি চালায় পুলিশ।

বিজেপি কর্মী সুজিত মণ্ডল।
নিজস্ব সংবাদদাতা, শমসেরগঞ্জ
  • শেষ আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৩৩

গত ২৮ অগস্ট শমসেরগঞ্জে বিজেপি কর্মী সুজিত মণ্ডল খুন হন। নিখোঁজ তিনি হননি, খুন হয়েছিলেন বলে পুলিশ জানতে পারে। তার পরে দেহ টুকরো টুকরো করে খালের জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। সেই খালে তল্লাশি করে কাটা পা উদ্ধার হয়। খুনের ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ তিন জনকে গ্রেফতার করে।

পুলিশ সূত্রের খবর, খালের জল থেকে যে কাটা পা উদ্ধার করা হয়েছিল তা ধুলিয়ানের মৃত বিজেপি করি সুজিত মন্ডেলরই ছিল। কিন্তু দেহের বাকি অংশ না মেলায় উদ্ধার হওয়া পা’টি যে সুজিতের দেহের অংশ ছিল তা নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা জরুরি হয়ে পড়ে। সেই পরীক্ষার রিপোর্ট কিছুদিন আগেই সিআইডির আধিকারিকদের হাতে আসে। তবে দেহাংশটি সুজিতের বলেই পুলিশ জানতে পেরেছে। তবে সেই রিপোর্ট আসার পরেই এই এনকাউন্টার কি না তা স্পষ্ট নয়। এখনও পর্যন্ত পুলিশের তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

পুলিশ সূত্রের খবর, মঙ্গলবার দুপুরের দিকে সামাউন শেখকে ডাকবাংলো এলাকার ভুটু মার্কেটের যে ঘরে সুজিত মণ্ডলকে খুন করে দেহ টুকরো-টুকরো করে কাটা হয়েছিল সেখানে নিয়ে আসেন সিআইডির তদন্তকারীরা। ঘটনার দিন কী ঘটেছিল তা পুননির্মাণ করার চেষ্টা করছিলেন সিআইডির আধিকারিকেরা। দুপুর ২টো ৪৫ মিনিট নাগাদ পুলিশ কর্মীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু করে। সূত্রের খবর, অভিযোগ, সেই ধস্তাধস্তির মধ্যেই পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেয়। এমনকী, তিন রাউন্ড গুলি চালায় বলেও অভিযোগ। আত্মরক্ষার জন‍্য সামাউনকে রক্ষা করে পাল্টা গুলি চালায় পুলিশ। তাতেই সামাউন জখম হয়। উদ্ধার করে জঙ্গিপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়।

এ দিকে, সুজিত মণ্ডলের তদন্তভার সিআইডির হাতে যাওয়ার পর মঙ্গলবারই শমসেরগঞ্জে পৌঁছোয় বিশেষ তদন্তকারী দল। সিআইডির আধিকারিক তাপস মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আধিকারিকেরা প্রথমে ভুটু মার্কেটের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে ফারাক্কার ফিডার ক্যানেল এলাকা ঘুরে দেখেন তাঁরা। এরপর সুজিতের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন তদন্তকারীরা। এই দলে ছিলেন ইন্সপেক্টর অক্ষয় পাল, ইন্সপেক্টর কালেকুজ্জামান এবং মুর্শিদাবাদের ডিএসপি।

কী ঘটেছিল?

গত ২৮ অগস্ট সুজিত মন্ডল নিখোঁজ হয়। তার আট ঘটনার মধ্যেই পুলিশ মামলা রুজু করে। শমসেরগঞ্জ থানায় নিখোঁজ ডায়েরি মামলা রুজু করে শুরু হয় তদন্ত। এলাকার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখে পুলিশ জানতে পারে, ২৮ অগস্ট সকাল ৭টা ৩৮ মিনিটে সুজিতকে নিয়ে এক ব্যক্তি ধুলিয়ান ডাকবাংলো মোড়ের একটি ভাড়া বাড়িতে ঢোকে। তার পরের গতিবিধি দেখে পুলিশের সন্দেহ হয়। তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, বাড়িতে ঢোকার কয়েক ঘণ্টা পরেই সুজিতকে খুন করা হয়েছে। ওই দিন দুপুর দেড়টা নাগাদ মোটরবাইকে করে একটি বস্তায় ভরে প্রথম বার সুজিতের শরীরের কিছু অংশ ফেলে আসে ওই ব্যক্তি। ফের ওই দিন দুপুর ২টো ৫৫ মিনিটে বাকি অংশ ফেলে দিয়ে আসা হয়।

ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ সামাউল শেখ, তাজকিরা বিবি এবং জনি শেখ নামে তিন জনকে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে সামাউলকেই সুজিতকে বাইকে বসিয়ে নিয়ে যেতে দেখা গিয়েছে। তার পরে বস্তা নিয়ে মোটরবাইকে করে বেরোতেও দেখা গিয়েছে। তিন ধৃতকে আদালতে পেশ করা হয়েছে। পুলিশ ধৃতদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেই খুনের জট খুলেছে বলে জেলা পুলিশের একটি সূত্র বলছে।

পুলিশ সূত্রের খবর, অপরাধীরা খুনের পরে নতুন ছক সাজিয়েছিল। সুজিতকে অপহরণ করা হয়েছে বলে তাঁর বাড়িতে ফোন করে মুক্তিপণ চাওয়া হয়। সুজিতকে খুন করে তাঁর মোবাইল থেকে সিম খুলে তাজকিরার মোবাইল থেকে ফোন করা হয়। পুলিশ সেই ফোন ট্র্যাক করে দুষ্কৃতীদের টাওয়ারের অবস্থান জানতে পারে। গত ২৯ অগস্ট গভীর রাতে ডাকবাংলো মোড়ের ভাড়া বাড়ি থেকে সামাউল হক ও তাজকিরা বিবিকে পুলিশ গ্রেফতার করে। তাঁদের পাঁচ দিনের পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জেরা করে জনি শেখকে গ্রেফতার করা হয়।

টাকাপয়সা লেনদেনের জেরে এই খুন হয়েছে বলে অনুমান করছে পুলিশ। খুনে মূল অভিযুক্ত সামাউল হক মুর্শিদাবাদের ফরাক্কা এলাকার বাসিন্দা। তার একটি কাপড়ের দোকান রয়েছে। তার আগে বিড়ি কারখানাতে গাড়ি চালাতো সামাউল। সেখানেই সুজিতের সঙ্গে পরিচয় হয়। সেই সুবাদে সুজিতের কাছ থেকে বেশ কয়েক হাজার টাকা ধার নিয়েছিল সামাউল। সেই পাওনা টাকা ফেরত চাওয়া নিয়ে ঝামেলা শুরু হয়। তার জেরেই বিজেপি কর্মী সুজিতকে খুন হতে হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছিল, সামাউলের সঙ্গে তাজকিরার সম্পর্ক। জনি শেখ তাজকিরার ছোট জামাই। গত সাত-আট মাস ধরে সামাউল ও তাজকিরা নিজেদের স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে ধুলিয়ানে একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকছিল। তাজকিরার ছোট জামাই জনি শেখ পরিযায়ী শ্রমিক। কাজের সূত্রে সিকিমে কাজ করত। বিজেপি কর্মী সুজিতকে খুনের পরিকল্পনা করা হয়। তার জন্য জনি শেখকে সিকিম থেকে ডেকে নিয়ে আসা হয়েছিল।


Share