Drug Seizures

গুজরাত এবং দিল্লি থেকে উদ্ধার ‘জেহাদি মাদক’! ২২৭ কেজি ক‍্যাপ্টাগন সমেত গ্রেফতার সিরিয়ার নাগরিক

বিশ্বজুড়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলি সতর্ক করেছে যে, ক্যাপ্টাগন পাচারে এখন অত্যন্ত আধুনিক চোরাচালান পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে— সমুদ্রপথ, জাল নথি এবং হাওলা চক্রের মতো জটিল আর্থিক নেটওয়ার্ক।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১৭ মে ২০২৬ ১১:৫৮

বিপুল পরিমাণে মাদক বাজেয়াপ্ত করল নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো। বাজেয়াপ্ত করা মাদকের নাম ক‍্যাপ্টাগন। এটাকে ‘জেহাদি মাদক’ বলা হয়ে থাকে। দিল্লি এবং গুজরাতে অভিযান চালিয়ে ২২৭ কেজি ক‍্যাপ্টাগন ট‍্যাবলেট এবং পাউডার বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এনসিবি জানিয়েছে, এর বাজারমূল্য ১৮২ কোটি টাকা। ঘটনায় এক সিরিয়ার নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই প্রথমবার দেশে এত বড় আকারে ‘ক্যাপ্টাগন’ মাদক এনসিবি বাজেয়াপ্ত করল।

নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো জানিয়েছ, একটি বিদেশি মাদকবিরোধী সংস্থার কাছ থেকে মাদকপাচার সংক্রান্ত তথ্য পেয়েছিল। তদন্তকারীরা জানতে পারেন, ভারতকে ‘ক্যাপ্টাগন’ পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এরপর ‘অপারেশন র‍্যাগপিল’ নামে একটি অভিযান শুরু করে। দক্ষিণ দিল্লির নেবসরাই এলাকার একটি বাড়িকে চিহ্নিত করা হয়। গত ১১ মে ওই বাড়িতে এনসিবির আধিকারিকেরা তল্লাশি অভিযান চালায়। সেখানে একটি চাপাটি কাটার মেশিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা মাদকের হদিশ পায়। সেখান প্রায় সাড়ে ৩১ কেজি ক্যাপ্টাগন ট্যাবলেট বাজেয়াপ্ত করা হয়। 

দিল্লির ওই ভাড়া বাড়ি থেকে এক সিরিয়ার নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়। তদন্তকারীরা জানতে পারেন, ধৃত ২০২৪ সালের ১৫ নভেম্বর পর্যটক ভিসায় ভারতে প্রবেশ করেন। কিন্তু ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে। এর পরেও ওই সিরিয়ার নাগরিক অবৈধ ভাবে ভারতে বসবাস করছিল। দিল্লির নেব সরাইয়ের ওই বাড়িটি ভাড়া নিয়ে থাকত বলে জানতে পেরেছেন তদন্তকারীরা।

ধৃত সিরিয়ার নাগরিককে জেরা করে এনসিবির গোয়েন্দারা। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গুজরাতের একটি লোকেশন জানতে পারেন তাঁরা। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই গত ১৪ মে মুন্দ্রা বন্দরের কনটেনার ফেসিলিটেশন স্টেশনে অভিযান চালানো হয়। সেখানকার একটি কনটেনারের মধ্যে আরও ১৯৬.২ কেজি ক্যাপ্টাগন পাউডার উদ্ধার হয়। এনসিবি জানিয়েছে, ওই কনটেনারটি সিরিয়া থেকে এসেছিল। কাগজে-কলমে কনটেনারে মধ্যে ভেড়ার উল মজুত থাকার কথা উল্লেখ ছিল। তল্লাশি চালিয়ে তিনটি ব্যাগ থেকে এই বিপুল পরিমাণ ক্যাপ্টাগন পাউডার উদ্ধার হয়।

প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, এই বিপুল পরিমাণ ‘ক‍্যাপ্টাগন’ সৌদি আরবের জেদ্দায় পাঠানোর পরিকল্পনা করা ছিল। যার বাজারমূল্য ১৮২ কোটি টাকা। ক্যাপ্টাগন ট্যাবলেটে মূলত ফেনেথাইলিন ও অ্যামফিটামিন জাতীয় সাইকোট্রপিক মাদক পদার্থ থাকে। যা ভারতে মাদক আইনের অধীনে নিষিদ্ধ।

সমাজমাধ্যমে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, “‘অপারেশন র‍্যাগপিল’-এর মাধ্যমে আমাদের সংস্থাগুলি প্রথম বারের মতো তথাকথিত ‘জিহাদি ড্রাগ’ ক্যাপ্টাগন আটক করতে সফল হয়েছে। এর বাজারমূল্য ১৮২ কোটি টাকা। মধ্যপ্রাচ্যে পাচারের উদ্দেশ্যে পাঠানো মাদক বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এক বিদেশি নাগরিকের গ্রেফতার করা হয়েছে। এটাই আমাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির উজ্জ্বল উদাহরণ।” ভারতকে মাদক পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। 

কী এই ‘ক্যাপ্টাগন’?

ক্যাপ্টাগনের মূল উপাদান ফেনেথাইলিন। এটি এক সময় ওষুধের হিসেবে ব্যবহার করা হত। ১৯৬০-এর দশকে মনোযোগজনিত সমস্যা ও নার্কোলেপসি রোগের চিকিৎসার জন্য তৈরি হয়েছিল ক‍্যাপ্টাগন। পরে এর নেশাজনিত অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়াতে থাকায় আন্তর্জাতিক ভাবে এই ওষুধ নিষিদ্ধ করা দেওয়া হয়।

বর্তমানে অবৈধ ল্যাবরেটরিতে তৈরি ক্যাপ্টাগনে সাধারণত অ্যামফিটামিন, ক্যাফিন, মেথঅ্যামফিটামিন-সহ বিভিন্ন উত্তেজক রাসায়নিক মেশানো থাকে। পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘ সময় জেগে থাকা, ক্লান্তি ও ক্ষুধা কমানো এবং সাময়িক উৎফুল্লতা তৈরির জন্য এই মাদক ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তবে এই মাদক ব্যবহারে আক্রমণাত্মক আচরণ, ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং মানসিক সমস‍্যা দেখা দিতে পারে।

একে ‘গরিবের কোকেন’ বলা হয়

এই ক‍্যাপ্টাগন উৎপাদন করতে কম খরচ হয়। বিপুল চাহিদার কারণে ক্যাপ্টাগনকে অনেক সময় ‘গরিবের কোকেন’ বলা হয়। বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ায় এটি অত্যন্ত লাভজনক সিন্থেটিক মাদকে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক তদন্ত ও গোয়েন্দা রিপোর্টে একাধিক বার দাবি করা হয়েছে যে, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে এই মাদকের পাচারচক্রের যোগ থাকতে পারে। এই মাদক ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থ সংগঠিত অপরাধ ও ইসলামিক সন্ত্রাসের ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

বিশ্বজুড়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলি সতর্ক করেছে যে, ক্যাপ্টাগন পাচারে এখন অত্যন্ত আধুনিক চোরাচালান পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে— সমুদ্রপথ, জাল নথি এবং হাওলা চক্রের মতো জটিল আর্থিক নেটওয়ার্ক।


Share