Abhishek Banarjee

‘যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়’! সেবাশ্রয় মামলায় বিরক্ত কলকাতা হাই কোর্ট, অভিষেককে নভেম্বর পর্যন্ত রক্ষাকবচ

বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, এই ধরনের ঘটনা চলতে থাকলে আগামী দিনে আরও কঠোর নির্দেশ দিতে আদালত বাধ্য হতে পারে।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও কলকাতা হাই কোর্ট।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৩:৩৭

সেবাশ্রয় সংক্রান্ত মামলায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নভেম্বর পর্যন্ত রক্ষাকবচ দিল কলকাতা হাই কোর্ট। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে বারবার এফআইআর দায়ের হওয়া নিয়েও আদালত প্রশ্ন তুলেছে। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, এই ধরনের ঘটনা চলতে থাকলে আগামী দিনে আরও কঠোর নির্দেশ দিতে আদালত বাধ্য হতে পারে।

ডায়মন্ড হারবারের সাংসদীয় এলাকায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দু’বার ‘সেবাশ্রয়’ স্বাস্থ্য শিবিরের আয়োজন করেছিলেন। অভিযোগ, ওই শিবির আয়োজনের ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়নি এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনও নেওয়া হয়নি। পাশাপাশি, শিবিরে একাধিক রোগীর ভুল চিকিৎসা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনায় জুলাই মাসে বিজেপি নেতা অভিজিৎ দাস ওরফে ববি বিষ্ণুপুর থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। পরে মালতী বিশ্বাসের পরিবার রবীন্দ্রনগর থানায় অভিযোগ জানায়। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে অভিষেক-সহ একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়। অভিযোগকারী অভিজিৎ দাস এর আগে দু’বার নির্বাচনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। দুই বারই তিনি পরাজিত হন। রক্ষাকবচ চেয়ে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন অভিষেক। সোমবার বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের বেঞ্চে সেই মামলার শুনানি ছিল।

সেবাশ্রয় মামলায় আপাতত অভিষেকের বিরুদ্ধে কোনও কঠোর পদক্ষেপ করা যাবে না বলে আদালত জানিয়েছে। আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত তাঁর রক্ষাকবচ বহাল থাকবে। তবে তদন্তে তাঁকে সহযোগিতা করতে হবে। তদন্তের প্রয়োজনে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হলে পুলিশ অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে নোটিশ দিতে পারবে।

অভিষেকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং অভিযোগের ধরন নিয়েও সোমবার বিচারপতি ভট্টাচার্য অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ভুল চিকিৎসার অভিযোগ করা হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা তাঁর পরিবার আদৌ উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ, ভুল চিকিৎসার অভিযোগ থাকলে রোগীর পরিবার রাজ্য মেডিকেল কাউন্সিল, জাতীয় মেডিকেল কমিশন কিংবা ক্রেতা সুরক্ষা দফতরের মতো উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হতে পারেন। কিন্তু সেই সমস্ত জায়গায় কোনও অভিযোগ জানানো হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। এর পাশাপাশি অভিষেক নিজে সরাসরি ভুল চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না বলে আদালতে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে তাঁকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন কেন? এই প্রশ্নও তোলেন বিচারপতি। ফলে মামলায় অভিষেকের বিরুদ্ধে তদন্তের প্রয়োজনীয়তা এবং অভিযোগের ভিত্তি নিয়েই আদালতের পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

রাজ্যের তরফে হাই কোর্টে বলা হয়, অভিষেক নিজে সরাসরি ভুল চিকিৎসায় জড়িত না হলেও তিনি আইন না মেনে সেবাশ্রয় স্বাস্থ্যশিবিরের আয়োজন করেছিলেন। ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্ট আইন অনুযায়ী, এই ধরনের পরিষেবা দিতে প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। অভিযোগ, সেই অনুমতি নেওয়া হয়নি। এমনকি অনুমতি ছাড়াই এক্স-রে এবং আলট্রাসোনোগ্রাফির মতো পরিষেবা দেওয়া হয়েছিল বলেও আদালতে জানানো হয়। রাজ্যের বক্তব্যের পরই বিচারপতি ভট্টাচার্য প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানতে চান, অভিষেক যদি সরাসরি ভুল চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত না থাকেন, তা হলে তাঁকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন কী? এরপরই একাধিক মামলায় একই ব্যক্তিকে জড়ানো নিয়ে বিচারপতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

বিচারপতি বলেন, ‘‘যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়। গত কয়েক মাসে এক জন ব্যক্তির নামে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। আদালত বিরক্ত।’’ পাশাপাশি বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার প্রসঙ্গও তিনি টেনে আনেন। বিচারপতি জানান, প্রয়োজনে অভিষেকের ক্ষেত্রেও শুভেন্দু অধিকারীর মামলার মতোই নির্দেশ দিতে হতে পারে। আদালতের অনুমতি ছাড়া যাতে তাঁর বিরুদ্ধে আর কোনও এফআইআর দায়ের করা না যায়, সেই নির্দেশ দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও জানান বিচারপতি। তাঁর প্রশ্ন, “এটা কী চলছে?” উল্লেখ্য, তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগে এফআইআর দায়ের করা হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে শুভেন্দু আদালতের দ্বারস্থ হন। পরে আদালত নির্দেশ দেয়, আদালতের অনুমতি ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে কোনও এফআইআর দায়ের করতে পারবে না পুলিশ। এ বার অভিষেকের ক্ষেত্রেও হাই কোর্ট একই ধরনের নির্দেশের ইঙ্গিত দিল।

আদালতের পর্যবেক্ষণ, চিকিৎসায় আদৌ কোনও গাফিলতি হয়েছিল কি না, তা যাচাই করার জন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ রয়েছে। সেই কর্তৃপক্ষের কাছে কেন অভিযোগ জানানো হয়নি, তা নিয়েও বিচারপতি প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর আরও বক্তব্য, চিকিৎসায় ভুল হয়ে থাকলেও তার সঙ্গে অভিষেক সরাসরি যুক্ত থাকতে পারেন না। কারণ, অভিষেক নিজে কারও চিকিৎসা করেননি। এই মামলায় অভিষেকের হয়ে আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণ ও অয়ন ভট্টাচার্য আদালতে সওয়াল করেন। গত ৩ সেপ্টেম্বর অভিষেক বিদেশে গিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, তিন সপ্তাহ বিদেশে থাকার কথা তাঁর। আগামী ২২ সেপ্টেম্বর তাঁর দেশে ফেরার কথা। অভিষেক ফিরলে আদালতকে তা জানাতে হবে বলে বিচারপতি নির্দেশ দিয়েছেন। প্রয়োজনে ২২ সেপ্টেম্বরের পর পুলিশ তাঁকে তলব করতে পারবে। বিচারপতি জানান, ভুল চিকিৎসা নিয়ে রোগী বা তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে কোনও অভিযোগ জানানো হয়ে থাকলে তার নথি আদালতকে দেখাতে হবে। তা ছাড়া, অভিষেকের কাছে ভোটে দু’বার পরাজিত হওয়া ব্যক্তি এই মামলা করেছেন বলে অভিযোগের সত্যতা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে, জানান বিচারপতি। অভিযোগকারী অভিজিতের আইনজীবী জয়ন্ত নারায়ণ চট্টোপাধ্যায়ের সওয়াল, দু’বার ভোটে হেরে গিয়েছেন বলেই যে তাঁর মক্কেল অভিষেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারবেন না, বা করলে তার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ থাকবে— এমন নয়। অভিষেক প্রসঙ্গে আইনজীবীর কথায়, ‘‘গত ১৫ বছর ধরে ওই ব্যক্তি পশ্চিমবঙ্গকে লুট করেছেন। যদি সরকার পরিবর্তন না হত, তাঁর আদালতে আসার প্রয়োজন পড়ত না। তিনি ‘সুপার পাওয়ারফুল ম্যান’। দয়া করে তদন্ত বন্ধ করবেন না।’’ সব পক্ষের বক্তব্য শুনে অভিষেককে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত রক্ষাকবচ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাই কোর্ট।


Share