West Bengal Police

ঝাড়গ্রাম ফিরল মেদিনীপুর রেঞ্জে! নির্দেশিকা জারি করল নবান্ন, সাংস্কৃতিক সাদৃশ্য থাকলেও বাঁকুড়ার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলেন মমতা, দাবি বিজেপি নেত্রী ভারতী ঘোষের

নির্দেশিকা অনুযায়ী, ঝাড়গ্রামকে বাঁকুড়া রেঞ্জ থেকে সরিয়ে মেদিনীপুর রেঞ্জের অধীনে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই নির্দেশিকা রাজ‍্যে অর্থ দফতরের কাছে পাঠানো হয়েছে। এ বার থেকে ঝাড়গ্রাম পুলিশ জেলা মেদিনীপুর রেঞ্জের ডিআইজির অধীনে কাজ করবে।

বিজেপি নেত্রী ভারতী ঘোষ।
ইন্দ্রজিৎ মল্লিক, ঝাড়গ্রাম
  • শেষ আপডেট: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:০০

ঝাড়গ্রাম পুলিশ জেলাকে বাঁকুড়া রেঞ্জ থেকে সরিয়ে আনল নবান্ন। এই পুলিশ জেলাকে আবার মেদিনীপুর রেঞ্জের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে রাজ‍্য পুলিশেরর ১০টি রেঞ্জ রয়েছে। ঝাড়গ্রামকে বাঁকুড়া রেঞ্জের সঙ্গে জুড়ে ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী যা ইচ্ছে তাই করেছেন। কারও কোনও উপদেশ নেননি। এমনটাই বলছেন পশ্চিম মেদিনীপুরের প্রাক্তন পুলিশ সুপার তথা বিজেপি নেত্রী ভারতী ঘোষ।

গত ২ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দফতর রাজ‍্য পুলিশের রেঞ্জের পুনবিন‍্যাস সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করেছে। নির্দেশিকায় সাতটি রেঞ্জের কথা উল্লেখ রয়েছে। রাজ‍্য পুলিশের রেঞ্জগুলির সীমানা পুনর্গঠন করা হয়েছে। এতদিন পর্যন্ত বাঁকুড়া রেঞ্জের অধীনে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং ঝাড়গ্রাম পুলিশ জেলা ছিল। মেদিনীপুর রেঞ্জের অধীনে পূর্ব মেদিনীপুর এবং পশ্চিম মেদিনীপুর রেঞ্জ ছিল। নির্দেশিকা অনুযায়ী, ঝাড়গ্রামকে বাঁকুড়া রেঞ্জ থেকে সরিয়ে মেদিনীপুর রেঞ্জের অধীনে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই নির্দেশিকা রাজ‍্যে অর্থ দফতরের কাছে পাঠানো হয়েছে। এ বার থেকে ঝাড়গ্রাম পুলিশ জেলা মেদিনীপুর রেঞ্জের ডিআইজির অধীনে কাজ করবে।

তৃণমূল জমানায় ঝাড়গ্রাম পুলিশ জেলাকে নিয়ে বিতর্কের শেষ ছিল না। ঝাড়গ্রামের মানুষের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস সবটাই মেদিনীপুরের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে রয়েছে। ঝাড়গ্রাম পৌঁছোতে গেলে মেদিনীপুর হয়েই যেতে হয়। সেটাই যাতায়াতের ক্ষেত্রে নিকটবর্তী হয়। বাঁকুড়া বা পুরুলিয়া হয়ে ঝাড়গ্রামে আসতে মেদিনীপুরের তুলনায় অনেক বেশি পথ পেরোতে হয়। তাই ঝাড়গ্রাম জেলার ভৌগোলিক অবস্থানের নিরিখে মেদিনীপুরের সঙ্গেই সাদৃশ্যপূর্ণ।

কিন্তু তার পরেও এই পুলিশ জেলাকে মেদিনীপুর রেঞ্জ থেকে সরিয়ে বাঁকুড়া রেঞ্জের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকার। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই সময়ও প্রশ্ন উঠেছিল। তাতে কোনও সমস্যার সমাধান হয়নি। অভিযোগ, পূর্বতন সরকারের এমন সিদ্ধান্তে সেখানকার মানুষ উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়ে থেকেছেন। আরও পিছিয়ে পড়েছেন।

পশ্চিম মেদিনীপুরের দীর্ঘ সাত বছর জেলা পুলিশের সুপারের দায়িত্ব সামলেছেন প্রাক্তন আইপিএস অফিসার তথা বিজেপি নেত্রী ভারতী ঘোষ। তিনি সেই সময় এই জেলায় দাপটের সঙ্গে নিজের কর্তব্য পালন করেছিলেন। প্রাক্তন পুলিশ সুপারের বক্তব্য, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগই করেননি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পশ্চিম মেদিনীপুরের মানুষের উন্নয়নের স্বার্থে যা যা করা প্রয়োজন ছিল তা তিনি করেছেন। মানুষকে প্রসাশনিক পরিষেবা দেওয়ার জন‍্য কাজ করে গিয়েছেন। সেখানে অনেক উন্নয়ন করা যেত। কিন্তু বিজেপির ভোট বৃদ্ধি হওয়ার কারণে জেলার মানুষকে ইচ্ছাকৃত ভাবে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল।

তাঁর আরও বক্তব্য, ঝাড়গ্রামকে আলাদা করে বাঁকুড়া রেঞ্জে পাঠানো হলেও কিন্তু লালগড়কে রেখে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, “দুই সন্তানকে আলাদা করে দেওয়ার মতো এই সিদ্ধান্ত ছিল। এমন সিদ্ধান্তের কোনও মানেই ছিল না।” পুলিশ মহলের একাংশের বক্তব্য, পুলিশ সুপার থাকাকালীন ভারতী ঘোষ মাটিতে পা রেখে কাজ করেছিলেন। জেলায় তাঁর যথেষ্ট জনপ্রিয়তা ছিল। এই জনপ্রিয়তাকেই ভালো চোখে নেননি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই তাঁর ক্ষমতাকে খর্ব করতেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

প্রাক্তন পুলিশ সুপার তথা বিজেপি নেত্রী ভারতী ঘোষের অভিযোগ, “আমার কোনও কথাই শোনা হয়নি। আমি এই জেলাতে সাত বছর কাজ করেছি। এই জেলাকে মেদিনীপুর রেঞ্জ থেকে বাদ দেওয়ার জন্য আমার কাছ থেকে কোনও উপদেশও নেওয়া হয়নি সেই সময়।” তাঁর আরও বক্তব্য, এক সময় ওই জেলা মাওবাদী জঙ্গিদের ডেরা ছিল। মাওবাদী দমনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। এক শীর্ষ মাওবাদী জঙ্গিনেতাকে আত্মসমর্পণ করিয়ে ছিলেন। তিনি ওই জেলার মাটিকে চেনেন। কিন্তু তার পরেও তাঁর মতকে কার্যত নস‍্যাৎ করে দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়াও, ওই জেলায় ব‍্যাটেলিয়ন তৈরির জন্য তৎকালীন জেলাশাসকের কাছ থেকে জমি চেয়েছিল। তাঁর কাছে তাঁর প্রস্তাব নাকোচ করে দিয়ে তৎকালীন জেলাশাসক জানিয়ে দেয়, এক কাঠা জমিও দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, “পূর্বতন সরকার যা ইচ্ছে তাই করেছে। নিজের যা মনে হয়েছে সেটাই তিনি করেছেন। জেলার ভৌগলিক মানচিত্রকে কার্যত অবজ্ঞা করেছেন। এতে ওই এলাকার মানুষের কোনও উন্নয়ন হয়নি। উল্টে আমার বাড়িতে পুলিশ পাঠিয়ে হেনস্থা করেছিল।”

রাজ‍্যে পালাবদল হয়েছে। বিপুল সংখ্যক মানুষের জনসমর্থন নিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া মানুষের উন্নয়নের জন্য একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়া— এই চারটি জেলায় কীভাবে উন্নয়নের কাজ চলবে তা নিয়ে একাধিক বৈঠকও করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। রাজ‍্য বাজেটে এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।

মেদিনীপুর রেঞ্জে ঝাড়গ্রামকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসার প্রসঙ্গে বিজেপি নেত্রী ভারতী ঘোষ আরও বলেন, “এটাই প্রয়োজন ছিল। আগের সরকারের সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল না। বর্তমান সরকার মানুষের উন্নয়নের কথা চিন্তা করে। সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ‍্য সরকার।”


Share