RG Kar Case

আরজি করের ধর্ষণ-খুনের নেপথ্যে দুর্নীতির যোগ? পাঁচ সদস্যের কমিটির প্রথম বৈঠক, খতিয়ে দেখা হবে সন্দীপ-যোগও

অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শুভ্রকমল মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিতে রয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা দেবাশিস ভট্টাচার্য, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তাপস বসু, জগদ্দলের বিজেপি বিধায়ক রাজেশ কুমার এবং উত্তরপাড়ার বিজেপি বিধায়ক দীপাঞ্জন চক্রবর্তী।

আরজি কর তদন্ত কমিটির প্রথম বৈঠক।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:৩০

আরজি কর হাসপাতালে কর্তব্যরত মহিলা চিকিৎসক-পড়ুয়াকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা এবং হাসপাতালের দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের গঠিত কমিটির প্রথম বৈঠক হল বৃহস্পতিবার। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শুভ্রকমল মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিতে রয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা দেবাশিস ভট্টাচার্য, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তাপস বসু, জগদ্দলের বিজেপি বিধায়ক রাজেশ কুমার এবং উত্তরপাড়ার বিজেপি বিধায়ক দীপাঞ্জন চক্রবর্তী।

তদন্তের অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখেই দুই বিজেপি বিধায়ককে কমিটিতে রাখা হয়েছে বলে স্বাস্থ্যভবন সূত্রে খবর। রাজেশ কুমার অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস অফিসার। অন্য দিকে, দীপাঞ্জন চক্রবর্তী কমান্ডো বাহিনী এনএসজির প্রাক্তন সদস্য। আরজি কর হাসপাতালে সন্দীপ ঘোষের আমলে ওঠা আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের সঙ্গে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ-খুনের কোনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগ রয়েছে কি না, তা-ই মূলত এই কমিটি খতিয়ে দেখবে। তদন্তের পর প্রয়োজনীয় তথ্য ও রিপোর্ট রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের কাছে জমা দেওয়ার কথা। গত ২৯ অগস্ট স্বাস্থ্য-শিক্ষা দফতরের অধিকর্তা এই কমিটি গঠনের বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিলেন। সেই বিজ্ঞপ্তির পর বৃহস্পতিবারই প্রথম বার পাঁচ সদস্যের কমিটি বৈঠকে বসল।

এ দিন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘অভয়ার সঙ্গে ঘটে যাওয়া নৃশংস ঘটনা বাংলার মানুষকে গভীর ভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। ঘটনার প্রকৃত সত্য সামনে আনার লক্ষ্যে একটা স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভয়ার পরিবার এবং সমগ্র চিকিৎসক সমাজের পাশে আমরা রয়েছি। কোন‌ও আপস ছাড়া দ্রুত ন্যায়বিচার হবে। নিরপেক্ষ বিচার হবে।’’ প্রসঙ্গত, গত ৯ অগস্ট আরজি করের চিকিৎসক-পড়ুয়ার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটির লোকসংস্কৃতি ভবনে একটি স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে মৃতার মা-বাবার পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী উপস্থিত ছিলেন। স্মরণসভায় আরজি কর-কাণ্ডের তদন্ত প্রসঙ্গে শুভেন্দু জানিয়েছিলেন, একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে ব্যারাকপুরের পুলিশ কমিশনার নতুন মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করবেন। এর এক দিন আগে, ৮ অগস্ট স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বতও জানিয়েছিলেন, তাঁর দফতরের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে পৃথক তদন্ত করা হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সে দিন জানিয়েছিলেন, স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকেরা ঘটনার তদন্ত করবেন। তদন্তে উঠে আসা তথ্য কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হবে। পাশাপাশি, তদন্তকারীরা নির্যাতিতার শিক্ষকদের সঙ্গেও কথা বলবেন। হাসপাতালের পরিকাঠামোয় কোথায় কোথায় ঘাটতি ছিল এবং পরবর্তী সময়ে কী ভাবে সেই ঘাটতি পূরণ করা হয়েছে, তদন্তে তা-ও খতিয়ে দেখা হবে।

প্রসঙ্গত, আরজি কর-কাণ্ডের তদন্ত প্রথমে কলকাতা পুলিশ শুরু করেছিল। তারাই মূল অভিযুক্ত সঞ্জয় রায়কে গ্রেফতার করে। পরে কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশে সিবিআইয়ের হাতে তদন্তভার যায়। চার্জশিটে সঞ্জয়কেই একমাত্র অভিযুক্ত হিসেবে দেখায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। শিয়ালদহ আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়। তবে শুরু থেকেই পুলিশ এবং সিবিআইয়ের তদন্তে নির্যাতিতার পরিবার অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল। পরে তাঁরা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হলে আদালত সিবিআইকে নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশ মেনে সিবিআই একটি নতুন বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করে। গত ৬ অগস্ট হাই কোর্টে সেই সিট রিপোর্ট জমা দেয়। রিপোর্ট নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বিচারপতি শম্পা সরকার ও বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের ডিভিশন বেঞ্চ। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, সিবিআইয়ের তদন্ত সঠিক পথে এগোচ্ছে না। এমনকি পুরনো তদন্তের প্রভাবেই নতুন তদন্তকারী দলও পরিচালিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছিল হাই কোর্ট।

২০২৪ সালের ৮ অগস্ট রাতে নির্যাতিতা চিকিৎসক-পড়ুয়া আরজি কর হাসপাতালে কয়েক জন সহকর্মীর সঙ্গে রাতের খাবার খেয়েছিলেন। পরিবারের অভিযোগ, সেই সময় তাঁর সঙ্গে চার জন জুনিয়র ডাক্তার ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে হাসপাতালের তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের যোগাযোগ ছিল বলেও পরিবারের দাবি। ওই চার জনকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করার দাবি জানিয়েছে মৃতার পরিবার। নির্যাতিতার পরিবারের আইনজীবী জুনিয়র চিকিৎসক সৌমিত্র রায়ের নামও উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, ওই রাতে নির্যাতিতার সঙ্গে নৈশভোজে ছিলেন সৌমিত্র। অথচ তাঁর বয়ানই এখনও রেকর্ড করা হয়নি। গত ৬ অগস্ট হাই কোর্টে শুনানির সময় পরিবারের আইনজীবী প্রশ্ন তোলেন, ঘটনার আগে কী হয়েছিল, তা যথাযথ ভাবে তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে না কেন। তাঁর আরও প্রশ্ন ছিল, ওই রাতে নির্যাতিতার সঙ্গে থাকা চার জনের সঙ্গে সন্দীপ ঘোষের কোনও যোগ ছিল কি না, তা তদন্তে স্পষ্ট হচ্ছে না কেন এবং তাঁদের এখনও গ্রেফতার করা হয়নি কেন?


Share