Health Infrastructure

‘শিরদাঁড়া সোজা রেখে কাজ করতে না পারলে অধ্যক্ষ পদে থাকার প্রয়োজন নেই,’ মেডিক্যাল কলেজের প্রশাসকদের বার্তা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর, আপত্তি কমিউনিস্টদের

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই বার্তায় ক্ষুব্ধ চিকিৎসক মহলের একাংশ। বিশেষ করে কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন চিকিৎসকেরা আপত্তি তুলছেন। তাঁদের প্রশ্ন, শিরদাঁড়া সোজা রেখে চলা মানে কি আসলে শাসকের কথা মেনে চলা?

স্বাস্থমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:৩৫

মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষদের ‘শিরদাঁড়া সোজা’ রেখে চলতে বলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। শুক্রবার স্বাস্থ্য ভবনে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সেখানেই তিনি জানিয়েছেন— ‘শিরদাঁড়া সোজা’ রেখে কাজ করতে না পারলে অধ্যক্ষ পদে থাকার প্রয়োজন নেই।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই বার্তায় ক্ষুব্ধ চিকিৎসক মহলের একাংশ। বিশেষ করে কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন চিকিৎসকেরা আপত্তি তুলছেন। তাঁদের প্রশ্ন, শিরদাঁড়া সোজা রেখে চলা মানে কি আসলে শাসকের কথা মেনে চলা? শাসকের হুমকি উপেক্ষা করে অভাব-অভিযোগ ও দাবিদাওয়ার কথা জোর গলায় বলতে পারাই আসলে ‘সোজা শিরদাঁড়া’র প্রমাণ।

অন‍্য দিকে, একাংশের বক্তব্য, অধ্যক্ষদের সরকার নিয়োগ করে। তাঁরা সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সরকারের নির্দেশ তাঁরা মানতে বাধ্য। সরকারি পদে থেকে একটি নির্দিষ্ট আদর্শবাদকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এমনটা সরকারের পছন্দ নাও হতে পারে। তাই ‘সোজা শিরদাঁড়া’র কথা বলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। বিষয়টিকে তাঁরা অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন না।

গত ১৭ অক্টোবর চোরবাগান সর্বজনীনে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর পর সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে মুখ খুলেছিলেন কয়েক জন কমিউনিস্টদের ছাত্র সংগঠনের কর্মী তথা জুনিয়র ডাক্তারদের একাংশ। তাঁদের প্রশ্ন ছিল, কেন জখমদের কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে তড়িঘড়ি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করতে হল। সেই বিষয়টি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেই ব্যাখ্যা দেন। স্বাস্থ্য ভবনের কন্ট্রোলরুম থেকে জানান, সরকারি হাসপাতালে এখনও অনেক পরিষেবা নেই। মৃত্যু ঠেকাতে তাই বেসরকারি হাসপাতালের ওপরই ভরসা রাখা হয়েছিল। রাজ্যের স্বাস্থ্য কাঠামো উন্নত করতে নতুন সরকারের অন্তত দু’বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই সঙ্গে কোন জুনিয়র ডাক্তারেরা ডিউটি বাদ দিয়ে রাজনৈতিক নেতার মতো ভাষণ দিচ্ছেন, তাঁদের কে কোথায় ডিউটিতে ছিলেন, তা নিয়ে বিস্তারিত রিপোর্টও চান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

এ প্রসঙ্গে আপাদমস্তক কমিউনিস্ট তথা চিকিৎসক সুবর্ণ গোস্বামীর বক্তব্য, “সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিয়ে বেসরকারি হাসপাতালের বেহায়া বিজ্ঞাপন দেওয়ার বিরুদ্ধে জুনিয়র ডাক্তারেরা কথা বলেছেন। তাই তাঁদের ওপর আক্রমণ শানানো হচ্ছে। অধ্যক্ষদের শিরদাঁড়া তখনই প্রমাণ হবে, যখন শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তাঁরা ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস দেখাতে পারবেন।”

পশ্চিমবঙ্গ ডক্টর্‌স ফোরামের (ডব্লিউবিডিএফ) সভাপতি তথা আরেক কমিউনিস্ট নেতা কৌশিক চাকী আবার হাসপাতালের ‘থ্রেট কালচারের’ প্রসঙ্গ টেনেছেন। তাঁর কথায়, “স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যক্ষদের শিরদাঁড়া সোজা রাখতে বলছেন, খুব ভাল কথা। এ বার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বুকের ওপর চেপে বসে থাকা থ্রেট সিন্ডিকেটগুলোর মেরুদণ্ড ভাঙার সাহস দেখান। সরকার বদলালেই তো ব্যবস্থা বদলায় না, যদি সেই ব্যবস্থার পুরনো কারিগরেরাই বহাল তবিয়তে থেকে যান।”

স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বিনিয়োগ, পুঁজির বিকাশকে উপেক্ষা করে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিটি স্তর থেকে সিন্ডিকেটরাজ, তোলাবাজি, থ্রেট কালচার এবং রাজনৈতিক প্রভাব নির্মূল করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। কৌশিকের অভিযোগ, “তৃণমূল আমলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবক্ষয় ও থ্রেট কালচারের সঙ্গে যাঁদের নাম বার বার উঠে এসেছে, তাঁদের অনেকেই এখনও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল।”

তৃণমূল আমলে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে দুর্নীতি এবং থ্রেট কালচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের‌ জন্য চিকিৎসক সংগঠনগুলির যৌথ মঞ্চ তৈরি হয়েছিল। সেই মঞ্চের যৌথ আহ্বায়ক চিকিৎসক নেতা তথা কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন পুণ্যব্রত গুণ বলেন, “চোরবাগানের দুর্ঘটনার দিন যে ভাবে মেডিক্যাল কলেজের জুনিয়র চিকিৎসকেরা, স্বাস্থ্যকর্মীরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করেছেন, তা প্রশংসনীয়। জুনিয়র ডাক্তারেরা হাসপাতালে পরিকাঠামোর অভাবের যে কথা জনসমক্ষে তুলে ধরেছেন, তাতে কোনও অন্যায় নেই। ওঁরা জনসাধারণকে পরিষেবা দিতে চান বলেই পরিকাঠামোর উন্নয়ন চাইছেন। স্বাস্থ্য দফতর পরিকাঠামো উন্নয়নের দিকে নজর না দিয়ে চিকিৎসকদের আক্রমণ করছে, এটা দুর্ভাগ্যজনক।”

উল্লেখ্য, শিরদাঁড়া সোজা রাখা নিয়ে চিকিৎসক সংগঠনগুলি কড়া সমালোচনার পথে হাঁটলেও জুনিয়র চিকিৎসকেরা অর্থের বিনিময়ে ডিউটি বিক্রি করছেন, সেই অভিযোগ প্রসঙ্গে চুপ থেকেছেন। অধ্যক্ষ, এম‌এসভিপি’দের একাংশ প্রশাসক পদে থেকেও প্রাইভেট প্র্যাকটিস করছেন বলে অভিযোগ। তা নিয়েও চিকিৎসক সংগঠনগুলি নীরব। রাজ‍্যের জনসংখ্যার নিরিখে চিকিৎসকের অভাব রয়েছে তা-ও মেনে নিচ্ছে স্বাস্থ্য ভবন। মৃত‍্যু ঠেকাতে এবং সুচিকিৎসার প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতালের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও মনে করছে স্বাস্থ্যভবন।

এর প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য ভবনের কর্তাদের বক্তব্য, “বৈঠকের আলোচনার একটি দিক নিয়ে সমালোচনা করা হচ্ছে। কিন্তু সেই সমালোচনার প্রয়োজন পড়ল কেন, সেটাও দেখা দরকার।’’ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকদের চিকিৎসক সংগঠন ন্যাশনাল মেডিকোস অর্গানাইজেশনের প্রাক্তন সভাপতি চিকিৎসক সুনন্দ দে বলেন, “শিরদাঁড়া সোজা রাখা মানে কোনও পক্ষের দিকে ঝুঁকে না থাকা। সরকারের সঙ্গে থাকা মানে তো শিরদাঁড়া বাঁকানো নয়। সরকার তো নিরপেক্ষ, সরকার সকলের। কোনও রাজনৈতিক দলের হয়ে কথা বলার দরকার নেই। আসলে যাঁরা এ কথা বলছেন, তাঁরা নির্দিষ্ট কারও প্রতি আনুগত্য দেখানোর চেষ্টা করছেন। সাদাকে সাদা বলতে এঁদের সমস্যা নেই। কিন্তু সাদাকে কালো বলতে সমস্যা।”

মেডিক্যাল কলেজের কমিউনিস্টদের জুনিয়র ডাক্তারদের কটাক্ষ করে সুনন্দ মনে করেন, “হাসপাতালে পরিকাঠামোগত সমস্যা থাকলে তার দায় অধ্যক্ষের। আসলে যাঁরা পরিকাঠামো নিয়ে এত বিবৃতি দিচ্ছেন, ভাল করে দেখলে দেখা যাবে পরিকাঠামো নষ্ট করার জন্যেও তাঁরাই দায়ী। ঠিকমতো ডিউটি করেন না। টাকার বিনিময়ে ডিউটি বিক্রি করেন। নিজেরাই ফাঁকি মারেন।”


Share