Defense Deals

ব্রহ্মসের পর পিনাক, নাগাস্ত্র, কুশ! কম খরচে অত্যাধুনিক অস্ত্র বানিয়ে বিশ্ববাজার দখলের পথে ভারত

অন্য দিকে, ইরানের ব্যবহৃত ফেচ-১১০, শাদাব-৩ বা ঘদরের মতো ক্ষেপণাস্ত্র তুলনামূলক ভাবে অনেকটাই সস্তা। ফলে একই সংঘাতে বিপুল অর্থ খরচ করে অত্যাধুনিক মিসাইল ছোড়ার পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত কম খরচে পাল্টা আঘাত হানার কৌশলও সামনে এসেছে।

প্রতীকী চিত্র।
নিজস্ব সংবাদদাতা, দিল্লি
  • শেষ আপডেট: ০৯ আগস্ট ২০২৬ ০৪:২৩

সাম্প্রতিক ইউএস-ইরান সংঘাতে একটি বিষয় আরও স্পষ্ট হয়ে সামনে এসেছে। আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি শুধু অস্ত্রের ক্ষমতা নয়, তার দামও। আমেরিকার সেনার ব্যবহৃত থাড-টোম্যাহক ক্রুজ় বা প্যাট্রিয়ট মিসাইলের মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের দাম কয়েক কোটি টাকা। অন্য দিকে, ইরানের ব্যবহৃত ফেচ-১১০, শাদাব-৩ বা ঘদরের মতো ক্ষেপণাস্ত্র তুলনামূলক ভাবে অনেকটাই সস্তা। ফলে একই সংঘাতে বিপুল অর্থ খরচ করে অত্যাধুনিক মিসাইল ছোড়ার পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত কম খরচে পাল্টা আঘাত হানার কৌশলও সামনে এসেছে।

এই সমীকরণ থেকেই আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছে। বিশ্বের সব দেশ চিন, আমেরিকা বা উন্নত বিশ্বের অন্যান্য শক্তিধর রাষ্ট্রের মতো প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে পারে না। নিজেদের নিরাপত্তার প্রয়োজন মেটাতে অনেক দেশকেই সীমিত বাজেটের মধ্যে কার্যকর অস্ত্র কেনার পথ বেছে নিতে হয়। অর্থাৎ, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও অনেকটা ‘কাট ইয়োর কোট অ্যাকর্ডিং টু ইয়োর ক্লথ’ নীতিই কার্যকর। ভারত এই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়েই বিশ্ব অস্ত্র বাজারে নিজেদের জায়গা শক্ত করার চেষ্টা করছে। একসময় চিন যেমন তুলনামূলক কম দামে পণ্য সরবরাহ করে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের উপস্থিতি বাড়িয়েছিল, ভারতও অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্রের বাজারে অনেকটা সেই কৌশল অনুসরণ করছে। তবে ভারতের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হল খরচ কমানোর জন্য অস্ত্রের গুণমানের সঙ্গে বড় ধরনের আপস করা হচ্ছে না।

দেশীয় পরিকল্পনা, গবেষণা ও উন্নয়ন, উৎপাদন এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহের ক্ষেত্রে দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর ফলে বিদেশি অস্ত্রের তুলনায় অনেক কম খরচে ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে উন্নত প্রযুক্তির সঙ্গে তুলনামূলক কম দাম এই দুইয়ের সমন্বয়ই ভারতের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামকে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমশ আকর্ষণীয় করে তুলছে। বিশ্বের একাধিক দেশ এখন এমন অস্ত্র ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে, যেখানে কার্যকারিতা বজায় রেখেও প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। সেই জায়গাতেই ভারতের তৈরি রকেট ও মিসাইল ব্যবস্থার চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে। ফলে বিশ্ব অস্ত্র বাজারে ভারতের উপস্থিতি শুধু ‘কম দামের বিকল্প’ হিসেবে নয়, বরং তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সরবরাহকারী হিসেবেও তৈরি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের দাবি, ভারতের মিসাইল ও রকেটের গুণমান নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনও কারণ নেই। বরং কম উৎপাদন খরচ, যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকারিতার প্রমাণ এবং আগের তুলনায় সহজতর রফতানি নীতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। অপারেশন সিঁদুরেও ভারতীয় অস্ত্রের কার্যকারিতার হাতেগরম প্রমাণ মিলেছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। পরিসংখ্যানও সেই দাবিকেই জোরালো করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের প্রতিরক্ষা রফতানি সর্বকালীন রেকর্ড গড়ে ৩৮ হাজার ৪২৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, এই প্রবণতা বজায় থাকলে ২০২৮-২৯ অর্থবর্ষের মধ্যে ভারতের প্রতিরক্ষা রফতানির পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।

চাহিদা বৃদ্ধির ছবিটা আরও স্পষ্ট হচ্ছে পরিসংখ্যানে। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি বেড়েছে ৬২.৬৬ শতাংশ। বর্তমানে ৮০টিরও বেশি দেশে পৌঁছে যাচ্ছে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম। শুধু তাই নয়, বিদেশে অস্ত্র রফতানিকারী ভারতীয় সংস্থার সংখ্যাও এক বছরে ১২৮ থেকে বেড়ে ১৪৫ হয়েছে।

আকাশ, পিনাক, ব্রহ্মস এবং নাগাস্ত্রের মতো ভারতীয় ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে নজর কেড়েছে। এশিয়া, আফ্রিকা এবং পশ্চিম এশিয়ার একাধিক দেশ তুলনামূলক কম খরচে আধুনিক ভারতীয় অস্ত্র কেনার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করছে।

সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা অনুযায়ী, কম উৎপাদন খরচ এবং সরকারি সহায়তার ফলে ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বাজারে দামের দিক থেকে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে। ফলে ভারতীয় অস্ত্রের রফতানির সম্ভাবনাও ক্রমশ বাড়ছে। উদাহরণ হিসেবে আকাশ সারফেস-টু-এয়ার মিসাইলের কথা বলা যায়। এর দাম প্রায় পাঁচ লক্ষ ডলার। একই ধরনের মার্কিন এআইএম-১২০ আমরাম ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে খরচ হতে পারে প্রায় আট থেকে ১০ লক্ষ ডলার। তুলনামূলক কম দাম হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে আকাশের চাহিদা বাড়ছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে শুধু কম দামই নয়, প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিক থেকেও ভারত কোনও আপস করছে না। তার অন্যতম উদাহরণ ব্রহ্মস। পশ্চিমি কয়েকটি বিকল্পের তুলনায় ব্রহ্মসের দাম কম নয়। কিন্তু উন্নত প্রযুক্তি, গতি এবং কার্যক্ষমতার কারণে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে এটি। ফলে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে বেশি দাম দিয়েও একাধিক দেশ ব্রহ্মস কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

সেক্ষেত্রে বলাই যায়, বিশ্ব অস্ত্র বাজারে ভারতের সবচেয়ে বড় সাফল্যের অন্যতম নাম ব্রহ্মস। ইতিমধ্যেই ফিলিপিন্স ব্রহ্মস কেনার জন্য প্রায় ৩৮ কোটি ডলারের চুক্তি করেছে। ভিয়েতনামও এই ক্ষেপণাস্ত্র কেনার বিষয়ে চুক্তি করেছে। এ ছাড়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, মিশর, বেলারুশ, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া এবং ব্রাজিল-সহ একাধিক দেশ ব্রহ্মস নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে।

শুধু ব্রহ্মস নয়, ভারতের পিনাক ও নাগাস্ত্রের মতো দেশীয় অস্ত্র ব্যবস্থার প্রতিও আন্তর্জাতিক বাজারে আগ্রহ বাড়ছে। মাল্টি-ব্যারেল রকেট সিস্টেমের ক্ষেত্রে একটি পিনাক রকেটের দাম আনুমানিক ১ লক্ষ ডলার। তুলনায় একই শ্রেণির আমেরিকান হিমার্স রকেটের দাম প্রায় দেড় থেকে দু'লক্ষ ডলার। তুলনামূলক কম দাম এবং যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকারিতার কারণে গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে পিনাকের চাহিদা বেড়েছে। পিনাকের ক্ষেত্রে ভারতের রফতানি সাফল্যের অন্যতম উদাহরণ আর্মেনিয়া। ইতিমধ্যেই দেশটি পিনাক রকেট সিস্টেম কেনার জন্য ভারতের সঙ্গে চুক্তি করেছে। একই সঙ্গে মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ভিয়েতনাম, ফিলিপিন্স, ব্রাজিল, বেলারুশ, মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডের মতো দেশও পিনাক নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। একই ছবি দেখা যাচ্ছে ভারতের দেশীয় অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক গাইডেড মিসাইল নাগ ও হেলিনার ক্ষেত্রেও। নাগ এবং হেলিনার দাম প্রায় এক লক্ষ ডলার করে বলে জানা যায়। সেখানে একই ধরনের আমেরিকান হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় দু'লক্ষ ডলার। অর্থাৎ, তুলনামূলক কম দামে কার্যকর প্রযুক্তি দেওয়ার সক্ষমতাই ভারতের তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট ব্যবস্থাকে বিশ্ব বাজারে ক্রমশ প্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে।

অপারেশন সিঁদুরে ব্যবহারের পর ভারতের লয়টারিং মিউনিশন ‘নাগাস্ত্র-১’ আন্তর্জাতিক স্তরে বিশেষ নজর কেড়েছে। শুধু লয়টারিং মিউনিশন নয়, অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রেও ভারত এখন বিশ্বের একাধিক দেশের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। একই ভাবে ভারতীয় পিনাক, ‘সাথী’ এবং এটিএজি সিস্টেমের মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ঘিরেও আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাজারে আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে।

ভারত ইলেকট্রনিক্স লিমিটেডের দেশীয় প্রযুক্তি এবং প্রায় ৮৫ শতাংশ দেশীয় উপাদানে তৈরি ‘সাথী’ লোকেটিং রেডারও নজর কেড়েছে। আমেরিকান ফায়ার ফাইন্ডার সিস্টেমের সঙ্গে তুলনায় উঠে আসছে এই ভারতীয় রেডার। সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, কার্যকারিতা বজায় রেখেও এর দাম আমেরিকার সমতুল্য ব্যবস্থার তুলনায় প্রায় ৪০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত কম বলে দাবি করা হচ্ছে।

সমর বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যুদ্ধের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। হাই-টেক নেক্সট-জেনারেশন স্টেলথ ফাইটার, অত্যাধুনিক ট্যাঙ্ক কিংবা হাজার মাইল দূরে নির্ভুল আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র শুধু এই ধরনের ব্যয়বহুল অস্ত্রের উপর নির্ভরতা কমাতে বাধ্য হচ্ছে বিশ্বের ছোট, মাঝারি এবং বড় সব দেশই। এর অন্যতম প্রধান কারণ প্রতিরক্ষা খরচ। এই পরিবর্তিত যুদ্ধনীতিতে তুলনামূলক কম খরচে কার্যকর আঘাত হানতে সক্ষম প্রযুক্তির গুরুত্ব বাড়ছে। সেই জায়গা দখল করছে অত্যাধুনিক ড্রোন, লয়টারিং মিউনিশন, প্রিসিশন-গাইডেড অস্ত্র, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং আধুনিক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম।

যেমন এমকিউ-৯ রিপার (ইউএস), বাইকার বাইরাখতার (তুরস্ক), এস-৭০ অখতনিক (রুশ) হার্মেস ৯০০ (ইজরায়েল), লয়টারিং মিউনেশন (যেমন হারপ (ইজরায়েল), ল্যান্সেট (রুশ) এবং প্রিসিশন ওয়েপন সম্ভার (যেমন পিআরএসএম (ইউএস), টোম্যাহক ক্রুজ (ইউএস) ব্রহ্মস (ভারত), ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম।

অর্থাৎ, আগামী দিনের যুদ্ধ শুধু অত্যাধুনিক ও বিপুল খরচের অস্ত্রের লড়াই নয়। কম খরচে দ্রুত মোতায়েনযোগ্য, নির্ভুল এবং কার্যকর অস্ত্র ব্যবস্থাই হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যতের যুদ্ধের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। আর এই বদলে যাওয়া বাজারেই তুলনামূলক কম দামে দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দিয়ে নিজেদের জায়গা আরও শক্ত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে ভারতের সামনে।

পিছিয়ে নেই ভারতও। ড্রোন থেকে কাউন্টার-ইউএএস ব্যবস্থা, রেডার থেকে এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম-প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের একাধিক ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে নিজেদের জায়গা তৈরি করতে দেশ জোরকদমে এগোচ্ছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি অত্যাধুনিক ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন ভারতের অস্ত্র রফতানি নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠছে। অপারেশন সিঁদুরে ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার ছিল রুশ এস-৪০০ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম। ২০১৮ সালে পাঁচটি S-400 ট্রায়াম্ফ সিস্টেম কেনার জন্য রাশিয়ার সঙ্গে প্রায় ৪৫,০০০ কোটি টাকার চুক্তি করেছিল ভারত। সেই তুলনায় দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হতে চলা লং-রেঞ্জ সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল সিস্টেম ‘কুশ’ (Kush)-এর খরচ উল্লেখযোগ্য ভাবে কম।

প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, কুশ-এর পাঁচটি স্কোয়াড্রন তৈরি করতে আনুমানিক ২২,০০০ কোটি টাকা খরচ হতে পারে। অর্থাৎ, একই ধরনের দীর্ঘপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তুলতে বিদেশি ব্যবস্থার তুলনায় দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহারে খরচ অনেকটাই কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই, এই ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রগুলির দামও এস-৪০০-এর তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভাবে কম হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে ‘কুশ’ শুধু ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে না, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। অপেক্ষাকৃত কম খরচে উন্নত প্রযুক্তির এয়ার ডিফেন্স সিস্টে-এই সমীকরণই বিশ্ববাজারে ভারতের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।

যুদ্ধক্ষেত্রে ‘ড্রোন’ যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে, গত কয়েক বছর ধরে গোটা বিশ্বকে তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে ইউক্রেন। রাশিয়ার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেও ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলা বারবার মস্কোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এমনকি অত্যাধুনিক এস-৪০০ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও সব ধরনের ড্রোন হামলা ঠেকানো সম্ভব হয়নি। এর নেপথ্যে রয়েছে যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন মোকাবিলা করতে গেলে ‘কস্ট-কম্পিটিটিভ অ্যাডভান্টেজ’-এর হিসাব অনেক সময় প্রতিপক্ষের পক্ষেই যায়।

একই ছবি দেখা গিয়েছে ইরানের ক্ষেত্রেও। হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনার সময়ে ইরানি ড্রোন আমেরিকার বাহিনীর জন্য যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ফলে কম খরচে কার্যকর ড্রোন প্রযুক্তির চাহিদা আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাজারে দ্রুত বাড়ছে। এই বাজারেই ভারতের দেশীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। ডিআরডিও এবং ভারত ইলেকট্রনিক্সের যৌথ উদ্যোগে তৈরি ‘স্রয়াভ’ ড্রোনকে ঘিরে ইতিমধ্যেই আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে দাবি প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশের। তাঁদের মতে, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং তুলনামূলক কম দামের কারণে এটি তুরস্কের জনপ্রিয় বাইরাখতার ড্রোনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা রাখে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে দামে বিদেশি সমমানের প্ল্যাটফর্মের তুলনায় প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত কম খরচে এই ধরনের দেশীয় প্রযুক্তি পাওয়া সম্ভব হলে তা বহু দেশের কাছেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। এই পরিস্থিতি থেকেই স্পষ্ট, ভারতীয় প্রতিরক্ষা রপ্তানির ‘একাদশ’-এ ব্রহ্মস সবচেয়ে বড় তারকা হলেও দলে প্রতিভার অভাব নেই। ক্ষেপণাস্ত্র থেকে ড্রোন, রাডার থেকে এয়ার ডিফেন্স- বিভিন্ন ক্ষেত্রে একের পর এক দেশীয় প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সক্রিয় কেন্দ্রীয় সরকারও। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে প্রায় ১.৭৮ লক্ষ কোটি টাকার ভারতীয় প্রতিরক্ষা শিল্প আগামী তিন বছরে প্রায় ১৯ শতাংশ সিএজিআর বেড়ে তিন লক্ষ কোটি টাকার বাজারে পৌঁছোতে পারে। এই সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেই চলতি অর্থবর্ষের বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদন ও দেশীয় উৎস থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের আমদানি-নির্ভরতার বদলে এখন দেশীয় প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতার উপর আস্থা বাড়ছে। এর ফলে লাভ শুধু প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র আমদানির প্রয়োজন কমলে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে, একই সঙ্গে গতি পাবে দেশের প্রতিরক্ষা শিল্প। বাড়বে বিনিয়োগ, তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং আরও শক্তিশালী হবে দেশীয় প্রযুক্তির পরিকাঠামো। অর্থাৎ, প্রতিরক্ষা উৎপাদনে আত্মনির্ভরতার এই নীতি একসঙ্গে একাধিক সমস্যার সমাধানের পথ খুলে দিচ্ছে।


Share