IPAC Case

ভুয়ো সংস্থা কাছ ঋণ নিয়েছে তৃণমূলের ভোটকুশলী সংস্থা আইপ‍্যাক! আরওসি-র রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য, উঠছে প্রশ্ন

আইপ‍্যাক ২০২১ সালে রেজিস্ট্রার অব কোম্পানিতে যে নথিগুলি দাখিল করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, তৃণমূলের ভোটকুশলী সংস্থা ওই বছরের ১৭ ডিসেম্বর রমাসেতু ইনফ্রাস্টাকচার প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি সংস্থা কাছ থেকে ১৩ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়েছে। সেই ঋণ নেওয়ার জন্য কোনও সম্পত্তি বন্ধক রাখা হয়নি।

সল্টলেকের আইপ‍্যাকের দফতর।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ ০২:৩৮

আইপ‍্যাককান্ডের পরে তোলপাড় রাজ‍্য রাজনীতি। এ বার সেই আবহে চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট প্রকাশ্যে এসেছে। দ‍্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্ট অনুযায়ী, আইপ‍্যাক গত ২০২১ সালে হরিয়ানার একটি সংস্থার কাছ থেকে ১৩ কোটি ৫০ লক্ষ কোটি টাকার একটি জামানতবিহীন ঋণ বা  আনসিকিওর্ড লোন নিয়েছিল। অর্থাৎ কোনও সম্পত্তি বন্ধক না রেখেই নেওয়া হয়েছে এই বিপুল পরিমাণ টাকার ঋণ। ওই সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি নথিতে সংস্থার কোনও অস্তিত্বই নেই।

হরিয়ানার রোহতকের ঠিকানায় ওই সংস্থাটি একসময় ছিল। কিন্তু সেই সংস্থা ২০১৮ সালের আগস্টে রেজিস্ট্রার অব কোম্পানিজ নথি থেকে বাদ স্ট্রাইক অব দেওয়া হয়। অর্থাৎ ঘোষিত ওই লেনদেনের তিন বছর আগেই সংস্থাটি সরকারি রেকর্ড থেকে মুছে গিয়েছিল। ওই সংস্থার তালিকাভুক্ত ছয় জন শেয়ারহোল্ডারই আইপ‍্যাকের সঙ্গে কোনও লেনদেন বা ঋণ দেওয়ার কথা জানেন না বলে দাবি করেছেন।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইপ‍্যাক ২০২১ সালে রেজিস্ট্রার অব কোম্পানিতে যে নথিগুলি দাখিল করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, তৃণমূলের ভোটকুশলী সংস্থা ওই বছরের ১৭ ডিসেম্বর রমাসেতু ইনফ্রাস্টাকচার প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি সংস্থা কাছ থেকে ১৩ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়েছে। সেই ঋণ নেওয়ার জন্য কোনও সম্পত্তি বন্ধক রাখা হয়নি। নথি অনুযায়ী, হরিয়ানার রোহতকের অশোকা প্লাজার তৃতীয় তলে ঋণদাতা সংস্থার ঠিকানা দেওয়া ছিল।

হরিয়ানার রোহতকের ওই ঠিকানায় গিয়ে দেখা যায়, রমাসেতু ইনফ্রাস্টাকচার প্রাইভেট লিমিটেড নামে কোনও সংস্থাই সেখানে কাজ করে না। শুধু তা-ই নয়, আরওসির নথি ঘেঁটে দেখা গিয়েছে, রমাসেতু ইনফ্রাস্টাকচার প্রাইভেট লিমিটেড নামে কোনও সংস্থাই কখনও নথিভুক্ত হয়নি। তবে সরকারি রেকর্ডে রমাসেতু ইনফ্রাস্টাকচার প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি অনুরূপ সংস্থার অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। সেই সংস্থাটি ২০১৩ সালের অক্টোবরে রোহতকের ঠিকানায় নথিভুক্ত হয়েছিল। কিন্তু সেই সংস্থাটিকেও ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট আরওসি স্ট্রাইক অফ করে দিয়েছে। আইপ‍্যাক যে ঋণের কথা ঘোষণা করেছে, তার তিন বছর আগেই সংস্থাটি সরকারি নথি থেকে বাদ পড়ে যায়।

অন‍্যদিকে, ২০২৫ সালে ২৭ জুন দেওয়া আরেকটি ঘোষণায় আইপ্যাক জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে তারা ১৩ কোটি ৫০ লক্ষ টাকার ঋণের মধ্যে এক কোটি টাকা পরিশোধও করে দিয়েছে। বকেয়া রয়েছে ১২ কোটি ৫০ লক্ষ কোটি টাকা।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, “এই ঋণের উৎস এবং ঋণদাতার পরিচয় জানতে ইমেল এবং মোবাইল ফোনে আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তবে তিনি কোনও উত্তর দেননি। ফরিদাবাদে আইপ্যাকের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট পুনম চৌধুরীকেও প্রশ্ন করা হয়। কিন্তু তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন। তাঁর এক সহযোগী জানান, ‘আমরা প্রশ্নগুলি প্রতীক জৈনের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। তিনিই উত্তর দিতে পারেন।’ আইপ্যাকের কোম্পানির সচিব তরুণা কালরাও মন্তব্য করতে চাননি।”

জানা গিয়েছে, রেজিস্ট্রার অফ কোম্পানিজ নথি অনুযায়ী, রমাসেতু ইনফ্রাস্টাকচার প্রাইভেট লিমিটেড সংস্থাটি কোম্পানি আইনে ২৪৮(১) ধারায় বিলুপ্ত করা হয়। যেসব সংস্থা ব্যবসা শুরু করতে ব্যর্থ হয়েছে, টানা দু’বছর ব্যবসা বন্ধ রেখেছে, অথবা আইনি ও নথিভুক্তিকরণের নিয়ম মানেনি—সেই সব সংস্থাকে ওই ধারা অনুযায়ী রেজিস্ট্রার বাতিল করতে পারে। আরওসির নথিতে কেবলমাত্র রমাসেতু ইনফ্রাস্টাকচার প্রাইভেট লিমিটেড সংস্থাটির অন্তর্ভুক্তির দলিল পাওয়া গিয়েছে। তৃণমূলের ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক যে রমাসেতু ইনফ্রাস্টাকচার প্রাইভেট লিমিটেড সংস্থার নাম ঘোষণা করেছে, তার কোনও সেখানে নথি নেই বলেই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

আরওসির নথিতে আরও দেখা যায়, ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর তারিখে রমাসেতু ইনফ্রাস্টাকচার প্রাইভেট লিমিটেড এবং সুনীল গোয়েল (এবং অন্যান্যদের) মধ্যে একটি ভাড়ার চুক্তি হয়েছিল। ওই চুক্তি অনুযায়ী, হরিয়ানার রোহতকের অশোকা প্লাজার তৃতীয় তলার একটি অংশ ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। সুনীল গোয়েল ওই সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “এখন আর কিছু মনে নেই।” অশোকা প্লাজার ম্যানেজার সতবীরের কথায়, তিনি সেখানে ছ’বছরের বেশি সময় ধরে আছেন। সেখানে রমাসেতু ইনফ্রাস্টাকচার প্রাইভেট লিমিটেড নামে কোনও সংস্থার অস্তিত্ব তিনি জানেন না।

জানা গিয়েছে, রমাসেতু ইনফ্রাস্টাকচার প্রাইভেট লিমিটেড অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সময় ছ’জন শেয়ারহোল্ডারের নাম ছিল— বিক্রম মুঞ্জল (রোহতক), সন্দীপ রানা (হিসার), বিজেন্দর (জিন্দ), বালজিত জ‍্যাংড়া (হিসার), প্রদীপ কুমার (হিসার) এবং জগবীর সিংহ (সোনিপত)।

এই ছ’জনই দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে জানান, কোম্পানিটি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আইপ্যাককে কোনও ঋণ দেওয়ার বিষয়ে তাঁরা কিছুই জানেন না। বর্তমানে গুরুগ্রামের একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত সন্দীপ রানা বলেন, “আমরা কোম্পানিটি খুলেছিলাম। কিন্তু কোনও ব্যবসা করিনি। খুব তাড়াতাড়িই সেটি ভেঙে দেওয়া হয়। এই ধরনের কোনও লেনদেনের কথা আমি জানি না।”

জিন্দের বাসিন্দা ও এক ইউটিউব চ্যানেল পরিচালনাকারী বিজেন্দর জানান, সংস্থাটি জমি সংক্রান্ত ব্যবসার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু প্রথম চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পরে তা পরিত্যাগ করা হয়। তিনি বলেন, “আমরা কোম্পানি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিই। এই লেনদেন সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। অন্য শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গেও আমার আর কোনও যোগাযোগই নেই।”

রোহতকের আইনজীবী ও প্রপার্টি ব্রোকার বিক্রম মুঞ্জল বলেন, “আমরা কোম্পানিটি বন্ধ করে দিয়েছিলাম। এই ধরনের কোনও লেনদেনের বিষয়ে আমি অবগত নই।” প্রদীপ কুমার, জগবীর সিংহ এবং বালজিৎ জ‍্যাংড়াও একই ভাবে জানান, কোম্পানি বন্ধ হওয়ার পর আইপ্যাকের সঙ্গে কোনও লেনদেনের বিষয়ে তাঁদের কোনও ধারণা নেই।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস দাবি করেছে, একই ধরনের নাম থাকা আরও আটটি কোম্পানির আরওসির নথিও খতিয়ে দেখা হয়েছে। ২০২১ সাল ও তার পরের দাখিল করা নথিতে কোনও সংস্থাই ১৩ কোটি ৫০ লক্ষ টাকার কোনও লেনদেনের কথা উল্লেখ করেনি। আইপ্যাক ২০২১ সালের ডিসেম্বরের ঘোষণায় সঙ্গে কোনও মিল নেই।

উল্লেখ্য, আরওসির নথি অনুযায়ী, আইপ্যাক ২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল মাসে বিহারের পটনায় অন্তর্ভুক্তিকরণ করা হয়েছিল। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তার নিবন্ধিত দফতর কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়। সংস্থাটির কর্ণধার এবং শেয়ারহোল্ডার— প্রতীক জৈন, ঋষিরাজ সিংহ এবং বিনেশ চণ্ডেল— প্রতিষ্ঠার পর থেকে অপরিবর্তিত রয়েছেন।


Share