BJP

শুধু সংগঠন নয়, এ বার কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে তৎপর শাসকদল, রাজ্যজুড়ে ‘কর্মী প্রশিক্ষণ মহাঅভিযান’ করবে বিজেপি

সেই উদ্দেশ্যেই সারা দেশে শুরু হয়েছে ‘পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় কর্মী প্রশিক্ষণ মহাঅভিযান ২০২৬’। রাজ্যে ইতিমধ্যেই রাজ্য ও জেলা স্তরের প্রশিক্ষণ পর্ব সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে মণ্ডল স্তরের ‘প্রশিক্ষণ বর্গ’।

প্রতীকী চিত্র।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২৫ জুন ২০২৬ ০১:২২

বিরোধী শিবিরে থাকাকালীন বিজেপির মূল লক্ষ্য ছিল সংগঠন সম্প্রসারণ। তবে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর সেই অগ্রাধিকারে বদল এসেছে। সংগঠন বিস্তারের পাশাপাশি এখন জোর দেওয়া হচ্ছে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী গড়ে তোলার ওপর। সেই উদ্দেশ্যেই সারা দেশে শুরু হয়েছে ‘পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় কর্মী প্রশিক্ষণ মহাঅভিযান ২০২৬’। রাজ্যে ইতিমধ্যেই রাজ্য ও জেলা স্তরের প্রশিক্ষণ পর্ব সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে মণ্ডল স্তরের ‘প্রশিক্ষণ বর্গ’। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশ, আগামী পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে রাজ্যের এক হাজার ৩১৩টি মণ্ডলে ২৪ ঘণ্টাব্যাপী এই প্রশিক্ষণ শিবির আয়োজন করতে হবে।

বিজেপির সর্বভারতীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) শিবপ্রকাশের নেতৃত্বে শুরু হয়েছে এই ‘কর্মী প্রশিক্ষণ মহাঅভিযান’। বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া মণ্ডল স্তরের প্রতিটি প্রশিক্ষণ শিবিরের মেয়াদ হবে টানা ২৪ ঘণ্টা। বিকেল পাঁচটায় অংশগ্রহণকারীদের শিবিরে উপস্থিত থাকতে হবে এবং পরের দিন একই সময়ে শিবির শেষ হবে। ফলে রাত্রিযাপন বাধ্যতামূলক। বুথ সভাপতি, শক্তিকেন্দ্র প্রমুখ থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট মণ্ডলের বাসিন্দা জেলা ও রাজ্য স্তরের পদাধিকারী সকলকেই এই প্রশিক্ষণে অংশ নিতে হবে। সবার জন্যই একই ধরনের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, একসঙ্গে ২৪ ঘণ্টা কাটানো এবং একই পরিবেশে থাকার অভিজ্ঞতা কর্মীদের মধ্যে সংগঠনবোধ ও ‘কার্যকর্তা ভাব’ আরও দৃঢ় করতে সাহায্য করবে।

প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মেয়াদও স্তরভেদে আলাদা রাখা হয়েছে। রাজ্য স্তরের প্রশিক্ষণ বর্গ চলে তিন দিন, জেলা স্তরে দু’দিন। বর্তমানে মণ্ডল স্তরে ২৪ ঘণ্টার আবাসিক শিবিরের আয়োজন করা হচ্ছে। পরবর্তী পর্যায়ে বুথ স্তরে একই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হলে তার সময়সীমা হবে চার ঘণ্টা।

বিজেপি সূত্রের খবর, মণ্ডল স্তরের ২৪ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ শিবিরে মোট আটটি সেশন থাকবে। প্রতিটি সেশনে পৃথক বক্তা নির্দিষ্ট বিষয়ে বক্তব্য রাখবেন। আলোচনার বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে দলের আদর্শগত ভিত্তি, বিজেপির ইতিহাস ও বিকাশ, সংগঠন সম্প্রসারণের কৌশল, কর্মীদের আচরণবিধি ও কর্মপদ্ধতি, কেন্দ্র ও রাজ্যের বিজেপি সরকারের সাফল্য এবং বিভিন্ন প্রকল্পের সুফল মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ভূমিকা। এ ছাড়া সমাজমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নমো অ্যাপ ও সরল অ্যাপের ব্যবহার নিয়েও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বুথ ব্যবস্থাপনা, ‘মন কি বাত’, টিফিন মিটিং এবং আসন্ন সাংগঠনিক কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হবে। শেষ সেশনে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিজেপির দায়িত্ব ও করণীয় তুলে ধরা হবে।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বিজেপির ‘প্রশিক্ষণ মহাঅভিযান’-এর মাধ্যমে দলের আদর্শ, নীতি ও কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে কর্মী এবং পদাধিকারীদের অবহিত করা, আচরণবিধি নির্ধারণ, জনসংযোগের কৌশল ব্যাখ্যা এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মসূচির গুরুত্ব তুলে ধরার লক্ষ্য।

রাজনৈতিক মহলের এ-ও মনে করছেন, সংগঠননির্ভর ও কর্মীকেন্দ্রিক দল হিসেবে বিজেপির ক্ষেত্রেও প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী গড়ে তোলা সমানভাবে জরুরি। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি যে এই বিষয়টিকে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে, তা ইতিবাচক লক্ষণ বলেই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। তাঁদের মতে, বিপুল জনসমর্থন পেয়ে ক্ষমতায় আসার পর সাংগঠনিক দুর্বলতাগুলিকে উপেক্ষা করা হলে ভবিষ্যতে দলের জন্য তা সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারত।

প্রশিক্ষণ মহাঅভিযানকে শুরু থেকেই একমুখী বক্তৃতার বদলে অংশগ্রহণমূলক কর্মসূচি হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে বিজেপি। দলীয় নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিটি সেশনের জন্য এক ঘণ্টা সময় বরাদ্দ থাকবে। তার মধ্যে প্রথম ৪০ মিনিটে বক্তারা নির্ধারিত বিষয় উপস্থাপন করবেন, আর বাকি ২০ মিনিট রাখা হবে কর্মীদের প্রশ্নোত্তর পর্বের জন্য। মণ্ডল স্তরে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে জেলায় জেলায় ৭০ সদস্যের বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে। ওই প্রশিক্ষকদের প্রস্তুতিপর্বও প্রায় সম্পূর্ণ। বিজেপি সূত্রে খবর, কয়েকটি জেলায় এখনও বক্তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চলছে। এই শিবিরে শক্তিকেন্দ্র ইনচার্জ, মণ্ডল কার্যনির্বাহী সদস্য, বিভিন্ন মোর্চার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মণ্ডলের বাসিন্দা জেলা বা রাজ্য স্তরের পদাধিকারী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

বিজেপির ‘প্রশিক্ষণ মহাঅভিযান’ রাজ্যে দলের কর্মপদ্ধতিতেও নতুন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই শিবির আয়োজনের জন্য কেন্দ্র বা রাজ্য স্তর থেকে কোনও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে না। দলীয় নির্দেশিকায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, স্থানীয় স্তরে স্বেচ্ছা অনুদান ও জনসহযোগিতার ভিত্তিতেই শিবিরের খরচ বহন করতে হবে। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট এলাকার কর্মী-সমর্থকদের আর্থিক ও বস্তুগত সহযোগিতায় আয়োজন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শিবিরে অংশগ্রহণের জন্য প্রত্যেককে ১০০ টাকা করে জমা দিতে হবে। তবে শুধু সেই অর্থে পুরো খরচ মেটানো সম্ভব নয়। কারণ প্রতিটি মণ্ডল স্তরের শিবিরে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন অংশ নেবেন এবং তাঁদের ২৪ ঘণ্টার থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য ব্যবস্থার দায়িত্ব থাকবে আয়োজকদের উপর। দল প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম সরবরাহ করলেও মঞ্চসজ্জা, প্রশিক্ষণস্থলের সাজসজ্জা, অংশগ্রহণকারীদের ব্যাগ, ডায়েরি, কলম, উত্তরীয়-সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যবস্থা স্থানীয় মণ্ডলকেই করতে হবে।

বিরোধী দলে থাকাকালীন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির অধিকাংশ সাংগঠনিক কর্মসূচির খরচই বহন করত কেন্দ্রীয় বা রাজ্য নেতৃত্ব। সেই ব্যবস্থা নিয়ে দলের অন্দরেই প্রশ্ন উঠেছিল। অনেকের মতে, উপরতলা থেকে সহজে অর্থসাহায্য পাওয়ার ফলে স্থানীয় স্তরে অর্থ সংগ্রহ ও জনসংযোগের সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। যদিও পাল্টা যুক্তি ছিল, তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদা তোলা বিজেপির পক্ষে সহজ ছিল না। তবে দলের একাংশের মত, সব কর্মসূচির জন্য কেন্দ্রীয় অর্থের উপর নির্ভরশীলতা সংগঠনের মধ্যে স্বচ্ছতার অভাব এবং দুর্নীতির সুযোগও বাড়ায়। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে অনুদান সংগ্রহ করলে মানুষের সঙ্গে দলের যোগাযোগও আরও মজবুত হয়। সেই কারণেই এ বারের ‘প্রশিক্ষণ মহাঅভিযান’-এ আর্থিক স্বনির্ভরতার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। বিজেপি নেতৃত্বের বার্তা স্পষ্ট রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর কর্মীদের মধ্যে আত্মতুষ্টি ঢুকতে দেওয়া যাবে না।


Share    

BJP