Narendra Modi

ইরান-পুতিনের হাত ধরেই শান্তির বার্তা মোদীর, ব্রিকস মঞ্চে ভারতের ভারসাম্যের ‘বিগ পিকচার’

সাম্প্রতিক সময়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠা পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক ও ভূকৌশলগত পরিস্থিতি নিয়ে দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দেন, সংঘাত নয়, কূটনৈতিক আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমেই সংকটের সমাধান সম্ভব।

ব্রিকস সামিটের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক মোদীর।
নিজস্ব সংবাদদাতা, দিল্লি
  • শেষ আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:৩৭

দিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সাম্প্রতিক সময়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠা পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক ও ভূকৌশলগত পরিস্থিতি নিয়ে দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দেন, সংঘাত নয়, কূটনৈতিক আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমেই সংকটের সমাধান সম্ভব।

বৈঠকে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাণিজ্যিক জাহাজের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা এবং সমুদ্রে থাকা নাবিকদের নিরাপত্তার বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী জোর দেন।

বৈঠকে পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভারতের অটল ও সুস্পষ্ট অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, এই অঞ্চলের সমস্ত বিতর্কিত বিষয় ও সংঘাতের স্থায়ী সমাধান একমাত্র কূটনৈতিক আলোচনা এবং পারস্পরিক সংলাপের মাধ্যমেই সম্ভব।

পশ্চিম এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য নিরবচ্ছিন্ন আন্তর্জাতিক প্রয়াসের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচল, আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্য রক্ষা এবং জাহাজে কর্মরত নাবিকদের জীবন ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।" উল্লেখ্য, লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালী সংলগ্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে বহু ভারতীয় নাবিক এবং বাণিজ্যিক জাহাজ আন্তর্জাতিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

দুই রাষ্ট্রনেতা বৈঠকে ভারত ও ইরানের দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করেন। প্রতিকূল ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও ব্রিকসের একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ইরানের ধারাবাহিক ও সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

মোদী উল্লেখ করেন, গ্লোবাল সাউথের উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে উদ্ভাবন, পারস্পরিক সহযোগিতা, স্থায়িত্ব এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্রিকসের সম্ভাবনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিকস বিজনেস ফোরামের ‘লিডার্স সেশন’-এ অংশ নেওয়ার জন্যও পেজেশকিয়ানকে তিনি ধন্যবাদ জানান।

উল্লেখযোগ্য ভাবে, দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে মোদী ও পেজেশকিয়ানের মধ্যে এটি ছিল দ্বিতীয় সাক্ষাৎ। এর আগে গত ৩১ অগস্ট বিশকেকে সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকেও দুই নেতা মুখোমুখি বৈঠক করেছিলেন। আন্তর্জাতিক ও বহুপাক্ষিক বিভিন্ন মঞ্চে ভারত ও ইরানের অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলিতে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতারও প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী।

এ দিকে, দিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস বিজনেস সামিট থেকে সামনে আসা একটি ছবি ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে। ছবিতে যেন ধরা পড়েছে সংঘাত ও বিভাজনে জর্জরিত বিশ্বের মাঝে ভারতের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থানের একটি প্রতীকী চিত্র। ফ্রেমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে একহাতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের হাত ধরে থাকতে দেখা যাচ্ছে। তাঁদের পাশেই রয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছবিটির তাৎপর্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্য দিকে, ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা দেশগুলির একের পর এক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে রাশিয়া। এই পরিস্থিতিতে ভারত তার কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে এগোচ্ছে। একদিকে ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক অটুট রাখছে নয়াদিল্লি, অন্য দিকে আমেরিকা-সহ পশ্চিমা শক্তিগুলির সঙ্গেও নিজেদের কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও দৃঢ় করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে ব্রিকসের মঞ্চে মোদীকে ঘিরে ওই ছবিকে ভারতের বহুমুখী কূটনৈতিক অবস্থানের প্রতীক হিসেবেই দেখছে আন্তর্জাতিক মহলের একাংশ।

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকেও ভারতের এই সুনির্দিষ্ট নীতিরই প্রতিফলন দেখা গিয়েছে। একই বার্তা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পৃথক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকেও উঠে এসেছে। প্রতিরক্ষা, শক্তি, বাণিজ্য এবং কৌশলগত সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি ইউক্রেন সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথাও মোদী ফের তুলে ধরেছেন।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে দিল্লি বারবার স্পষ্ট করেছে, বিশ্বের কোনও ভূরাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে ভারত নিষ্ক্রিয় বা নীরব নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করে না। বরং সংঘাতের পরিবর্তে শান্তি, সংলাপ ও কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষেই ভারতের অবস্থান। কোনও নির্দিষ্ট শক্তিশালী বলয় বা শিবিরে যোগ না দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন মেরুর দেশগুলির সঙ্গে যোগাযোগ এবং আলোচনার পথ খোলা রাখাই নয়াদিল্লির কৌশল। ফলে পশ্চিম এশিয়া থেকে ইউক্রেন—বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক সংকটে ভারত একদিকে নিজের কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখেছে। অন্য দিকে, শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে সরব থেকেছে।


Share