Humayun Kabir

মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পদক্ষেপ করল পুলিশ, গ্রেফতার হুমায়ুন কবিরের সভার তিন আয়োজক, বিধায়ককে জোড়া নোটিশ

সেই অভিযোগের ভিত্তিতে রেজিনগর ও শক্তিপুর থানায় পৃথক দুটি এফআইআর দায়ের হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে বিধায়ককে হাজিরার নোটিশও পাঠিয়েছে পুলিশ। নোটিশ অনুযায়ী, আগামী ৩ জুলাই শক্তিপুর থানায় এবং ৫ জুলাই রেজিনগর থানায় তাঁকে হাজিরা দিতে বলা হয়েছে।

হুমায়ুন কবীর।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬ ০৩:৪২

ধর্মীয় উস্কানিমূলক মন্তব্যের প্রেক্ষিতে পদক্ষেপ করল পুলিশ। গ্রেফতার নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবিরের সভার তিন আয়োজক। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কড়া হুঁশিয়ারির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সোমবার রাতে দুই পৃথক অভিযানে গোলাম মোস্তাফা, মোহাম্মদ আমিনুক হক এবং আনিসুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি, বিতর্কিত সভার ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবিরকেও তলব করেছে পুলিশ।

সম্প্রতি মুর্শিদাবাদের রেজিনগর ও শক্তিপুরে সভা করেছিলেন আমজনতা উন্নয়ন পার্টি (এজেইউপি)-র বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। ওই সভাগুলিতে তাঁর বক্তব্যের একাংশকে কেন্দ্র করে উস্কানিমূলক মন্তব্যের অভিযোগ ওঠে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে রেজিনগর ও শক্তিপুর থানায় পৃথক দুটি এফআইআর দায়ের হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে বিধায়ককে হাজিরার নোটিশও পাঠিয়েছে পুলিশ। নোটিশ অনুযায়ী, আগামী ৩ জুলাই শক্তিপুর থানায় এবং ৫ জুলাই রেজিনগর থানায় তাঁকে হাজিরা দিতে বলা হয়েছে।

মঙ্গলবার শক্তিপুরে বিধায়ক হুমায়ুন কবিরের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে নোটিশ দেয় পুলিশ। বিতর্কিত মন্তব্যের প্রেক্ষিতে তিনি কেন ওই মন্তব্য করেছিলেন এবং তার নেপথ্যে কী কারণ ছিল, তা জানতে চেয়েছেন তদন্তকারীরা। সেই বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তদন্তকারী অফিসারের সঙ্গে দেখা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাঁকে। নোটিশ প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবির বলেন, “পুলিশ পুলিশের কাজ করবে। পুলিশের কাছে যদি মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ থাকে, তাহলে তো পুলিশ তা অমান্য করতে পারবে না।” এজেইউপি বিধায়কের বক্তব্য, নোটিশ দেখার পরে তিনি পরবর্তী পদক্ষেপ জানাবেন।

হুমায়ুন কবিরের বিতর্কিত মন্তব্যের রেশ গড়ায় বিধানসভার অধিবেশনেও। সোমবার অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ওই মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আইন ভঙ্গ বা উস্কানিমূলক মন্তব্যের ক্ষেত্রে পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এবং দ্রুত ‘অ্যাকশন’ নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন। হুমায়ুনকে নিশানা করে তিনি বলেন, “যারা ওঁকে ডেকেছিল, তাদের আগে তুলব, তার পর আপনার কাছে যাব। যা করার করব, আমি আশ্বস্ত করছি। ধরে রাখুন এটা ওঁর শেষ বক্তব্য। এ সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে।’’ মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “এনাফ ইজ এনাফ। সময় এসেছে এই ধরনের লোককে সবক শেখানোর।’’ হুমায়ুনকে সংযত হওয়ার জন্যও বলেন তিনি।

মুখ্যমন্ত্রীর ওই কড়া সতর্কবার্তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পদক্ষেপ করল পুলিশ। রেজিনগর থানায় দায়ের হওয়া মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে গোলাম ও আমিনুলকে। গোলাম এজেইউপির কাশীপুর-২ অঞ্চলের সভাপতি। অন্য দিকে, শক্তিপুর থানার পুলিশ গ্রেফতার করেছে আনিসুরকে। তিনি এজেইউপির বেলডাঙা-২ ব্লকের আহ্বায়ক।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতদের মধ্যে আমিনুল হকের বাড়ি রেজিনগরের লোকনাথপুর গ্রামে। অপর ধৃত তথা সভার ‘মূল উদ্যোক্তা’ গোলাম মোস্তাফার বাড়ি কাশীপুর এলাকায়। তদন্তকারীদের দাবি, তিনিই দলীয় সভার আয়োজনের জন্য পুলিশের কাছে অনুমতি নিয়েছিলেন। অভিযোগ, সেই সভাতেই নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবির বিতর্কিত ও উস্কানিমূলক মন্তব্য করেছিলেন।

রেজিনগরের সভায় হুমায়ুন কী মন্তব্য করেছিলেন, তা সোমবার বিধানসভায় পড়ে শোনান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘মাননীয় হুমায়ুন কবির যে বক্তৃতা করেছেন, তা পড়ে শোনাচ্ছি। ২৬ জুন বলেছেন। পার্টির মিটিং করেছেন রেজিনগরে। সেখানে তিনি বলছেন, ‘এই যে অনামিকা ঘোষ ভোটে হেরে মনে করছেন আমি এমএলএ। এখানে এখন আস্ফালন করে বেড়াচ্ছেন! তা আমি শুভেন্দুকে বলেছি, আপনি ভোটে জিতেছেন, আপনার দল জিতেছে ভাল কথা! মুর্শিদাবাদে আস্ফালনটা কম করবেন। আমি যে দিন ময়দানে মুসলমানদের নিয়ে নেমে যাব না, এমন স্যাঁটা ভাঙা মার শুরু করব, যে ময়দানে আপনাদের পতাকা বহন করার লোক থাকবে না। বহরমপুরের সেন্ট্রাল জেলের যা আয়তন, তাতে চার হাজার ৭০০ থেকে চার হাজার ৮০০ জনের বেশি ধরে না। লাফিয়ে লাফিয়ে লোককে রাস্তায় নিয়ে নামাব, স্যাঁটা ভাঙা মারব...।’’ মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, হুমায়ুন যে ভাষায় বক্তৃতা করেছেন, তা করার ক্ষমতা তাঁকে কেউ দেয়নি।

এজেইউপি কর্মীদের গ্রেফতার এবং তাঁর নামে জোড়া নোটিশ জারি হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া দেন নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, “যখন আমি কলকাতায় ছিলাম, তখন বিজেপির জেলা সভাপতি তৃণমূলের গুন্ডাদের সঙ্গে নিয়ে আমাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছিলেন। আমিও আম জনতা উন্নয়ন পার্টির পক্ষ থেকে সেই চ্যালেঞ্জের পাল্টা প্রতিক্রিয়া দিয়েছি। পুলিশ গ্রেফতার করলে তাঁরা (এজেইউপি কর্মীরা) বিচারব্যবস্থার শরণাপন্ন হবেন। বিচারব্যবস্থা যদি বলে আমার সহকর্মীরা জেলে থাকবেন, তাহলে তাঁরা তা-ই থাকবেন।” হুমায়ুন আরও দাবি করেন, তিনি কোনওভাবেই ভীত নন এবং কোনও রাজনৈতিক দলের ‘দাসত্ব’ স্বীকার করবেন না। তিনি জানান, তাঁরা গণতান্ত্রিক ভাবে, গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে লড়াই করবেন।

মুখ্যমন্ত্রীর কড়া বার্তার পর সোমবারই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবির। তাঁর দাবি, তিনি মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনও মন্তব্য করেননি। হুমায়ুনের বক্তব্য, “যাঁরা নবাগত বিজেপি, ৪ মে-র পরে যাঁরা বিজেপি হয়েছেন, তাঁরা যে ভাবে এলাকায় অশান্তি অত‍্যাচার করেছেন, তার বিরুদ্ধে বলেছি। তাতে যদি আমাকে গ্রেফতার করা হয়, হবে। আমি তো এই লোকগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করে নতুন দল তৈরি করেছি। জিতেছি।’’


Share