Election Effect in New Generation

ফর্ম ৬-এর গ্রাফ নিম্নমুখী, ভোট রাজনীতি থেকে কি মুখ ফিরোচ্ছে তরুণ প্রজন্ম?

নির্বাচনী বছর এবং তার উপর এসআইআর পর্বে ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও গত ১৭ ডিসেম্বর থেকে এক মাসেরও বেশি সময়ে নতুন নাম তোলার জন্য ফর্ম ৬ জমা পড়েছে সাত লক্ষ ৪৪ হাজার ২৭৭টি।

প্রতীকী চিত্র।
অরুণিমা কর্মকার, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৯

একদিকে মানুষের আবেগকে পুঁজি করে রাজনীতির একঘেয়েমি, অন্যদিকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি থাকলেও কার্যকর ভূমিকায় অনেকের চোখে অসাড় নির্বাচন কমিশন। এই বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠছে, নতুন প্রজন্ম কি ধীরে ধীরে ভোট রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে? রাজ্যে চলতি ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) পর্বের তথ্য এবং গত এক দশকের নির্বাচনী পরিসংখ্যান সেটারই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

নির্বাচনী বছর এবং তার উপর এসআইআর পর্বে ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও গত ১৭ ডিসেম্বর থেকে এক মাসেরও বেশি সময়ে নতুন নাম তোলার জন্য ফর্ম ৬ জমা পড়েছে সাত লক্ষ ৪৪ হাজার ২৭৭টি। এদের সবাই যদি সদ্য ১৮ বছরে পা দেওয়া তরুণ ভোটারও হন, তবু গত এক যুগের তুলনায় এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে কম।

তাহলে কি নতুন প্রজন্ম ভোটারেরা তালিকায় নাম তুলতে অনীহা দেখাচ্ছেন? নির্বাচনী বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্য বলছে নতুন প্রজন্ম আগের তুলনায় বেশি যুক্তিবাদী ও ক্যারিয়ারমুখী, ফলে ভোট রাজনীতির প্রতি আগ্রহ কমছে। যদিও রাজ্যের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিও এই প্রবণতার জন্য আংশিক দায়ী। আবার অনেক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজ্যে রাজনৈতিক নেতাদের ওপর অনীহা তৈরি হচ্ছে। তবু প্রতিটি যোগ্য নাগরিককে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্বাচন কমিশনের মূল লক্ষ্য কতটা সফল হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন থাকছে।

এসআইআর পর্বে ভুয়ো ভোটার বাদ দিয়ে স্বচ্ছ তালিকা তৈরির কথা বলা হলেও নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তিতে বড় পরিবর্তন আসবে— এমন বিষয়ে শুরু থেকেই খুব আশাবাদী ছিলেন না কমিশনের কর্তারা। সাম্প্রতিক তথ্য সেই আশঙ্কাকেই জোরদার করেছে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকে ২০২৬-এর নির্বাচনী বছর পর্যন্ত ফর্ম ৬ জমার গ্রাফ ক্রমশ নিম্নমুখী। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন পড়েছিল ১৪ লক্ষ ৩০ হাজার ৯৯৮টি, যা গত দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম ছিল। ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে ৭ লক্ষ ৪৪ হাজার ২৭৭-এ—যা প্রায় অর্ধেক।

চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর অতিরিক্ত আবেদন এলেও তাতে সামগ্রিক ছবিতে বড় বদল আসবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। ফলে নতুন প্রজন্মকে ভোটমুখী করার দায়িত্ব আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন কমিশনের পদস্থ আধিকারিকরা।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছিলেন ৩২ লক্ষ ২৯ হাজার। ২০১৫ সালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২১ লক্ষ ৫৩ হাজারে— এক বছরে প্রায় ১১ লক্ষ হ্রাস। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তা আবার বেড়ে হয় ২৬ লক্ষ ৩৩ হাজার। অর্থাৎ নির্বাচনী বছরে সাধারণত সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও পরের বছর আবার কমেছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি ছিল ২০ লক্ষ ৪৫ হাজার, যা আগের তুলনায় কম প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।

অন্যদিকে মোট ভোটার সংখ্যা বেড়েছে—২০২২ সালে ৭ কোটি ৩২ লক্ষ, ২০২৩ সালে ৭ কোটি ৪২ লক্ষ এবং ২০২৪ সালে ৭ কোটি ৫৩ লক্ষ ৮৬ হাজার। তবু নতুন প্রজন্মের অন্তর্ভুক্তির হার নিম্নমুখীই রয়ে গেছে।

সব মিলিয়ে গত এক যুগের তথ্য বলছে, রাজ্যে নতুন ভোটার যুক্ত হওয়ার প্রবণতা কমছে, এবং ২০২৬-এর আগে সেই নিম্নগতি সবচেয়ে স্পষ্ট। ফলে প্রশ্ন উঠছে— পশ্চিমবঙ্গে নতুন প্রজন্ম কি ভোট রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, নাকি এর পেছনে জনসংখ্যাগত অন্য কোনও কারণ কাজ করছে? তার উত্তর সময়ে মিলবে বলে আশাবাদী রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।


Share