Kumartuli

এঁটেল মাটির আকাল, থমকে প্রতিমা নির্মাণ! কুমোরটুলিতে কি বিপন্ন হতে চলেছে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য?

ইউনেস্কোর তরফ থেকে প্রাপ্ত এই ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট কি সেই ঐতিহ্য বজায় রাখতে পারবে, পুনরায় কি স্বাভাবিক হবে এই কুমোরটুলির অলি-গলি। এই সংকট কি শুধুই সাময়িক সমস্যা নাকি এর জেরে বিপন্ন হতে পারে রাজ্যের এক অনন্য সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সেই উত্তরই খুঁজছে সকলে।

খড় দিয়ে বাঁধা হয়েছে কাঠামো।
অরুণিমা কর্মকার ও অনুষ্কা দে, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬ ০৮:৫৮

কুমোরটুলি কথার অর্থ মৃৎশিল্পীদের এলাকা। এই পাড়া ঐতিহ্য ও শিল্পের একটি মেলবন্ধন। বছরের পর বছর ধরে এখানকার শিল্পীদের হাত ধরেই তৈরি হয়েছে দুর্গা, কালী, লক্ষী, সরস্বতী-সহ বিভিন্ন প্রতিমা। এইসমস্ত প্রতিমা শুধুমাত্র দেশ নয়, বিদেশের মাটিতেও সমাদৃত।

আর হাতে গোনা মাত্র চার মাস। তারপরেই বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজো। প্রত্যেক বছর পুজোর কয়েক মাস আগে থেকেই কুমোরটুলিতে শুরু হয়ে যায় প্রতিমা তৈরীর ব্যস্ততা। কিন্তু এ বছর চিত্রটা কিছুটা অন্যরকম। প্রথম থেকে প্রতিমা তৈরি সমস্ত ঠিকঠাক থাকলেও মাঝে কোথাও যেন ছন্দের ব্যাঘাত ঘটেছে। কুমোরটুলির শিল্পীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখা দিয়েছে। প্রতিমা তৈরির মূল উপাদান মাটির সংকট তৈরি হয়েছে। প্রায় এক মাস ধরে আসছে না প্রতিমা তৈরীর মূল উপাদান এঁটেল মাটি।

প্রতি বছর উলুবেরিয়া, কাকদ্বীপ, ডায়মন্ড হারবার-সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে কুমোরটুলিতে আসত প্রতিমা তৈরীর মাটি। ওই মাটি দিয়েই তৈরি হতো প্রতিমা। তারপরেই সাজো সাজো রবে দুর্গা মা লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক, সরস্বতীকে নিয়ে পৌঁছে যেত দুর্গা মন্ডপে। কিন্তু এ বার কোথাও যেন সেই গতিতে ভাটা পড়েছে।

রাজ্যে পালাবদল হয়েছে। সে জন্য অনেক জায়গাতেই বন্ধ বেআইনিভাবে মাটি তোলার কাজ। প্রশাসন কড়া নজরদারিও চালাচ্ছে। সেকারণেই মাটি সঙ্কটে পড়েছে কুমোরটুলি। কলকাতা সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকা থেকেই কুমোরটুলি থেকেই প্রতিমা নিয়ে যায় পুজো মন্ডপে। প্রায় জানুয়ারি মাস থেকেই শুরু হয়ে যায় প্রতিমা তৈরীর কাজ। বিদেশের মাটিতে কুমোরটুলির প্রতিমা পাড়ি দেওয়ার কারনে এই কাজ আরোও দ্রুততার সঙ্গে হয়ে থাকে। শুধুমাত্র কলকাতা নয়, কলকাতা সংলগ্ন বহু এলাকা থেকে মৃৎশিল্পীরা আসে কুমোরটুলিতে। সকাল থেকেই জোর কদমে শুরু হয়ে যায় মাটি মাখার কাজ, এরপরেই দেওয়া হয় প্রলেপ। সামনেই বর্ষা আর বর্ষার আগেই অনেকটা কাজ রাখতে চান কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীরা। কিন্তু এ বছর মাটির সংকটের কারণে অস্তিত্ব বিপন্ন হতে বসেছে। সমস্যায় পড়েছেন শিল্পীরা। শুধুমাত্র মৃৎশিল্পীরা নয় কর্মচারীরাও জীবন জীবিকার সমস্যায় পড়ছেন। কুমোরটুলির ঠাকুর মাটির নির্ভরশীল হলেও প্রতিমার সঙ্গে জড়িত থাকে সাজ শিল্পী, শাড়ির দোকানদার, জুতোর দোকানদার প্রত্যেকেই। প্রতিমা তৈরীর পর মা সেজে ওঠে অপরূপ সাজে। সেই সাজ কখনো ডাকের সাজ আবার কখনো সাবেকী আনায়। প্রত্যেকটি মানুষের আর্থিক দিকটি প্রতিমা তৈরির সঙ্গে জড়িত।

কৃষ্ণ পাল, সুভাষ পাল, রুদ্রজিৎ পাল, মালা পাল-সহ বিভিন্ন মৃৎশিল্পীরা জেলার বহু এলাকা থেকেই মাটি আসত।  এ বছরও তেমনই এসেছিল। কুমোরটুলি এত বড় এলাকা হওয়ার কারণে অনেক সময় অবৈধভাবেও কাটা হত মাটি। তবে নতুন সরকার আসার পর এই কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এর ফলেই কুমোরটুলিতে আসছে না এঁটেল মাটি। অনেক মৃৎশিল্পীদের মতে এই মাটি না এলে সময়মতো প্রতিমা মণ্ডপে পৌঁছে দেওয়া যাবে না। তাদের আশা এই অন্ধকার দূরে সরে নতুন আলো কুমোরটুলিতে ভরে উঠবে।

মৃৎশিল্পীরা তাদের এই দুর্দশার কথা জানিয়েছেন শ্যামপুকুরের বিধায়িকা পূর্ণিমা চক্রবর্তীকে। তিনি মৃৎশিল্পীদের আশ্বাস দিয়েছেন। ঘুরে দেখেছেন পুরো কুমোরটুলি। তিনি এই সমস্যার কথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে জানানোর আশ্বাস দিয়েছেন। শোনা যাচ্ছে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই পৌঁছে যেতে পারে প্রতিমা তৈরীর মাটি। কিন্তু কিছু মৃৎশিল্পীর কথায় উঠে আসছে, এখনো পর্যন্ত কোন মাটি এসে পৌঁছোয়নি। তাঁরা প্রচন্ড চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তাদের চিন্তা যদি মাটি না আসে তাহলে প্রতিমা কিভাবে তৈরি হবে?  কিভাবে তাদের জীবিকা নির্বাহ করবে? এই সমস্ত চিন্তায় দিন কাটছে তাঁদের। ইউনেস্কোর তরফ থেকে প্রাপ্ত এই ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট কি সেই ঐতিহ্য বজায় রাখতে পারবে, পুনরায় কি স্বাভাবিক হবে এই কুমোরটুলির অলি-গলি। এই সংকট কি শুধুই সাময়িক সমস্যা নাকি এর জেরে বিপন্ন হতে পারে রাজ্যের এক অনন্য সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সেই উত্তরই খুঁজছে সকলে।


Share