Anandapur Fire

২৪ দিন পরও অশনাক্ত দেহাংশ, অথচ মিলেছে ক্ষতিপূরণ, আনন্দপুরে অপেক্ষা শুধু ডিএনএ রিপোর্টের

গত ২৫ জানুয়ারি রাতে আনন্দপুরের নাজিরাবাদ এলাকায় পরপর দু’টি গুদামে ভয়াবহ আগুন লাগে। রাতের শিফটে কাজ করা কর্মী ও নিরাপত্তারক্ষীরা ভিতরে আটকে পড়েন। কেউ দেওয়াল ভেঙে বেরোনোর চেষ্টা করেন, কেউ শেষবারের মতো ফোন করেন বাড়িতে।

আনন্দপুরের অগ্নিকাণ্ড
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:২২

এক এক করে কেটে গিয়েছে ২৪ দিন। কিন্তু আনন্দপুরের অগ্নিকাণ্ডে যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন বলে আশঙ্কা, তাঁদের কাউকেই এখনও সরকারি ভাবে শনাক্ত করা যায়নি। পরিবারের হাতে এসে পৌঁছেছে ১০ লক্ষ টাকার ক্ষতিপূরণের চেক, অথচ প্রিয়জনের দেহাংশ পর্যন্ত মেলেনি। মৃত্যুর সরকারি সনদ না মিললেও আর্থিক সহায়তা পৌঁছে যাওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই বিভ্রান্তি ও মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছেন পরিজনেরা। পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

গত ২৫ জানুয়ারি রাতে আনন্দপুরের নাজিরাবাদ এলাকায় পরপর দু’টি গুদামে ভয়াবহ আগুন লাগে। রাতের শিফটে কাজ করা কর্মী ও নিরাপত্তারক্ষীরা ভিতরে আটকে পড়েন। কেউ দেওয়াল ভেঙে বেরোনোর চেষ্টা করেন, কেউ শেষবারের মতো ফোন করেন বাড়িতে। দীর্ঘ সময়ের চেষ্টায় পরদিন দুপুর নাগাদ আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে দমকল। ভস্মীভূত গুদাম থেকে উদ্ধার হয় একের পর এক দেহাংশ। কিন্তু সেগুলি এতটাই পুড়ে গিয়েছে যে, কোন অঙ্গ কার, তা বোঝার উপায় ছিল না।

মোট ২৭টি নিখোঁজ ডায়েরি হয়েছে। বারুইপুর মহকুমা পুলিশ দেহাংশগুলি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছে এবং ২৭টি পরিবারের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে। তবে এখনও পর্যন্ত নিশ্চিত করে মৃতের সংখ্যা জানানো যায়নি।

ঘটনার পর মৃতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করেছিল রাজ্য সরকার। ভস্মীভূত গুদামের একটি ছিল ওয়াও মোমো সংস্থার। সংস্থার তরফেও তাদের তিন কর্মীর পরিবারকে আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়। সম্প্রতি একাধিক পরিবারের হাতে ১০ লক্ষ টাকার চেক তুলে দেওয়া হয়েছে কোথাও জেলাশাসকের মাধ্যমে, কোথাও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির হাতে। তবে মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা না মিলতেই ক্ষতিপূরণ বিতরণ হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।

মেদিনীপুরের নিরঞ্জন মণ্ডল এই অগ্নিকাণ্ডে ভাই গোবিন্দ মণ্ডল (৩৯) এবং ছেলে রামকৃষ্ণ মণ্ডলকে (১৮) হারিয়েছেন বলে আশঙ্কা করছেন। চেক হাতে পেয়েও তিনি তা ভাঙাননি। তাঁর কথায়, ‘‘টাকা তো পেলাম, কিন্তু আমাদের কষ্ট হচ্ছে খুব। এখনও চেকে হাত দিইনি। চাকরিও তো দেবে বলেছিল। আগে তো দেহ পাই! দেহ দেওয়ার আগে টাকা কেন দিল, বুঝতে পারছি না।’’ স্থানীয় পুরোহিতের সঙ্গে আলোচনা করে ১৪ মার্চ শ্রাদ্ধের দিন ঠিক করেছেন তাঁরা, তবে পুলিশের ফোনের অপেক্ষায় রয়েছেন গোটা পরিবার।

ঝাড়গ্রামের রবীশ হাঁসদা আনন্দপুরে ওয়াও মোমোর গুদামে নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর দাদা জানান, এখনও কোনও দেহাংশ দেখতেও পাননি তাঁরা। ফলে শ্রাদ্ধকর্ম সম্পন্ন করা যায়নি। অশৌচ পালন করে চলেছেন পরিবারের সদস্যেরা। ঘরে রান্না বন্ধ। আত্মীয়দের বাড়ি থেকে খাবার আসছে। তাঁর অভিযোগ, “এত দিনেও দেহ পেলাম না। রোজ কলকাতায় এসে খোঁজ নেওয়া সম্ভব নয়। পুলিশ শুধু বলছে, পরে জানাবে।”

মেদিনীপুরের জন্মেজয় দিন্ডার ভাইপো দেবাদিত্য দিন্ডাও নিখোঁজদের তালিকায়। তাঁর পরিবার ১০ লক্ষ টাকার চেক পেয়েছে, যাতে ওয়াও মোমো সংস্থা এবং গুদামের মালিক গঙ্গাধর দাসের নাম রয়েছে। জন্মেজয়ের প্রশ্ন, ‘‘দেহটা যত ক্ষণ না পাচ্ছি, চিন্তায় আছি। পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি। ১০ লক্ষ টাকার একটা চেক আমরা পেয়েছি। তাতে মোমো সংস্থা এবং গুদামের মালিক গঙ্গাধর দাসের নাম রয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার পরে কি আবার টাকা দেওয়া হবে? সেটা বুঝতে পারছি না।’’

পুলিশ সূত্রে খবর, উদ্ধার হওয়া দেহাংশগুলির অবস্থা অত্যন্ত জটিল হওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া শনাক্তকরণের অন্য কোনও উপায় নেই। ফরেনসিক বিভাগের রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে তদন্তকারী দল। তবে এই ধরনের পরীক্ষায় সময় লাগতে পারে বলেই জানানো হয়েছে।

ঘটনার জেরে গুদামের মালিক গঙ্গাধর দাস, ওয়াও মোমোর গুদাম ম্যানেজার মনোরঞ্জন শিট এবং ডেপুটি ম্যানেজার রাজা চক্রবর্তী এই তিন জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাঁরা বর্তমানে জেলে। আগুনের হাত থেকে প্রাণে বাঁচেন মাত্র দু’জন কর্মী। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। পাশাপাশি সংস্থার অন্যান্য কর্তাব্যক্তি ও কর্মচারীদের বয়ানও নথিভুক্ত করা হয়েছে।

২৫ জানুয়ারি রাতে গুদামে ঠিক কত জন ছিলেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। নিখোঁজ ডায়েরিতে নাম থাকা ২৭ জন ছাড়াও কেউ সেখানে ছিলেন কি না, কেউ পালিয়ে বাঁচতে পেরেছিলেন কি না এই প্রশ্নগুলিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের আশা, ডিএনএ রিপোর্ট মিললেই অনেক ধোঁয়াশা কেটে যাবে।

কিন্তু রিপোর্ট কবে মিলবে, তা অজানা। তত দিন ক্ষতিপূরণের চেক হাতে নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রহর গুনবে নিরঞ্জনদের পরিবার। অশৌচ পালন করে দিন কাটাবে রবীশ হাঁসদাদের বাড়ি। আর দেবাদিত্যদের পরিবার অপেক্ষা করবে এক টুকরো নিশ্চিত খবরের জন্য—যা জানাবে, প্রিয়জন সত্যিই আর ফিরবেন না।


Share