Allegation of Corruption

ডিপিআর থেকে কাটমানি, মঞ্চ ভাঙা থেকে অর্থ লোপাটের অভিযোগ, উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতরের ফাইল খুলতেই বেরোচ্ছে চাঞ্চল্যকর তথ্য

অভিযোগ, কাটমানির বিপুল অঙ্কের টাকা বিভিন্ন বেনামী ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে তাঁদের মাধ্যমেই।

রবীন্দ্র ভবন
নিজস্ব সংবাদদাতা, শিলিগুড়ি
  • শেষ আপডেট: ১৩ মে ২০২৬ ১০:৩২

পরিবর্তনের হাওয়ায় একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসছে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতরে। সরকারি অর্থ নয়ছয়ের অভিযোগ ঘিরে এ বার নতুন করে চর্চায় উঠে এসেছে দিনহাটার আগরওয়াল ভাণ্ডারের নাম। অভিযোগ, তাঁদের মাধ্যমেই কাটমানির বিপুল অঙ্কের টাকা বিভিন্ন বেনামী ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে। শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও সেই অর্থ পাচারের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেকেই। দীর্ঘদিন চাপা আতঙ্কে থাকা দফতরের একাংশের আধিকারিকদের দাবি, আগরওয়ালের পাশাপাশি ঠিকাদার সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি চৌধুরীহাটের ‘সেনবাবু’র কাছেও রয়েছে গোপন লেনদেনের একাধিক তথ্য। তদন্তকারীরা তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে বহু অজানা তথ্য সামনে আসতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।

উদয়ন গুহর আমলে উত্তরকন্যায় কাটমানি সিন্ডিকেটের অভিযোগের আবহে এ বার সামনে এসেছে রবীন্দ্রনাথ ঘোষের মন্ত্রিত্বকালের একটি প্রকল্পও। কোচবিহার রবীন্দ্র ভবনের সংস্কার ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। অভিযোগ, সংস্কারের নামে সরকারি কোষাগার থেকে অস্বাভাবিক অঙ্কের টাকার খরচ দেখানো হয়েছে। সিপিএম আমলে যে ভবন নির্মাণে খরচ হয়েছিল এক কোটিরও কম, সেই ভবনের সংস্কারেই পরে প্রায় আট কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়। ফলে ‘উন্নয়নের মহোৎসব’-এর আড়ালে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।

দফতরের আধিকারিকদের একাংশের দাবি, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ডিটেলড প্রোজেক্ট রিপোর্ট তৈরির দায়িত্ব সাধারণত সরকারি ইঞ্জিনিয়ারদের উপরেই থাকে। উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতরে প্রয়োজনীয় ইঞ্জিনিয়ার থাকা সত্ত্বেও রবীন্দ্র ভবনের ডিপিআর তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল শিলিগুড়ির হাকিমপাড়ার পাকুড়তলা মোড়ের একটি বেসরকারি সংস্থাকে। ২০১৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারির একটি মেমো অনুযায়ী সেই দায়িত্ব বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হয়। কেন সরকারি ব্যবস্থাকে এড়িয়ে বাইরে থেকে সংস্থাকে আনা হল, তা নিয়েই এখন উঠছে প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ইঞ্জিনিয়ারদের মাধ্যমে কাজ হলে ব্যয়ের ক্ষেত্রে একাধিক নিয়মকানুন মানতে হত। সেই নিয়ন্ত্রণ এড়াতেই কি বেসরকারি সংস্থাকে ব্যবহার করা হয়েছিল, তা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। উত্তরকন্যার এক আধিকারিকের কথায়, ‘এটা আসলে নিজের ঘরের প্রহরীকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে বাইরের চোরকে চাবি দিয়ে দেওয়ার এক নিখুঁত চিত্রনাট্য।’ প্রায় আট কোটি টাকার এই প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ কোথায় গিয়েছে, তা জানতে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবিও উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মত, উন্নত মানের সামগ্রী ব্যবহার করলেও সংস্কারে এত বিপুল খরচ হওয়ার কথা নয়। ফলে ‘ওভার-ইনভয়েসিং’-এর মাধ্যমে অর্থ লোপাটের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখার দাবি উঠছে।

তবে সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঘোষ। তাঁর দাবি, ‘আমার আমলে সব কাজ স্বচ্ছতার সঙ্গেই হয়েছে। সেই সময় আমাদের কাছে যথেষ্ট সংখ্যায় ইঞ্জিনিয়ার ছিল না বলেই বাইরের সংস্থাকে দিয়ে ডিপিআর তৈরি করাতে হয়েছে। গৌতম দেবের আমল থেকেই ওভাবে কাজ হচ্ছিল। তাছাড়া আমি রবীন্দ্র ভবনের কাজ শেষ করতে পারিনি। উদয়ন গুহ দায়িত্ব নেওয়ার পর কাজ শেষ হয়েছে।’

রবীন্দ্রনাথের এই মন্তব্যের পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরে কি দীর্ঘদিন ধরেই নিয়ম ভেঙে বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে ডিপিআর তৈরির কাজ চলছিল? দফতরের এক আধিকারিকের কথায়, ‘এখন তো সব ফাইল খোলা হবে। তখনই দুধ আর জল আলাদা হয়ে যাবে।’

এরই মধ্যে সংস্কারের গুণগত মান নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। প্রায় আট কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কারের এক বছরের মধ্যেই একটি অনুষ্ঠানের সময় রবীন্দ্র ভবনের মঞ্চের পাটাতন ভেঙে পড়ে। ভবনের আরও বেশ কিছু ত্রুটিও সামনে এসেছে। ফলে সংস্কারে ব্যবহৃত সামগ্রী এবং প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যে বড় ফারাক ছিল কি না, তা নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরপেক্ষ বিশেষ অডিট হলেই প্রকল্পের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। তবেই সামনে আসবে রবীন্দ্র ভবন সংস্কারের আড়ালে কোনও আর্থিক অনিয়ম হয়েছিল কি না।


Share