Mukul Roy

প্রয়াত রাজনীতির ‘চাণক্য’ মুকুল রায়, প্রায় ৬০০ দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি, শোকপ্রকাশ অভিষেক-শুভেন্দুর

রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী সমাজমাধ্যমে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে বলেন, ”মুকুল রায়ের মতো সিনিয়র রাজনীতিবিদের প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই।”

প্রয়াত মুকুল রায়।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:২৬

প্রয়াত রাজনীতির ‘চাণক্য’ মুকুল রায়। ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই মুকুল রায় বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। রবিবার রাতে সল্টলেকের একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে দেহত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। চিকিৎসার প্রয়োজনে একাধিক বার হাসপাতালেও ভর্তি করা হয় রাজনীতির চাণক্যকে।

জাতীয় কংগ্রেস থেকে উত্থান মুকুল রায়ের। নানা রাজনৈতিক উত্থান পতনের মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছিলেন মুকুল। এযেন এক রাজনৈতিক ‘উজ্জ্বল নক্ষত্রের’ পতন হল। রাজ্যের শাসকদল ‘তৃণমূলকে’ তৈরি করার পেছনে একদা ভূমিকা পালন করেন মুকুলই। তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি হওয়ার পর প্রথমের দিকে তার হাতে কোনও সাংগঠনিক কোনও দায়িত্বে ছিলেন না। শোনা যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখেই তৃণমূল কংগ্রেসকে শক্তিশালী করতে একদা ভূমিকা পালন করেছিলেন মুকুল রায়। লাইম লাইটের পেছনে থেকে রাজনীতি করেছেন।

তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে ২০০৬ সালের নির্বাচনের দায়িত্ব ছিল সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায়দের হাতে। ধরাশয়ী হয়েছিল তৃণমূল। মুকুল রায় সেবারে জগদ্দল থেকে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ৫৬ হাজার ভোটে হেরে গিয়েছিলেন মুকুল। সেবারেও তৃণমূলের সাংগঠিনিক ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিলো। তার পরেই তাঁকে দলের সাধারণ সম্পাদক করা হয়। ২০০৬-২০০৯ তারপর ২০১১ এই দীর্ঘ পাঁচ বছর তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা-মুকুল জুটি কমিউনিস্টদের উৎখাত করে। ইউপিএ দ্বিতীয় সরকারের তিন মাস প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন। তারপর সাতমাস রেলমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব সামলেছেন। মুকুল রায়ই পশ্চিমবঙ্গ থেকে শেষ বাঙালি পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে ছিলেন।

মুকুল রায়কে ‘চাণক্য’ বলা হয়। কারণ তিনি ভোট পক্রিয়াটা বেশ ভালোই বুঝতেন। তাঁর ফল যেমন তৃণমূল ২০০৯, ২০১১ সালে পেয়েছিল, তেমনই ২০১৪ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ৩৪টি আসন জিতে নিয়েছিল। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও সংগঠনে পেছন থেকে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় বারের জন্য তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছিল। ‘মুকুলদার’ সেই কৃতিত্ব স্বীকারও করেন তৃণমূলের কিছু নেতারা।

মূলত সাংগঠনিক কিছু বিষয় নিয়েই  বিরোধ নিয়েই তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে। মুকুল রায় ৩ নভেম্বর ২০১৭ সালে বিজেপিতে যোগদান করেন। বিজেপির জাতীয় সহ-সভাপতি পদ সামলেছেন। ২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ১৮টি আসন জিতে নজির গড়ে দিয়েছিল। মুকুল রায় ঘনিষ্ঠ সূত্রের খবর, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মুকুলদার উপরেরই ভরসা রেখেছিল বলেই ২ থেকে বেড়ে ১৮টি আসন জিতেছিল বিজেপি। তাঁদের দাবি , ২০২১ সালের নির্বাচনে মুকুল রায় সক্রিয় ভূমিকা নেননি। ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর উত্তর বিধানসভা থেকে মুকুল রায় প্রায় ৫০ হাজার ভোটে জিতেছিলেন। পরে তাঁকে বিধানসভার পাবলিক অ্যাকাউন্ট কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়।

পরে আবার তৃণমূলে যোগ দেন ‘চাণক্য’ মুকুল রায়। তখনও শারীরিক পরিস্থিতি ভালো ছিল না। তারপর থেকেই মুকুলবাবু ঘরবন্দি। কিছুই মনে রাখতে পারছিলেন না। আগেকার কথা মনে থাকলেও বর্তমানে কী করছেন? কেন করছেন? কিছুই বলতে পারছিলেন না। ভুগছিলেন ডিমেনশিয়ায়। শারীরিক অবস্থা অবনতি হওয়ায় সল্টলেকের বেসরকারি হাসপাতাল ভর্তি করা হয়েছিল। প্রায় ৬০০ দিন ধরে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। রবিবার রাতে তিনি মারা গিয়েছেন।

শুভ্রাংশু রায় বলেন, “গতকাল রাতে মারা গিয়েছেন। গ্রাম থেকে অনেকেই ফোন করছেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ফোন করেছিলেন।” তিনি এই মূহূর্তে হাসপাতালের পৌঁছেছেন। হাসপাতালের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।

তাঁর প্রয়াণে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, “কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শ্রী মুকুল রায় জি'র প্রয়াণে শোকাহত। তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সমাজসেবামূলক প্রচেষ্টা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর পরিবার ও সমর্থকদের প্রতি সমবেদনা জানাই। ওঁ শান্তি।”

তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে সমাজমাধ্যমে লেখেন, “মুকুল রায়ের প্রয়াণ রাজ‍্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগের অবসান। তিনি অভিজ্ঞ ও প্রবীণ এক নেতা ছিলেন। তাঁর অবদান রাজ্যের জনজীবন ও রাজনৈতিক পরিক্রমার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় গঠনে সাহায‍্য হয়েছে।

অভিষেক আরও বলেন, ‘তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা স্তম্ভ হিসেবে তিনি দলটির প্রাথমিক পর্বে বিস্তার ও সংগঠন সুসংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। জনজীবনে তাঁর নিষ্ঠা ও অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে। তাঁর পরিবার, বন্ধু ও অনুরাগীদের প্রতি আমি আন্তরিক সমবেদনা জানাই। ঈশ্বর তাঁর আত্মাকে চিরশান্তি প্রদান করুন।”

মুকুল রায়ের প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করেন রাজ‍্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি সমাজমাধ্যমে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে বলেন, ”মুকুল রায়ের মতো সিনিয়র রাজনীতিবিদের প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই।”


Share