Maoist Operation

ছত্তীসগঢ়ে উল্টো গণনা শুরু, আর বাকি মাত্র তিন জন মাওবাদী জঙ্গি নেতা, ৩১ মার্চের আগেই নকশালমুক্ত হবে ভারত

বস্তরের আইজি পি সুন্দররাজ ওই সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, “নকশালদের দুর্গ ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। এখন এর সম্পূর্ণ উল্টো গণনা শুরু হয়েছে। হাতে গোনা কয়েকজন শীর্ষ মাওবাদী বাকি রয়েছে। তারা প্রাণ বাঁচাতে এদিক-ওদিক পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

প্রতীকী ছবি।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:১২

ছত্তীসগঢ়ের বস্তরে মাওবাদী জঙ্গিদের উল্টো গণনা শুরু হয়ে গিয়েছে। সূত্রের খবর, এখন মাত্র তিনজন শীর্ষ মাওবাদী জঙ্গি নেতা পুরো সংগঠনটি চালাচ্ছে। তাদের বাদ দিয়ে বস্তরে মাত্র একজন কমান্ডার অবশিষ্ট আছে। ছত্তীসগঢ় পুলিশের শীর্ষ আধিকারিকেরা এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

সংগঠন চালাচ্ছে যে তিন শীর্ষ মাওবাদী জঙ্গি নেতা তারা হল থিপ্পারি তিরুপতি ওরফে দেবজি, মিশির বেসরা ওরফে ভাস্কর, মুপল্লা লক্ষ্মণ রাও ওরফে গণপতি। থিপ্পারি তিরুপতি ওরফে দেবজি পলিট ব্যুরো সদস্য। এর পাশাপাশি পাপা রাও ওরফে মঙ্গু বস্তরে সক্রিয় রয়েছে। পাপা রাও দন্ডকারণ‍্য বিশেষ জোনাল কমিটির কমান্ডার। প্রাণে বাঁচাতে জঙ্গলে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনী জোরকদমে তার খোঁজ চালাচ্ছে।

পুলিশ সূত্রের খবর, মাওবাদী জঙ্গি থিপ্পারি তিরুপতি ওরফে দেবজি (৬১) তেলেঙ্গানার বাসিন্দা। দেবজি নম্বলা কেশব রাও ওরফে বাসবরাজু নিকেশ হওয়ার পর থেকে মাওবাদী জঙ্গি সংগঠনের মহাসচিবের দায়িত্বে রয়েছে। সে পলিট ব্যুরোর সদস্যও। বর্তমানে সংগঠনের সর্বোচ্চ নেতা সে-ই। ছত্তীসগঢ়, তেলেঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা, মহারাষ্ট্র-সহ একাধিক রাজ্যের পুলিশ তার খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছে। শুধু ছত্তীসগঢ়েই তার মাথার দাম ১ কোটি টাকা ঘোষণা করা হয়েছে।

মাওবাদী জঙ্গি মুপল্লা লক্ষ্মণ রাও ওরফে গণপতি (৭৪) তেলেঙ্গানার বাসিন্দা। কেশব রাও ওরফে বাসবরাজুর আগে গণপতি মাওবাদী জঙ্গি সংগঠনের মহাসচিব ছিল। বর্তমানে অসুস্থতা ও বার্ধক্যের কারণে প্রায় ৪–৫ বছর আগে এই পদ ছেড়ে দেয়। তার মাথার ওপরও ১ কোটির বেশি টাকার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে সরকার।

দেবজি এবং গণপতি বাদ দিয়ে আরও এক মাওবাদী জঙ্গির খোঁজ চলছে। তার নাম পাপা রাও ওরফে মঙ্গু (৫৬)। পাপা রাও ছত্তীসগঢ়ের সুকমা জেলার বাসিন্দা। পাপা রাও দণ্ডকারণ্য বিশেষ জোনাল কমিটির সদস্য। পাপা রাও পশ্চিম বস্তর ডিভিশন কমিটির ইনচার্জ এবং দক্ষিণ সাব-জোনাল ব্যুরোর সদস্য। মঙ্গু একে-৪৭ রাইফেল বহন করে। ২০ বছর ধরে বস্তরের জঙ্গলে সক্রিয় রয়েছে। ২০১০ সালে সিআরপিএফের কনভয় হামলার অন‍্যতম অভিযুক্ত পাপা রাও। গত বছরে তার স্ত্রী উর্মিলা গ্রেফতার হলেও মঙ্গু পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। মঙ্গু নিকেশ হলে মাওবাদী জঙ্গিদের পশ্চিম বস্তর ডিভিশন কমিটি সম্পূর্ণ ভাবে ভেঙে পড়বে।

পুলিশ সূত্রে এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দক্ষিণ বস্তরের জঙ্গলে পাপা রাও তার সঙ্গীদের নিয়ে আলাদা আলাদা দলে লুকিয়ে রয়েছে। মিশির বেসরা ঝাড়খণ্ডে অবস্থান করছে। কিছুদিন আগে দেবজির অবস্থান ছিল তেলেঙ্গানা–অন্ধ্রপ্রদেশ–ছত্তীসগঢ়ের সীমান্তে। দেবজি বারবার ঘাঁটি বদলাচ্ছে। আগামী ৭১ দিনের মধ্যে যদি এই তিনজন শীর্ষ মাওবাদী জঙ্গি নিকেশ হয় বা আত্মসমর্পণ করে, তাহলে সংগঠনের পরিচালনাকারী সমস্ত শীর্ষ নেতা সম্পূর্ণ ভাবে শেষ হয়ে যাবে।

এ ছাড়াও, বর্তমানে বস্তরের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১০০ জন সশস্ত্র নকশাল অবশিষ্ট আছে। তারা ছোট ছোট দলে ছড়িয়ে লুকিয়ে রয়েছে। মহারাষ্ট্র–মধ্যপ্রদেশ–ছত্তীসগঢ় জোনে মাওবাদী জঙ্গি নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। উত্তর বস্তর ও আবুঝমাঢ় ডিভিশন থেকেও মাওবাদী জঙ্গিদের প্রায় সম্পূর্ণ সাফ করে দেওয়া হয়েছে।

বস্তরের আইজি পি সুন্দররাজ ওই সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, “নকশালদের দুর্গ ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। এখন এর সম্পূর্ণ উল্টো গণনা শুরু হয়েছে। হাতে গোনা কয়েকজন শীর্ষ মাওবাদী বাকি রয়েছে। তারা প্রাণ বাঁচাতে এদিক-ওদিক পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আমরা তাদের আহ্বান জানাই, হিংসা ত্যাগ করে সমাজের মূলধারায় ফিরে আসুন।” তা যদি না হয় নিরাপত্তা বাহিনী তাদের পরিণতিতে পৌঁছে দেবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আইজি।

দেড় বছরে ২৩ জন মাওবাদী জঙ্গি নেতা নিকেশ হয়েছে। শতাধিক মাওবাদী সরকারের কাজে খুশি হয়ে মূলস্রোতে ফিরে আসার জন্য আত্মসমর্পণ করেছেন। মাডবি হিডমা, সংগঠনের মহাসচিব নম্বলা কেশব রাও ওরফে বাসবরাজু, গণেশ উইকে-সহ মোট ১৬ জন মাওবাদী শীর্ষ জঙ্গিনেতা নিকেশের তালিকায় রয়েছে। ভূপতি, রূপেশ ও রামধের মতো নেতারা তাঁদের শতাধিক সঙ্গীকে নিয়ে অস্ত্র-সহ আত্মসমর্পণ করেছেন।

আইজি পি সুন্দররাজ আরও বলেন, “২০২৫ সাল বস্তর পুলিশের জন্য মাওবাদী জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মাওবাদী জঙ্গিদের ঘাঁটিতে ঢুকে শীর্ষ নেতাদের নিকেশ করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে এলএমজি, একে-৪৭, ইনসাস, এসএলআর-এর মতো স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। ৫২টির বেশি নতুন নিরাপত্তা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলেই ওই এলাকাগুলিতে উন্নয়নমূলক কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। দেড় হাজারের বেশি আত্মসমর্পণকারী নকশালদের পুনর্বাসন করা হয়েছে।”

উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ চলতি বছরের ৩১ মার্চের মধ্যে বস্তরকে নকশালমুক্ত করার সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন। এখন এই লক্ষ্যে পৌঁছোতে মাত্র ৭১ দিন বাকি। এই সময়ের মধ্যে দক্ষিণ বস্তর ডিভিশনকে নকশালমুক্ত করাই নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৫ সালে মাওবাদী জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বড়সড় অভিযান চালানো হয়েছে। এর ফলে গত ৪০ বছর ধরে বস্তরে মাওবাদী জঙ্গিদের সক্রিয়তা এখন প্রায় সম্পূর্ণ ভাবে শেষ হয়ে গিয়েছে।


Share