Special Intensive Revision

ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিশ্চয়তায় মতুয়া বলয়, ২০২৬–এর নির্বাচনের আগে বাড়ছে উদ্বেগ

২০২৬ বিধানসভা ভোটের আগে এসআইআর ঘিরে মতুয়া অধ্যুষিত এলাকায় উদ্বেগ। খসড়া তালিকায় বিপুল ‘আনম্যাপড’ ভোটার, বহু মানুষের ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কা, শুরু রাজনৈতিক বিতর্ক ও প্রতিবাদ।

প্রতীকী চিত্র।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৭:৪৭

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এসআইআর ঘিরে রাজ্যের মতুয়া অধ্যুষিত এলাকায় ক্রমশ বাড়ছে উদ্বেগ। খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পরে স্পষ্ট হয়েছে, বিপুল সংখ্যক মতুয়া ভোটারের নাম চূড়ান্ত তালিকায় না–থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা আগামী নির্বাচনে তাঁদের ভোটাধিকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

গত ১৬ ডিসেম্বর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর দেখা গিয়েছে, ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে লিঙ্কেজ দেখাতে না পারা অর্থাৎ ‘আনম্যাপড’ ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি মতুয়া বলয়েই। উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটা বিধানসভায় এই হার ১৪ শতাংশেরও বেশি। হাবড়া, বাগদা, অশোকনগর, বনগাঁ উত্তর, রানাঘাট উত্তর–পূর্ব ও কল্যাণীর মতো এলাকায় আনম্যাপড ভোটারের হার ১১ থেকে ১৩ শতাংশের মধ্যে। নদিয়া জেলার কৃষ্ণগঞ্জ, চাকদহ, শান্তিপুর, হরিণঘাটা প্রভৃতি বিধানসভাতেও এই হার সাত থেকে ১০ শতাংশ।

রাজনৈতিক মহলের মতে, এই পরিসংখ্যানই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সার–এর দ্বিতীয় পর্বের শুনানিতে বহু মতুয়া ভোটারকে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে। বিজেপির অন্দরের হিসেব অনুযায়ী, রাজ্যে প্রায় ১৫ লক্ষ মতুয়ার নাম খসড়া তালিকায় ওঠেনি। যদিও তাঁদের একাংশ প্রয়োজনীয় নথি দেখিয়ে নাম অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন, তবু শেষ পর্যন্ত অন্তত পাঁচ লক্ষ মানুষের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় না–থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

এই প্রেক্ষাপটেই কেন্দ্রীয় জাহাজ প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরের মন্তব্য নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। সোমবার বনগাঁয় দলীয় সভায় তিনি ইঙ্গিত দেন, প্রায় এক লক্ষ মতুয়া ২০২৬–এর নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না। যদিও বিজেপিরই একাংশ নেতার দাবি, বাস্তবে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে এবং এক লক্ষের হিসেব ‘অত্যন্ত কম ধরে’ বলা হয়েছে।

বনগাঁ মহকুমাতেই প্রায় এক লক্ষ ৩৪ হাজার ভোটারকে শুনানিতে ডাকা হতে পারে বলে কমিশন সূত্রে খবর। তাঁদের মধ্যে প্রায় এক লক্ষ ২০ হাজার মতুয়া ভোটার, যাঁদের অনেকের কাছেই কমিশনের নির্ধারিত ১১টি নথির কোনওটি নেই। ফলে শুনানির পরে নাম বাদ যাওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।

এই পরিস্থিতিতে মতুয়া সমাজের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। শান্তনু ঠাকুরের মন্তব্যের প্রতিবাদে বুধবার পথে নামার কর্মসূচি নিয়েছেন মতুয়ারা। অল ইন্ডিয়া মতুয়া মহাসঙ্ঘের সঙ্ঘাধিপতি তথা তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ মমতাবালা ঠাকুরের কড়া মন্তব্য, ‘প্রধানমন্ত্রীর এখন একটা কাজই বাকি রয়েছে, সেটা হলো ১৪ ফেব্রুয়ারির পরে মতুয়াদের ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো।’ তাঁর ডাকেই এ দিন দুপুরে ঠাকুরবাড়িতে প্রতিবাদ কর্মসূচি ডাকা হয়েছে।

যদিও রাজ্য বিজেপির এক প্রবীণ নেতার দাবি, যাঁরা ২০২৬–এ ভোট দিতে পারবেন না, তাঁরা পরবর্তী সময়ে ভোটার তালিকায় নাম তুলতে পারবেন। তবে নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানেই সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। কারণ এবারের সার–এ ২০০২ সালের ভোটার তালিকাকে মানদণ্ড ধরা হয়েছে, আর ভবিষ্যতের সার–এ ২০২৬ সালের তালিকাই ভিত্তি হতে পারে। অর্থাৎ, একবার নাম বাদ গেলে ভবিষ্যতেও সেই ভোটারকে বারবার জটিলতার মুখে পড়তে হতে পারে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে—ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়া আদৌ কতটা স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে? ২০২৬–এর নির্বাচনের আগে মতুয়া সমাজের সামনে যে অনিশ্চয়তার মেঘ জমছে, তা শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।


Share