Terrorism

ইহুদিদের ওপরে ভয়াবহ হামলার পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছিল পুলিশ, দুই ইসলামিক জঙ্গিকে দোষী সাব্যস্ত করল ব্রিটেনের আদালত

২০২৪ সালের মার্চ মাসে ওয়ালিদ এবং ওমর, এই দু’জন কেন্টের ডোভারে যায়। যেখানে তারা বন্দর থেকে কীভাবে অস্ত্র পাচার করা যেতে পারে, তা নিয়ে রেকি করে। ফিরে এসে ওয়ালিদ সাদাউই ম্যানচেস্টারের প্রেস্টউইচ ও হায়ার ব্রটনে যায়। সেখানে ইহুদি নার্সারি, স্কুল, সিনাগগ ও দোকানগুলির ওপর পর্যবেক্ষণ করে রেকি করে বলে জানতে পেরেছেন তদন্তকারীরা।

(বাঁ দিকে) ওয়ালিদ সাদাউই এবং ওমর হোসেন (ডান দিকে)।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৬:৪৬

নিশানায় ছিল ম্যানচেস্টারের ইহুদিরা। তাঁদের ওপর লক্ষ্য করে বন্দুক হামলার পরিকল্পনা করেছিল তারা। পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়ে আগে দুই ইসলামিক জঙ্গিকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। মঙ্গলবার ব্রিটেনের আদালত তাদের দোষী সাব্যস্ত করেছে।

দোষী সাব্যস্ত দুই ইসলামিক জঙ্গির নাম ওয়ালিদ সাদাউই (৩৮) এবং ওমর হোসেন (৫২)। ব্রিটেনের প্রেস্টন ক্রাউন আদালতে শুনানিতে জানানো হয়, অভিযুক্ত দু’জনের ইহুদিদের প্রতি “তীব্র ঘৃণা” ছিল। অভিযুক্তেরা জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্যে অবৈধভাবে আগ্নেয়াস্ত্র পাচারের ব্যবস্থা করেছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, ফারুক নামে এক তৃতীয় ব্যক্তির সঙ্গে মিলে তারা এই হামলার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু ফারুক আদতে ব্রিটেন পুলিশের তাকে খুজে পাওয়া যায়নি।

ইসলামিক জঙ্গি ওয়ালিদ সাদাউই উইগানের আবরামের বাসিন্দা। ওমর হোসেনের কোনও স্থায়ী ঠিকানা ছিল না। ওমরকে ২০২৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৯ মে পর্যন্ত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত। এ ছাড়া, সাদাউইয়ের ছোট ভাই বিলাল সাদাউইকে (৩৬) সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সংক্রান্ত তথ্য গোপন করার অপরাধেও দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে ব্রিটেনের আদালত।

পুলিশ আদালতে জানিয়েছে, ওয়ালিদ সাদাউই যুক্তরাজ্যে চারটি একে-৪৭ রাইফেল, দু’টি হ্যান্ডগান এবং প্রায় ৯০০ রাউন্ড গুলি পাচারের পরিকল্পনা করেছিলেন। ওয়ালিদ সাদাউই ইহুদিদের ওপর এমন একটি হামলার ছক কষেছিলেন, যা “সম্ভাব্যভাবে যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা” হতে পারত বলেও দাবি করেছে ব্রিটেনের পুলিশ। 

কীভাবে ইহুদি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করা এই বন্দুক হামলার ষড়যন্ত্র ভেস্তে গেল? 

ইসলামিক জঙ্গি ওয়ালিদ সাদাউই আদতে টিউনিশিয়ার বাসিন্দা। কয়েক মাস আগেই, সাদাউই অস্ত্র কেনার জন্য ফারুককে অগ্রিম টাকা দেন। সে মনে করে, ফারুক নামে ওই ব্যক্তির মাধ্যমে অস্ত্র আমদানির ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছে। ওয়ালিদ ফারুককে বলে, সে আলাদা ভাবে সুইডেনের মাধ্যমে আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করতে পারবে। এর পাশাপাশি পূর্ব ইউরোপ থেকেও অস্ত্র আনারও চেষ্টা করছে সে। এ ছাড়া, ওয়ালিদ একটি এয়ার গান কিনেছিল। সেটা নিয়ে শুটিং রেঞ্জেও গিয়ে নিজেকে হামলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

২০২৪ সালের ৮ মে বোল্টনের একটি হোটেল পার্কিংয়ে একটি গাড়ির পেছন থেকে কিছু অস্ত্র সংগ্রহ করতে যায়। সেই সময় সাদাউইকে গ্রেফতার করা হয়। ওই অস্ত্রগুলি নিষ্ক্রিয় করা ছিল। পুলিশ জানায়, গাড়িতে দুটি অ্যাসল্ট রাইফেল, একটি সেমি-অটোমেটিক পিস্তল এবং প্রায় ২০০ রাউন্ড গুলি পাওয়া গিয়েছে। তবে ব্রিটেনের সন্ত্রাস দমন শাখার পুলিশ জানায়, জনসাধারণের নিরাপত্তার স্বার্থে অস্ত্রগুলির সরবরাহ ও হস্তান্তর পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণেই ছিল। ওয়ালিদ সাদাউই গ্রেফতার হওয়ার কিছু ক্ষণের মধ্যেই ওমর হোসেন এবং তার ভাই বিলাল সাদাউইকে অন্য একটি জায়গা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

বিচারে আরও উঠে আসে, ইসলামিক জঙ্গি ওয়ালিদ সাদাউই হামলার সময় নিজেকে “শহিদ” করার পরিকল্পনা করেছিল। তার আগে ওয়ালিদ একটি উইল তৈরি করে। তার একটি প্রতিলিপি ভাইয়ের কাছে রেখে যায়। পাশাপাশি পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য তার সম্পত্তির প্রবেশাধিকার এবং দশ হাজার পাউন্ড নগদ টাকাও ভাইয়ের হাতে তুলে দিয়ে যায়।

পুলিশ তদন্তে নেমে জানতে পারে, ওয়ালিদ সাদাউই সমাজমাধ‍্যমে ১০টি জাল অ‍্যাকাউন্ট খোলে। সেই অ‍্যাকাউন্ট ব‍্যবহার করে লাগাতার উগ্র ইসলামপন্থী মতাদর্শ ছড়াচ্ছিলেন। তার পর থেকেই কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। তার বিশ্বাস অর্জনের জন্য ‘ফারুক’ অনলাইনে এবং পরে সরাসরি তার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন।

বিবিসির একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই একটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে সাদাউই গ্রেটার ম্যানচেস্টারের জিউইশ রিপ্রেজেন্টেটিভ কাউন্সিলের ফেসবুক গ্রুপে যোগ দেয়। সেখানে ঢুকে জানতে পারে, ২১ জানুয়ারি ম‍্যানচেস্টারে “ মার্চ অ্যাগেইনস্ট অ্যান্টিসেমিটিজম” নামে ইহুদিদের একটি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে হাজার হাজার ইহুদিরা অংশ নিয়েছিলেন। 

অনুষ্ঠানের সূচি জানার কয়েক দিন পর  সাদাউই ফারুককে বলে, “ম্যানচেস্টারে সবচেয়ে বড় ইহুদি সম্প্রদায় রয়েছে। আল্লাহ চাইলে আমরা তাদের (সবচেয়ে ভয়ংকরভাবে) অপমান করব। যেখানে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায়, সেখানেই আঘাত করব।”

এর করেই ওমর হোসেনকে পরিকল্পনায় যুক্ত করে। ওমর আদতে কুয়েতের নাগরিক। ওমর ইসলামিক জঙ্গি সংগঠন আইএস সমর্থক। ওমর বোল্টনের একটি ফার্নিচারের দোকানে কাজ করত। কাজের সূত্রে সেখানেই থাকত বলে জানতে পেরেছে তদন্তকারীরা।

২০২৪ সালের মার্চ মাসে ওয়ালিদ এবং ওমর, এই দু’জন কেন্টের ডোভারে যায়। যেখানে তারা বন্দর থেকে কীভাবে অস্ত্র পাচার করা যেতে পারে, তা নিয়ে রেকি করে। ফিরে এসে ওয়ালিদ সাদাউই ম্যানচেস্টারের প্রেস্টউইচ ও হায়ার ব্রটনে যায়। সেখানে ইহুদি নার্সারি, স্কুল, সিনাগগ ও দোকানগুলির ওপর পর্যবেক্ষণ করে রেকি করে বলে জানতে পেরেছেন তদন্তকারীরা।


Share