Land Scam

‘অভিষেকের নির্দেশেই সাত কোটি টাকা পার্টি ফান্ডে’, সুমিতের বয়ানে বিস্ফোরক দাবি! শালবনি জমি মামলায় সাংসদকে জিজ্ঞাসাবাদের ইঙ্গিত সিআইডির

সরকারি জমির ভুয়ো নথি তৈরি করে তা বিক্রির অভিযোগে ইতিমধ্যেই সুমিত, প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সুজয় হাজরা-সহ আরও কয়েক জন এই মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন। বর্তমানে সিআইডি হেফাজতে থাকা সুমিতকে শনিবার মেদিনীপুর আদালতে হাজির করানো হয়।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুমিত রায়।
নিজস্ব সংবাদদাতা, দিল্লি
  • শেষ আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:০৬

শালবনি জমি কেলেঙ্কারি মামলায় এ বার তদন্তের নথিতে উঠে এল তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম। একই সঙ্গে তদন্তের সূত্রে তৃণমূল যুব কংগ্রেসের নামও সামনে এসেছে বলে দাবি সিআইডির। এর আগে জমি জালিয়াতির টাকা তৃণমূলের দলীয় অ্যাকাউন্টে জমা পড়েছিল বলে রাজ্য গোয়েন্দা সংস্থা আদালতে জানিয়েছিল। সেই তদন্তের সূত্র ধরেই অভিষেকের আপ্ত সহায়ক সুমিত রায়ের বয়ানে সাংসদের নাম উঠে এসেছে বলে দাবি তদন্তকারীদের। সরকারি জমির ভুয়ো নথি তৈরি করে তা বিক্রির অভিযোগে ইতিমধ্যেই সুমিত, প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সুজয় হাজরা-সহ আরও কয়েক জন এই মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন। বর্তমানে সিআইডি হেফাজতে থাকা সুমিতকে শনিবার মেদিনীপুর আদালতে হাজির করানো হয়।

সূত্রের খবর, এ দিন আদালতে সিআইডির তরফে জমা দেওয়া নথিতে সুমিতের বয়ানের উল্লেখ রয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, জেরায় সুমিত জানিয়েছেন, অভিষেকের নির্দেশে সাংসদের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে পরিচিত ‘টি ঘোষ’ নামে এক ব্যক্তি তাঁকে টাকা দিয়েছিলেন। সেই টাকা তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় তহবিলে জমা করার জন্য দেওয়া হয়েছিল বলে সুমিত জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, নির্দেশ অনুযায়ী তিনি ওই টাকা ব্যাঙ্কে জমা করেন। তবে ওই টাকা জমি জালিয়াতি থেকে পাওয়া নয় বলেই দাবি করেছেন সুমিত। পাশাপাশি, দলের নির্দেশে তাঁকে একাধিক বার শালবনিতে যেতে হয়েছিল বলেও তিনি তদন্তকারীদের জানিয়েছেন।

চলতি মাসের গোড়ায় মেদিনীপুরের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সুজয়ের বিরুদ্ধে আদালতে জমা দেওয়া চার্জশিটে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টের উল্লেখ করে সিআইডি দাবি করে, ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সুমিত ওই অ্যাকাউন্টে দফায় দফায় প্রায় সাত কোটি টাকা জমা করেছিলেন। সেই লেনদেন সংক্রান্ত নথিও চার্জশিটের সঙ্গে আদালতে জমা দেওয়া হয়।

তদন্তে সিআইডি জানতে পেরেছে, কলকাতার হরিশ মুখার্জি রোডের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের শাখায় থাকা ওই অ্যাকাউন্টটি পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল যুব কংগ্রেসের নামে নথিভুক্ত। প্রশ্ন উঠেছে, কেন সুমিত ওই অ্যাকাউন্টে এত বিপুল পরিমাণ টাকা জমা করেছিলেন? শনিবার আদালতে সিআইডি জানিয়েছে, তদন্তকারীদের জিজ্ঞাসাবাদে সুমিত দাবি করেছেন, সাংসদ অভিষেকের নির্দেশেই তিনি ওই টাকা ‘পার্টি ফান্ডে’ জমা করেছিলেন। তাঁর দাবি, টাকা দিয়েছিলেন ‘টি ঘোষ’ নামে এক ব্যক্তি।

সিআইডির আধিকারিকদের দাবি, ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যেই শালবনির জমি সংক্রান্ত ওই জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। মেদিনীপুরের প্রাক্তন বিধায়কের বিরুদ্ধে জমা দেওয়া চার্জশিটে অভিষেকের দুই দেহরক্ষী এবং সুজয়ের গাড়িচালকদের বয়ানও উল্লেখ করেছে তদন্তকারী সংস্থা। সিআইডির দাবি, ওই সাক্ষীরা সুজয়ের সঙ্গে সুমিতের টাকা লেনদেন হতে দেখেছেন। এমনকি, সুজয় কলকাতায় এসে সুমিতের অফিসে টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন বলেও সাক্ষীরা জানিয়েছেন বলে দাবি সিআইডির। তদন্তকারীদের আরও দাবি, সুমিতের নামে কোনও নিজস্ব অফিসের অস্তিত্ব মেলেনি। ক্যামাক স্ট্রিট অথবা কালীঘাটে সাংসদ অভিষেকের কার্যালয়কেই সুমিতের ‘অফিস’ হিসেবে ব্যবহার করা হত বলে তদন্তে উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।

তদন্তকারীদের দাবি, সুমিত তাঁর বয়ানে সাত কোটি টাকার ওই লেনদেনের দায় কার্যত সাংসদের উপরই চাপিয়েছেন। যদিও তাঁর বয়ান কতটা সত্য, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। সিআইডির এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘সুমিত নিজের অ্যাকাউন্টে টাকা জমা না দিয়ে পার্টির অ্যাকাউন্টে যখন জমা করেছেন, সেটা তাঁর নিজের সিদ্ধান্তে হতে পারে না।’’ সেই কারণেই সুমিতের বয়ানে উঠে আসা ‘টি ঘোষ’-কে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁর বক্তব্য সিআইডি রেকর্ড করতে চলেছে।

সূত্রের খবর, ওই সাত কোটি টাকার উৎস সম্পর্কে সুমিত এখনও স্পষ্ট কোনও তথ্য দিতে পারেননি। তাঁর বয়ান তদন্তে সত্য বলে প্রমাণিত হলে, টাকার উৎস সম্পর্কে জানতে এই মামলায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলে সিআইডি সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে। শনিবার সুমিত ছাড়াও মামলায় ধৃত লক্ষ্মী ভুঁইয়া, নিত্য রায় এবং অমিত ঘোষকে মেদিনীপুর আদালতে হাজির করানো হয়। সরকারি আইনজীবী সৈয়দ নাজিম হাবিব তদন্তে সাম্প্রতিক অগ্রগতির কথা তুলে ধরে সুমিত-সহ ধৃতদের আরও জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান। তাঁদের সাত দিনের সিআইডি হেফাজতের আবেদন করা হয়। সুমিতের আইনজীবী প্রথমে জামিনের আবেদন করলেও পরে তা প্রত্যাহার করে নেন।

শেষ পর্যন্ত আদালত সুমিত-সহ ধৃতদের পাঁচ দিনের সিআইডি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, ধৃতদের কাছ থেকে পাঁচটি মোবাইল ফোন-সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার হয়েছে। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর সুমিত-সহ ধৃতদের ফের আদালতে হাজির করানো হবে। সিআইডি সূত্রের ইঙ্গিত, সুমিতের বয়ানে উঠে আসা নতুন তথ্যের জেরে শালবনি জমি কেলেঙ্কারির তদন্তের পরিধি আরও বাড়ল। বিশেষ করে সাত কোটি টাকার লেনদেন, তার উৎস এবং দলীয় তহবিলে সেই টাকা জমা দেওয়ার নেপথ্যে কারা ছিলেন, এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


Share