Special Intensive Revision

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এসআইআরের নথি নিস্পতি করবে বিচারবিভাগ, শনিবার দুপুরে কলকাতা হাই কোর্টে হবে বৈঠক

শনিবার দুপুর ২টোয় কলকাতা হাই কোর্টের শনিবার দুপুরে হাই কোর্টের এই বৈঠক হবে। ওই বৈঠকে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বৈঠক করবেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক। ওই বৈঠকে উপস্থিত থাকতে হবে রাজ্যের মুখ্যসচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি, নির্বাচন কমিশনের এক সিনিয়র আধিকারিকক, অ্যাডভোকেট জেনারেল এবং অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেলকে।

প্রতীকী চিত্র
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:২৪

আগে তাঁরা শুনানি করতেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতেন। রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এর কাজে  এ বার থেকে আর ক্ষমতা বা দায়িত্ব কোনওটাই থাকল না ইআরও-দের। শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, তথ্যগত অসঙ্গতির যে সমস্ত ঘটনা ঘটেছে, সেগুলির নিষ্পত্তি করবেন কলকাতা হাই কোর্ট নিযুক্ত বিচারবিভাগীয় আধিকারিকেরা। তাঁদের নির্দেশই সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ হিসাবে গণ্য করা হবে। নির্বাচন কমিশনের মাইক্রো অবজার্ভার এবং রাজ্যের নিযুক্ত অফিসারেরা এই বিচারকদের সাহায্য করবেন। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, রাজ্য ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। সেই আবহেই বেনজির নির্দেশ দিল তারা। অর্থাৎ এখন থেকে আর ইআরও-রা তা পারবেন না। তবে সুপ্রিম কোর্ট এ-ও স্পষ্ট করে দিয়েছে, সবার আগে রাজ্যে এসআইআরের কাজ শেষ করা জরুরি। এ জন্য পরিকাঠামোগত সাহায্য দেবেন প্রতিটি জেলার জেলাশাসক এবং পুলিশ সুপার। আজ শনিবার কলকাতা হাই কোর্টে রাজ‍্য সরকার এবং কমিশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল।

শুক্রবার এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি এনভি অঞ্জরিয়ার বেঞ্চ শুনানি ছিল। সেই শুনানিতে এসআইআরের কাজে রাজ্যের ভূমিকাতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, রাজ্য ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। তাদের কথায়, ‘’রাজ্যে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতি রাজ্য সরকার তৈরি করেছে, যেখানে বিচারবিভাগীয় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।’’ আর সেই পরিস্থিতিতেই বেনজির নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। তাদের সিদ্ধান্ত, কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে কর্মরত জেলা বিচারক এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা বা অতিরিক্ত জেলা বিচারকদের নিয়োগ করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে শনিবার দুপুর ২টোয় কলকাতা হাই কোর্টের শনিবার দুপুরে হাই কোর্টের এই বৈঠক হবে। ওই বৈঠকে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বৈঠক করবেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও)। ওই বৈঠকে উপস্থিত থাকতে হবে রাজ্যের মুখ্যসচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি, নির্বাচন কমিশনের এক সিনিয়র আধিকারিকক, অ্যাডভোকেট জেনারেল এবং অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেলকে। তাঁরা বৈঠক করে সমাধানের প্রস্তাব দেবেন।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ, তাঁদের প্রত্যেক জেলায় নিয়োগ করে লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি বা তথ্যগত অসঙ্গতি এবং আনম্যাপড ক্যাটেগরি সংক্রান্ত সব দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের মাইক্রো অবজার্ভার এবং রাজ্যের নিযুক্ত অফিসারেরা এই বিচারকদের সাহায্য করবেন। বিচারকদের যে কোনও নির্দেশ সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ হিসেবে গণ্য হবে। রাজ্য ও জেলা প্রশাসনকে তা অবিলম্বে মানতে হবে। এই নির্দেশগুলি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪২-এর ক্ষমতা ব্যবহার করে দেওয়া হয়েছে, যা সুপ্রিম কোর্টকে বিশেষ পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষমতা দেয়।

সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, তাদের সামনে সবচেয়ে জরুরি বিষয় ছিল পশ্চিমবঙ্গে দ্রুত এসআইআরের কাজ শেষ করানো। কিন্তু তথ্যগত অসঙ্গতি এবং আনম্যাপড ক্যাটেগরিতে থাকা ব্যক্তিদের দাবি ও আপত্তির বিষয়ে নিষ্পত্তি আটকে রয়েছে। শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ, এসআইআরের নোটিস পাওয়ার পরে ওই ভোটারের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। কিন্তু তার পরেও নিষ্পত্তি আটকে রয়েছে। সেগুলিরই নিষ্পত্তি করবেন বিচারকেরা। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ, আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যত কাজ শেষ হবে, তা প্রকাশ করা যেতে পারে। তবে সেটি চূড়ান্ত হিসাবে ধরা হবে না। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হলে পরে আর একটি তালিকা প্রকাশ হবে। এই কাজে প্রতিটি জেলার জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারকে পরিকাঠামোগত সাহায্য দিতে হবে। খাবার, থাকার জায়গা, যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দিতে হবে তাঁদের। তাঁরা এই কাজের জন্য ‘ডিমড ডেপুটেশন’-এ থাকবেন।

দু’ধরনের ভোটারকে শুনানিতে নথি যাচাইয়ের জন্য ডেকেছিল কমিশন। ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে যাঁরা নিজেদের কোনও যোগ দেখাতে পারেননি (নো ম্যাপিং তালিকা) তাঁদের শুনানিকেন্দ্রে সশরীরে হাজিরা দিয়ে উপযুক্ত নথি দেখাতে হয়েছে। এ ছাড়া, ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গে যোগ থাকা সত্ত্বেও নামের ত্রুটি, তথ্যগত অসঙ্গতির কারণে অনেককে শুনানিতে ডাকা হয়। শুনানিকেন্দ্রে তাঁদের তথ্য যাচাইয়ের জন্য উপস্থিত ছিলেন ইআরও, এইআরও (সহকারী ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার) এবং বুথ স্তরের আধিকারিকেরা (বিএলও)। এ বার সেই নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বিচারকেরা।

এসআইআরের কাজে আধিকারিকদের নিয়োগ করায় আদালতের স্বাভাবিক কাজে তার সাময়িক প্রভাব পড়বে, মেনে নিয়েছেন প্রধান বিচারপতি কান্ত। সে ক্ষেত্রে অন্য আদালতে কিছু মামলা স্থানান্তরিত করতে পারে হাই কোর্ট। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই ভোটার তালিকা কমিশনকে প্রকাশ করতে বলেছে আদালত। তিনি জানিয়েছেন, ২৮ তারিখের মধ্যে যে সমস্ত নামের সন্দেহ নিষ্পত্তি করা যাবে, তা দিয়েই তালিকা প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের খুব বেশি দিন এই কাজে নিযুক্ত রাখা যাবে না। সময়ের মধ্যে এসআইআরের কাজ যাতে শেষ হয়, রাজ্য সরকারকে তার জন্য কমিশনের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতার নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত।

এসআইআরের কাজকে কেন্দ্র করে রাজ্য এবং কমিশনের প্রধান সংঘাত মূলত গ্রুপ-বি আধিকারিকদের নিয়ে। কমিশনের অভিযোগ, বার বার আবেদন করা হলেও রাজ্য সরকার পর্যাপ্ত গ্রুপ-বি আধিকারিক দেয়নি। দেওয়া হয়েছে গ্রুপ-সি বা আরও নিম্নপদস্থ আধিকারিকদের। করণিক শ্রেণির আধিকারিকদের দিয়ে এসআইআরের মতো কাজ কী ভাবে হবে, প্রশ্ন তোলে সুপ্রিম কোর্ট। কমিশনের আইনজীবী আদালতে জানান, তাঁরা এসআইআরের কাজে সাহায্যের জন্য রাজ্যের কাছে গ্রুপ-বি আধিকারিক চেয়ে চিঠি দিয়েছিলেন। কিন্তু জবাবে সরকার জানিয়েছে, কমিশনের আবেদন ‘বিবেচনাধীন’। এর পরেই রাজ্যের ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করে শীর্ষ আদালত। প্রধান বিচারপতি জানান, তিনি ভেবেছিলেন এসআইআরের কাজে রাজ্য সহযোগিতা করবে। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। বিচারপতি কান্তের বক্তব্য, ‘‘আমরা দুটো পরিস্থিতি বুঝতে পারছি। হয় আপনাদের পর্যাপ্ত সংখ্যক গ্রুপ বি কর্মী নেই, যা একটা আইনি বাধ্যবাধকতা। নয়তো আপনারা তাঁদের ছাড়তে পারছেন না। সে ক্ষেত্রে ইআরও বা এইআরও-র কাজের জন্য কমিশন কর্মী আনতে পারবে।’’

সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, নিয়ম অনুযায়ী ইআরও হিসাবে রাজ্যকে গ্রুপ-এ পর্যায়ের অফিসার (এসডিও বা এসডিএম র‍্যাঙ্ক) দিতে হয়। কিন্তু রাজ্য কোন র‍্যাঙ্কের অফিসার দিয়েছে, তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে গুরুতর বিরোধ রয়েছে। এই র‍্যাঙ্ক যাচাই করা এখন আদালতের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। বিচারপতি বাগচী জানান, তথ্যগত অসঙ্গতি বিচার করতে কমিশন কর্মী নিয়ে এলে তাঁদের বাংলা বানান বুঝতে সমস্যা হতে পারে। রাজ্য জানিয়ে দেয়, বিচারবিভাগীয় আধিকারিক আনা হলে তাতে রাজ্যের কোনও আপত্তি নেই। সুপ্রিম কোর্ট জানায়, কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে কর্মরত জেলা বিচারক এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা বা অতিরিক্ত জেলা বিচারকদের নিয়োগ করতে হবে।

নির্বাচন কমিশন বা অন্য অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ কয়েকটি ক্ষেত্রে পদক্ষেপ করেনি। তাই ওই বিষয়ে রাজ্য পুলিশের ডিজিকে হলফনামা দিতে হবে বলে জানিয়েছে সুপ্রিম। জানাতে হবে, কত অভিযোগ পেয়েছেন এবং কী ব্যবস্থা নিয়েছেন। আগামী ১০ মার্চ পরবর্তী শুনানি। সে দিন হলফনামা দিয়ে জানাতে হবে ডিজি-কে। শীর্ষ আদালত আরও জানায়, রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় না-রাখতে পারলে রাজ্য পুলিশের ডিজির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হতে পারে। ডিজির আইনজীবী সওয়াল করে জানান, কমিশন অসত্য বলছে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত কমিশনকে প্রশ্ন করেন, পুলিশ-প্রশাসনের বিরুদ্ধে কেন পদক্ষেপ করা যাচ্ছে না? কমিশন জানায়, আদালতে মামলাটি বিচারাধীন থাকায় এ নিয়ে তারা দ্বিধাগ্রস্ত। এসআইআরের কাজ করানোর জন্য রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী আনার পরামর্শও দেয় কমিশন। সুপ্রিম কোর্ট জানায়, রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং সংশ্লিষ্ট জেলাশাসক আদালতের নির্দেশ কার্যকর করার জন্য বিশেষ দায়িত্বে থাকবেন।


Share