Indranil Sen

ইন্দ্রনীল এবং স্ত্রীকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা, সেখানেও মনোমালিন্য দু’জনের, শারীরিক কারণে হাজিরা এড়ালেন তৃণমূল নেতার মেয়ে

পুলিশ সূত্রের খবর, সেখানেও দু’জনের মধ্যে মতের অমিল হয়েছে। অন‍্য দিকে, মঙ্গলবার হাজিরা এড়িয়েছেন ইন্দ্রনীলের মেয়ে আভেরী সেন। আগামীকাল, বুধবার আবার তাঁকে লালবাজারে তলব করা হয়েছে।

গ্রেফতার ইন্দ্রনীল সেন।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ ০৮:০৯

দুর্গাপুজোর টিকিট বিক্রির টাকা জালিয়াতির অভিযোগে ইন্দ্রনীল সেন এবং স্ত্রীকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করল কলকাতা পুলিশ। পুলিশ সূত্রের খবর, সেখানেও দু’জনের মধ্যে মতের অমিল হয়েছে। অন‍্য দিকে, মঙ্গলবার হাজিরা এড়িয়েছেন ইন্দ্রনীলের মেয়ে আভেরী সেন। আগামীকাল, বুধবার আবার তাঁকে লালবাজারে তলব করা হয়েছে।

টিকিট দুর্নীতির টাকা মেয়ের অ‍্যাকাউন্টে ঢুকেছে। তাই প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়কের মেয়ে আভেরী সেনকে জেরা করতে চায় লালবাজার। পুলিশ সূত্রের খবর, তাঁকে দু’বার জেরা করার জন‍্য নোটিশ পাঠানো হলেও তিনি হাজিরা এড়িয়ে গিয়েছেন। শারীরিক কারণ দেখিয়ে তিনি আসেননি বলেই জানা গিয়েছে। তাই বুধবার দুপুর ২টোর সময় আবার তাঁকে লালবাজারে হাজিরা দিতে বলা হয়েছে। তিনি যদি আবার হাজিরা এড়ান তা হলে আবার নোটিস পাঠানো হতে পারে। এমনকী, তাঁকে গ্রেফতার করার চিন্তাভাবনা করছে পুলিশ।

বউবাজার থানায় মামলায় ধরে ইডি ইসিআইআর করেছিল। সেই মামলায় ইন্দ্রনীল সেন রক্ষাকবচ পায়নি। তাই তাঁকে গ্রেফতার করেছে কলকাতা পুলিশ। কিন্তু সেই মামলায় রক্ষাকবচ পেয়েছেন তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেন। তিনি ইতিমধ্যেই দু’বার তদন্তকারীদের মুখোমুখি হয়েছেন।

লালবাজার সূত্রের খবর, তাঁকে পরপর দু’দিন জেরা করা হয়েছে। ইন্দ্রনীল এবং মধুছন্দাকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করা হয়েছে। সেই সময়ও তদন্তকারীরা যে প্রশ্ন তাঁদেরকে করেছেন তাতেও দু’জনের মধ্যে মতপার্থক্য হয়েছে।

মধুছন্দা দাবি করছেন, তিনি নামমাত্র মাস আর্ট সংস্থায় ডিরেক্টর ছিলেন। ইন্দ্রনীল যা বলতেন তাই তিনি করে দিতেন। এমনকী, এ সব বিষয় নিয়ে দু’জনের মধ্যে পারিবারিক অশান্তিও হত বলে মধুছন্দা জেরার সময় দাবি করেছেন।

উল্লেখ্য, এই টিকিট বিক্রির মামলায় দুর্নীতির অভিযোগে ইতিমধ্যেই ইন্দ্রনীল সেনকে গ্রেফতার করেছে কলকাতা পুলিশ। বর্তমানে তিনি পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন। একই মামলার এফআইআরে নাম রয়েছে তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেনেরও। যদিও কলকাতা হাই কোর্ট থেকে আগাম জামিন পেয়েছেন তিনি। অন্য দিকে, ইন্দ্রনীল সেনের আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করে দিয়েছিল আদালত। এরপরই তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

দুর্গাপুজোর পাস বিক্রি ও প্রিভিউ শো আয়োজনের নামে কোটি কোটি টাকা আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে এ বার কলকাতা পুলিশের নজরে প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের কন্যাও। অভিযোগ, ইন্দ্রনীল ও তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেনের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের পাশাপাশি তাঁদের কন্যার অ্যাকাউন্টেও টাকার লেনদেন হয়েছে। সেই লেনদেনের উৎস ও উদ্দেশ্য খতিয়ে দেখতে সোমবার তাঁকে লালবাজারে তলব করা হয়েছিল। তদন্তকারীরা মনে করছেন, আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত একাধিক প্রশ্নের উত্তর পেতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।

পুলিশের অভিযোগ, ‘মাস আর্ট’ নামে একটি সংস্থার মাধ্যমে দুর্গাপুজোর পাস বিক্রি এবং প্রিভিউ শো আয়োজন করে টাকা তুলতেন ইন্দ্রনীলেরা। ওই সংস্থার পদাধিকারী ছিলেন তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা। ২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপুজো ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়ার পরই সংস্থাটি তৈরি হয়েছিল। অভিযোগ, প্রচারের ক্ষেত্রে বেআইনিভাবে ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার করে পুজোর পাস বিক্রি করা হত। এমনও দাবি করা হত যে, এই উদ্যোগে সরাসরি ইউনেস্কোর অনুমোদন রয়েছে। যদিও বাস্তবে এমন কোনও বাণিজ্যিক চুক্তি ইউনেস্কো করেনি বলেই অভিযোগ।

এই ঘটনায় বৌবাজার থানায় জয়দীপ মুখোপাধ্যায় নামে এক ব্যক্তি অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতেই ইন্দ্রনীল ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হয়। কলকাতা পুলিশের পাশাপাশি আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। ইতিমধ্যেই একাধিকবার প্রাক্তন মন্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। গত ২৮ অক্টোবর সিজিও কমপ্লেক্সে ইডি দফতরে হাজিরা দিয়ে বেরোনোর পরই তাঁকে গ্রেফতার করে কলকাতা পুলিশ। তার আগে কসবার বাড়ি, সিঙ্গুরের বাগানবাড়ি-সহ একাধিক ঠিকানায় তল্লাশি চালানো হয়েছিল।

অন্য দিকে, কলকাতা হাই কোর্টে আগাম জামিনের আবেদন খারিজ হওয়ার পর সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ইন্দ্রনীল। তবে শীর্ষ আদালতে শুনানির আগেই তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে সুপ্রিম কোর্ট থেকে আবেদন প্রত্যাহার করে নেন চন্দননগরের প্রাক্তন বিধায়ক। একই সঙ্গে তদন্তে সহযোগিতা করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

 

 

এই মামলার তদন্তে গোয়েন্দারা বিভাগের ডেপুটি কমিশনার (স্পেশাল)-এর নেতৃত্বে একটি পাঁচ সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়েছিল। সেই দলে গোয়েন্দারা বিভাগের প্রতারণা দমন শাখা থেকে চার জন আধিকারিককে যোগ করা হয়েছে। ফলে এই সিটের সংখ্যা বেড়েছে হয়েছে ন’জন।

এই মামলায় ইন্দ্রনীলকে ১৩ দিনের জন‍্য হেফাজতে পেয়েছে কলকাতা পুলিশ। তাঁকে জেরা করছে তদন্তকারীরা। তদন্তকারীদের সব উত্তর যে সঠিক দিচ্ছেন ইন্দ্রনীল তা মানতে নারাজ এক পুলিশকর্তা।

এখনও পর্যন্ত ইউনেস্কো কোনও উত্তর দেয়নি। তাই আবার দিল্লির অফিসে আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এক কর্তা।

উল্লেখ্য, ইডির দাবি ছিল দুর্নীতির টাকা সাদা করতে একাধিক সংস্থার জাল অ‍্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। পর্যটন দফতরের টেন্ডার-সহ ১০০ কোটি টাকার আর্থিক তছরুপের অভিযোগ করেছিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। তাতেই সিলমোহর দিয়েছে কলকাতা পুলিশ। ২৬টি এমন অ‍্যাকাউন্টের কথা আগেই জানিয়েছিল কলকাতা পুলিশ। সেই অ‍্যাকাউন্টগুলির মাধ‍্যমে টাকা হাওয়ালার মাধ্যমে পাচার করা হয়েছে বলেও কলকাতা পুলিশ জানতে পেরেছে। 

এই মামলার যে এফআইআর দায়ের করা হয়েছিল তা পুনর্গঠন করা হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গ জনশৃঙ্খলা প্রতিরোধ আইনের একাধিক ধারায় বসানো হতে পারে। তার জন‍্য, বুধবার বা বৃহস্পতিবার আদালতের দারস্থ হতে চলেছে বলে জানা গিয়েছে। জনসাধারণের ভরসা যোগ‍্য ইউনেস্কো এবং পুজোর পাসের নাম করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে জালিয়াতির করা হয়েছে। এতে জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়েছে বলে মনে করছে কলকাতা পুলিশ।


Share