Stone Syndicate

ইস‍্যু হওয়া ডিসিআরের মধ্যে ৯৯ শতাংশই জাল! গত পাঁচ বছরে প্রায় ৭৫ হাজার করা ডিসিআর হয়েছিল, পাথর মাফিয়া টুলুর বিরুদ্ধে চার্জশিট দিল পুলিশ

সরকারের ঘরে মাত্র ০.৪ শতাংশ রাজস্ব যেত। বাকি টাকা যেত তৃণমূল ঘনিষ্ঠ পাথর টুলু মণ্ডলের কাছে। ২০২১- ২২- এ ১২৪ কোটি, ২০২২- ২৩- এ ২৭০ কোটি, ২০২৩- ২৪- এ ১৪৬ কোটি, ২০২৪- ২৫- এ ১৩৮ কোটি, ২০২৫- ২৬- এ ১৭৭কোটি টাকা রাজস্ত ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ দাবি করেছে।

টুলু মন্ডল।
নিজস্ব সংবাদদাতা, বীরভূম
  • শেষ আপডেট: ০২ নভেম্বর ২০২৬ ১০:৪১

ডিসিআর জালিয়াতি মামলায় টুলু মণ্ডলের বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করল বীরভূম জেলা পুলিশ। পুলিশ সূত্রের খবর, ২০২৫ সাল পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে যা ডিসিআর ডিসিআর ইস‍্যু করা হয়েছিল তার ৯৯.৬ শতাংশই জাল। ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট ৭৪ হাজার ৮৯৯টি ডিসিআর ইস‍্যু করেছিল বলে পুলিশ চার্জশিটে উল্লেখ করেছে।

 

গত কয়েক মাস ধরে বীরভূমের পাথর মাফিয়া টুলু মন্ডলের সম্পত্তিতে পুলিশ অভিযান চালিয়েছে। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বিপুল টাকা ও নথি। টুলু মন্ডলকে গ্রেফতার না করতে পারলেও তাঁর একাধিক সঙ্গী বর্তমানে জেল খাটছেন। সোমবার সেই মামলাতেই নিম্ন আদালতে চার্জশিট জমা করেছে পুলিশ। 

 

পুলিশ সূত্রের খবর, চার্জশিটে রয়েছে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তদন্তকারীরা করেছেন। অভিযোগ, ডিসিআর গেটগুলি কার্যত বেআইনি ভাবে পরিচালনা করত টুলু মণ্ডল। তদন্তকারীদের বক্তব্য, ডিসিআর গেটে ডিউটি দেওয়ার কথা সরকারি কর্মীদের। কিন্তু সেখানে কোনও সরকারি কর্মী থাকতেন না। অথচ ডিউটি রোস্টারে সরকারি কর্মীদের নাম থাকত। সেই সরকারি কর্মীদের মোটা টাকা ঘুষ দেওয়া হত। টাকা এই কারণেই দেওয়া হত যাতে সেখানে যাতে কেউ না থাকে। পাথর পাচারে তাঁরা যাতে ব‍্যঘাত না ঘটাতে পারেন। 

 

পুলিশ চার্জশিটে দাবি করেছে, সরকারি কর্মীদের বদলে ডিসিআর গেটে টুলুর শাগরেদরা মোতায়েন থাকতেন। তল্লাশির সময় যে ক‍্যাশ রেজিস্টার বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল তা থেকেই এই পুলিশের হাতে এসেছে বলে তদন্তকারীরা দাবি করেছে। এ ছাড়াও, ডিসিআর থেকে থেকে আদায় হওয়া টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বিষয়টিও টুলু নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল বলে পুলিশ চার্জশিটে দাবি করেছে।

 

পুলিশের জমা দেওয়া চার্জশিট অনুযায়ী, গত ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিপুল সংখ্যক ডিসিআর ইস্যু করা হয়। এই সময়ের মধ্যে মোট ৭৪ হাজার ৮৯৯টি ডিসিআর ইস্যু করা হয় বলে পুলিশ দাবি করেছে। তার মধ্যে ৬২ হাজার ৮৮৮টি ডিসিআরই ছিল জাল ছিল বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে। ইস্যু করা ডিসিআরগুলির মধ্যে প্রায় ৯৯.৬ শতাংশই জাল বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। 

 

অন‍্য দিকে, তৃণমূল জমানার পাথর মাফিয়া টুলু মন্ডলের পার্কিং লটে তল্লাশিতে জাল ডিসিআর ছাপার মেশিন উদ্ধার করা হয়েছে বলেও চার্জশিটে বীরভূম জেলা পুলিশ দাবি করেছে। সেখান থেকে ৪৯৮টি ডিসিআরের সন্ধান পাওয়া যায় বলে আদালতে পুলিশ জানিয়েছে। তার মধ্যে ৪৮৮টি ডিসিআরই জাল বলে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। বাকি ১০টি ডিসিআর আসল কি না তার ফরেন্সিক রিপোর্ট আসা এখনও বাকি রয়েছে বলে পুলিশ দাবি করেছে।

 

বীরভূমের পাথর সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তদন্তে নেমে মাফিয়া টুলুর আত্মী মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে প্রথম বিপুল পরিমাণ টাকা উদ্ধার হয়।সেখান থেকে কেজি কেজি সোনাও বাজেয়াপ্ত করে পুলিশ। দু’দিন ধরে টাকা গণনার কাজ চলে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সেই ভিডিয়ো নিজের সমাজমাধ‍্যমে পোস্ট করেছিলেন। তখনই সামনে আসে এই জাল ডিসিআরের এরপরই জোরকদমে তদন্তে নামে পুলিশ। তখনই সামনে আসে জাল ডিসিআর ব‍্যবহার করেই পাথর পাচার করা হত। 

 

চার্জশিটে আরও দাবি করা হয়েছে, বিশেষ তদন্তকারী দলের তদন্তে নজরে এসেছে, গত ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ৮৫৫ কোটি টাকা সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। সরকারের ঘরে মাত্র ০.৪ শতাংশ রাজস্ব যেত। বাকি টাকা যেত তৃণমূল ঘনিষ্ঠ পাথর টুলু মণ্ডলের কাছে। ২০২১- ২২- এ ১২৪ কোটি, ২০২২- ২৩- এ ২৭০ কোটি, ২০২৩- ২৪- এ ১৪৬ কোটি, ২০২৪- ২৫- এ ১৩৮ কোটি, ২০২৫- ২৬- এ ১৭৭কোটি টাকা রাজস্ত ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ দাবি করেছে। 

 

অন্য দিকে, ডিসিআর জালিয়াতি মামলায় আরও এক সরকারি কর্মীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। ধৃতের নাম রবিউল ইসলাম। তিনি দুর্নীতি যখন মধ‍্য গগণে তিনি মহম্মদবাজারের ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরের ডেপুটি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি অবসরের জীবন কাটাচ্ছেন। রবিবার রাতে বীরভূমের বাড়ি থেকে রবিউলকে পুলিশ গ্রেফতার করে। তাঁকে সোমবার আদালতে হাজির করানো হয়েছে। তাঁকে পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে।

 

বীরভূমের পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডল জাল ডিসিআর তৈরি করে সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার যে কারবার শুরু করেছিল, সেখানে রবিউলের নাম পাওয়া গিয়েছে। টুলু মণ্ডলের জাল ডিসিআর কারবারের তদন্তে নেমে পুলিশ রবিউল ইসলামের নাম পাওয়া গিয়েছে বলে পুলিশ সূত্রের খবর। পুলিশ সূত্রের খবর, এই রবিউল ইসলামই জাল ডিসিআর তৈরি করে অবৈধ ভাবে পাথর পাচারে টুলু মন্ডলকে সরাসরি সাহায্য করেছেন। তবে কর্মরত অবস্থায় থাকাকালীন অপরাধে সাহায্য করায় কত টাকা ঘুষবাবদ তিনি নিয়েছিলেন তা জানতে রবিউলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে বীরভূম জেলা পুলিশের এক কর্তা জানিয়েছেন। 


Share