Japan Bangladesh Labour Row

লাখখানেক বাংলাদেশি শ্রমিক আসার গুজবে তোলপাড় জাপান! ইউরোপের উদাহরণ টেনে আতঙ্ক, বিবৃতি দিতে বাধ্য তাকাইচি সরকার

বাংলাদেশ থেকে বছরে এক লাখ শ্রমিক নিয়োগের খবরকে সম্পূর্ণ ভুয়ো বলে জানাল জাপান সরকার, তবে তা ঘিরে বিতর্ক অব্যাহত।

প্রতীকী চিত্র।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ ০৮:১৬

বাংলাদেশ থেকে এক লাখ শ্রমিককে জাপানে নিয়ে আসা হবে! সমাজমাধ্যমে এমন খবর ছড়াতেই তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে দ্বীপরাষ্ট্রে। জনসংখ্যা হ্রাস এবং শ্রমিকের ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশিদের জন্য জাপানের দরজা খুলে দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করা হয় বিভিন্ন পোস্টে। এই খবরকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন জাপানের একাংশের নাগরিক। ইউরোপের অভিবাসন পরিস্থিতির উদাহরণ টেনে উদ্বেগ প্রকাশ করেন অনেকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত বিবৃতি জারি করে গুজব উড়িয়ে দিতে বাধ্য হয় জাপান সরকার। তবে এই ভুয়ো খবরের পিছনে রাশিয়ার কোনও ভূমিকা রয়েছে কি না, তা নিয়েও শুরু হয়েছে জল্পনা।

ঘটনার সূত্রপাত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে কেন্দ্র করে। চলতি বছরের ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপান সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন তিনি। এরপরই দুই দেশের মধ্যে পাঁচ বছরের শ্রমিক সমঝোতা হয়েছে এবং বছরে এক লাখ বাংলাদেশিকে নিয়োগ করবে টোকিয়ো, এমন দাবি ছড়িয়ে পড়ে সমাজমাধ্যমে। যদিও এই দাবির কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই।

এই খবর ঘিরে জাপানি নাগরিকদের একাংশের বক্তব্য, ইউরোপের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত সরকারের। তাঁদের আশঙ্কা, বিপুল সংখ্যায় বিদেশি শ্রমিক এলে দেশের সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কাঠামোয় পরিবর্তন আসতে পারে। কেউ কেউ ফ্রান্স, স্পেন ও ইটালির উদাহরণ টেনে জাপানের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের দাবি, অভিবাসনকে কেন্দ্র করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি চান না তাঁরা।

আসলে তারেক-তাকাইচি বৈঠকে বিনিয়োগ, যোগাযোগ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং শিল্পক্ষেত্রে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে প্রায় এক লক্ষ কোটি ইয়েন বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। জাপানি বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রায় দু’লক্ষ কর্মসংস্থান তৈরির আশা রয়েছে। পাশাপাশি ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ কাঠামোয় বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে শিল্পের প্রসারের পরিকল্পনা রয়েছে। মোট ছ’টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি এবং দু’টি বড় ঋণের প্রতিশ্রুতিও এসেছে বৈঠক থেকে।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের মে মাসে জাপানের একটি মানবসম্পদ সংক্রান্ত সেমিনারে শ্রমিকের ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের প্রস্তাব উঠেছিল। সেই সময় কর্মসংস্থান সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারকেও সই করে দুই দেশ। চলতি বছরের ১৭ অক্টোবর কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন সংক্রান্ত পৃথক চুক্তি হয়। এর আওতায় ২০২৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে নির্দিষ্ট কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। চুক্তিটি পাঁচ বছরের হলেও বার্ষিক এক লাখ কর্মী নিয়োগের কোনও বাধ্যতামূলক শর্ত নেই। প্রয়োজনে চুক্তির মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়ানো যেতে পারে।

বিষয়টি স্পষ্ট করে জাপানের বিদেশ মন্ত্রকের প্রেস সচিব কিতামুরা তোশিহিরো জানিয়েছেন, তাকাইচি ও তারেক রহমানের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এক লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগের কোনও আলোচনা হয়নি। সমাজমাধ্যমে ছড়ানো এই খবর সম্পূর্ণ মিথ্যা। বর্তমানে জাপানে প্রায় ৪৫ হাজার বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। মূলত ছোট ব্যবসা, শিল্পোৎপাদন ও পরিষেবা ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত তাঁরা।

এদিকে, এই ভুয়ো প্রচারের পিছনে রাশিয়ার ভূমিকা রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, পশ্চিম ইউরোপে অভিবাসন নিয়ে বিভাজন ও আতঙ্ক ছড়ানোর মতো প্রচারের অভিযোগ অতীতেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে উঠেছে। ইউরোপের দেশগুলির সঙ্গে মস্কোর সম্পর্কের টানাপড়েনের পাশাপাশি কুরিল দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে জাপান ও রাশিয়ার দীর্ঘদিনের বিরোধও রয়েছে। সেই আবহে টোকিয়োর অভ্যন্তরে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে। যদিও এই ঘটনায় রাশিয়ার প্রত্যক্ষ যোগের কোনও চূড়ান্ত প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি।


Share