Bangladesh Airforce

পাকিস্তানের ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যোগসাজশ বাংলাদেশের বায়ুসেনার একাংশের, সপ্তাহখানেক ধরে অভিযান চালিয়ে আটক কয়েক জন, তোলপাড় আন্তর্জাতিক মহল

অভিযানে দু’জন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরও দশজনকে আটক করা হয়েছে। অভিযানের খবর পেয়ে নয় থেকে দশজন কর্মী পালিয়ে গিয়েছে বলে তথ্য মিলেছে।

বাংলাদেশের বায়ুসেনা ঘাঁটি।
ইন্দ্রজিৎ মল্লিক, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ০১:১৭

তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের (টিপিপি) সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগে বেশ কয়েক জন বায়ুসেনা কর্মীকে গ্রেফতার করার পর সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী।

সপ্তাহখানেক আগে শুরু হওয়া এই কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স অভিযানটি ঢাকা, চট্টগ্রাম ও যশোরের বিমান ঘাঁটিগুলিতে পরিচালিত হয়। সন্দেহ করা হচ্ছে যে, অভিযুক্ত পলাতক বায়ুসেনা কর্মীদের কেউ কেউ পাকিস্তান, পর্তুগাল, তুরস্ক এবং নিউজিল্যান্ডে পালিয়ে গিয়েছে।

সংবাদ পোর্টাল ‘নর্থইস্ট নিউজ’ অনুযায়ী, বাংলাদেশ বায়ুসেনার (বিএএফ) গোয়েন্দা শাখা গত ২০ এপ্রিলের ভোররাত থেকে নিজেদের কর্মীদের একটি বিশাল অংশের ওপর নজরদারি জোরদার করেছে। এর নেপথ্যে রয়েছে বিমান বাহিনীর কতিপয় কর্মকর্তা ও বায়ুসেনা সঙ্গে পাকিস্তানি ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনগুলি গভীর যোগসাজশের তথাকথিত সন্ধান পাওয়ার বিষয়টি।

দীর্ঘ সময় ধরে নজরদারি চালানোর থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে, গত ২০ এপ্রিলের ভোররাতে ঢাকার অন্তত দুটি বায়ুসেনার দফতরে কর্মরত বেশ কয়েক জন কর্মীর ওপর আকস্মিক অভিযান চালায় বাহিনীর গোয়েন্দা শাখা।

জানা গিয়েছে, এই অভিযানে দু’জন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরও দশ জনকে আটক করা হয়েছে। অভিযানের খবর পেয়ে নয় থেকে দশজন কর্মী পালিয়ে গিয়েছে বলে তথ্য মিলেছে। গ্রেফতার হওয়া ওই দুই কর্মকর্তার পরিচয় অত্যন্ত কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে রাখা হয়েছে।

ঢাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ বায়ুসেনা (BAF) নিজস্ব সদর দফতরে এই অভিযান এবং এর ফলে সংঘটিত গ্রেফতার, আটক ও পলায়নের ঘটনাগুলি স্বীকার করা থেকেও বিরত থেকেছে। অথচ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, অধস্তন কর্মকর্তা ও অন্যান্য পদমর্যাদার কর্মীদের একাংশের মধ্যে ‘তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান’-এর অনুপ্রবেশের ব্যাপকতা উদ্ঘাটনে জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান যখন মালয়েশিয়ায় সরকারি সফরে ছিলেন ঠিক সেই সময়েই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল।

পলাতক বাংলাদেশের বায়ুসেনার (BAF) সদস্যদের মধ্যে চারজন ‘এয়ারম্যান’ রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ২১ এপ্রিল ভোররাতে অভিযান শুরু হওয়ার অনেক আগেই ওই অভিযুক্তেরা পাকিস্তান, পর্তুগাল, তুরস্ক এবং নিউজিল্যান্ডে পালিয়ে গিয়েছেন। অনিশ্চিত সূত্রে জানা গিয়েছে, সেনাবাহিনীর দুই কর্মকর্তাও বর্তমানে আটক রয়েছে। তবে তাঁদের পরিচয় অত্যন্ত কঠোর গোপনীয়তার আড়ালে রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশের তিনটি প্রধান বিমান ঘাঁটি—যেখানে যুদ্ধবিমান মোতায়েন রয়েছে—সেগুলি হল কুর্মিটোলা ও তেজগাঁও (ঢাকায়) এবং চট্টগ্রামের জহুরুল হক। বাংলাদেশ থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদনগুলিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে অত্যন্ত গোপনে এবং বায়ুসেনার অন্তত তিনটি বিমানঘাঁটি জুড়ে পরিচালিত এই অভিযানের পরপরই সদর দফতর থেকে একটি নির্দেশ জারি করা হয়। ওই নির্দেশে সংশ্লিষ্ট কর্মরত সকল অসামরিক কর্মকর্তার ছুটির আবেদন গ্রহণ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বায়ুসেনার গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তাদের ধারণা এই "ব্যাপকভিত্তিক তদন্তের" লক্ষ্যবস্তু হওয়া কর্মকর্তা এবং অন্যান্য পদমর্যাদার সদস্যদের সঙ্গে 'তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান' (TTP)-এর যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছে।

কিছুদিন আগেও বাংলাদেশ বায়ুসেনার পক্ষ থেকে জারি করা নিরাপত্তা সতর্কবার্তাগুলিতে বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে TTP-এর কথিত যোগসূত্রের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল।

বায়ুসেনার সূত্রগুলি জানিয়েছে, বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যখন জোরদার জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন, তখন আরও বেশ কিছু গ্রেফতারের সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে ঢাকার দুটি বায়ুসেনার ঘাঁটিতে, যার মধ্যে একটি বিমানঘাঁটিও অন্তর্ভুক্ত—সেখানে নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।

জানা গিয়েছে, বায়ুসেনার জেসিওদের (JCOs) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাঁরা যেন সমস্ত এলএসি (LAC বা লিডিং এয়ারক্রাফটম্যান) এবং তাঁদের অধস্তন পদমর্যাদার সদস্যদের মোবাইল ফোনগুলি বাজেয়াপ্ত করেন। গত ২১ এপ্রিল বিকেল ৩টের মধ্যে সেগুলি 'ডিফেন্স ব্রাঞ্চ হেডকোয়ার্টার্স'-এ জমা করা হয়। এ ছাড়া, জেসিওদের বায়ুসেনার বিমানঘাঁটিগুলি 'নমিনাল রোল কল' (উপস্থিতি যাচাই) করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

যদিও চার থেকে পাঁচজন এয়ারম্যানের সঙ্গে TTP-এর যোগসূত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং তারা বাংলাদেশ বায়ুসেনার কক্সবাজার ইউনিটে কর্মরত ছিলেন। তবে অন‍্য দু’জন এয়ারম্যান যথাক্রমে ২৫তম ও ১৮তম স্কোয়াড্রনের সদস্য। এই স্কোয়াড্রন দুটির অবস্থান যথাক্রমে চট্টগ্রাম ও যশোরে।

বাংলাদেশের বায়ুসেনার ১৮তম স্কোয়াড্রনের সঙ্গে যুক্ত ওই এয়ারম্যানরা 'MTR' (বা মতিউর রহমান) ইউনিটের—যা মূলত একটি রাডার স্টেশন—অংশ ছিল। এই স্টেশনটি আবহাওয়া এবং রাডার-ভিত্তিক ট্র্যাকিং বা নজরদারি সংক্রান্ত অন্যান্য তথ্য সরবরাহ করে থাকে।

পলাতক বায়ুসেনাদের দুজনের কর্মস্থল ছিল ‘AKR’-এ—যা ঢাকার কুর্মিটোলায় অবস্থিত বাংলাদেশ বায়ুসেনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি এবং অন্য জন বায়ুসেনার ATI-এর (বা এয়ারমেন ট্রেনিং ইনস্টিটিউট) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই ATI চট্টগ্রামের জহুরুল হক ঘাঁটিতে অবস্থিত।


Share