Suicide Case

ধনিয়াখালিতে একই পরিবারের তিন জনের মৃত্যু, দেওয়ালে লেখা ‘রবীন্দ্রনাথ’-এর নাম! ১২ ঘণ্টায় রহস্যের কিনারা পুলিশের

তদন্তে উঠে এসেছে সোনা চুরির অভিযোগ এবং সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিবারের উপর চাপ তৈরির বিষয়টি। ঘটনায় রবীন্দ্রনাথ মুর্মু-সহ চার জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

দেওয়ালে লেখা ‘রবীন্দ্রনাথ’-এর নাম
নিজস্ব সংবাদদাতা, ধনিয়াখালি
  • শেষ আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২৬ ১২:১৩

ধনিয়াখালিতে চার মাস আগে বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন। শুক্রবার সেখান থেকেই একই পরিবারের তিন সদস্যের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হল। ঘরের সবুজ দেওয়ালে পেনসিল দিয়ে লেখা ছিল, ‘আমাদের তিন জনের মৃত্যুর জন্য দায়ী রবীন্দ্রনাথ’। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছিল, কে এই রবীন্দ্রনাথ? কেনই বা তাঁর নাম লিখে গেলেন পরিবারের তিন সদস্য? ঘটনার তদন্তে নেমে মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যেই সেই রহস্যের অনেকটাই উন্মোচন করল হুগলি গ্রামীণ পুলিশ।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ডানকুনির বাসিন্দা উত্তম চাঁই প্রায় চার মাস আগে স্ত্রী রুপা ও মেয়ে অঙ্কিতাকে নিয়ে ধনিয়াখালির সোমসপুর দুলেপাড়ায় একটি বাড়ি ভাড়া নেন। পরিবারের কর্তা উত্তমের বয়স ৫২ বছর। তাঁর স্ত্রী রুপা ৪৫ বছরের এবং মেয়ে অঙ্কিতার বয়স ১৭ বছর।

শুক্রবার বেলা পর্যন্ত পরিবারের কাউকেই প্রতিবেশীরা দেখতে পাননি তাতেই তাঁদের সন্দেহ হয়। বাড়ির দরজাও ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। এরপর পলিশে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে দেখতে পায়, একটি ঘরের সিলিং ফ্যান থেকে তিন জনের দেহ ঝুলছে।

তবে ঘটনাস্থলে পাওয়া একটি লেখা তদন্তকারীদের সামনে আরও বড় প্রশ্ন তুলে দেয়। সবুজ দেওয়ালে পেনসিল দিয়ে রবীন্দ্রনাথ, রিঙ্কু, মেয়ে এবং জামাইয়ের কথা লেখা ছিল। কে বা কারা এই ব্যক্তিরা, তা জানতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে।

তদন্তে নেমে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়। পরে জানা যায়, উত্তমদের প্রতিবেশী রবীন্দ্রনাথ মুর্মু। যে বাড়িতে চাঁই পরিবার ভাড়া থাকতেন, তার মালিক মধুমিতা সিংহ রায়। মধুমিতার মেয়ে টিঙ্কু। পাশাপাশি মধুমিতার স্বামী জয় সিংহের নামও তদন্তে উঠে আসে। পরে রবীন্দ্রনাথ মুর্মু, মধুমিতা সিংহ রায়, টিঙ্কু এবং জয় সিংহকে পুলিশ গ্রেফতার করে।

তদন্তকারীদের দাবি, কয়েক মাস আগে মধুমিতার কাছ থেকে বাড়িটি কিনে নেওয়ার জন্য উত্তম চার লক্ষ টাকা অগ্রিম দিয়েছিলেন। প্রতিবেশীদের সঙ্গে চাঁই পরিবারের খুব বেশি মেলামেশা না থাকলেও পাশের বাড়ি তাঁরা রবীন্দ্রনাথদের বাড়িতে পানীয় জল আনতে যেতেন।

পুলিশ জানতে পেরেছে, গত ১৬ অগস্ট রবীন্দ্রনাথদের বাড়ি থেকে লক্ষাধিক টাকার সোনার গয়না চুরি যায় বলে অভিযোগ। সেই ঘটনায় উত্তমের দিকে সন্দেহ যায়। তদন্তে উঠে আসে, ২২ অগস্ট একটি গয়নার দোকানে গিয়ে উত্তম সোনা বিক্রি করেছিলেন। ওই টাকা থেকেই চার লক্ষ টাকা বাড়ির মালিককে দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।

অভিযোগ, এরপর উত্তমকে চুরির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে চাপ দেওয়া হয়। ধৃতদের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের সময় উত্তম গয়না চুরির কথা স্বীকার করেছিলেন। চুরি করা গয়না বিক্রি করে প্রায় আট লক্ষ টাকা পাওয়া গিয়েছিল বলেও তিনি জানিয়েছিলেন বলে দাবি। এরপর মধুমিতা তাঁদের বাড়ি ছেড়ে দিতে বলেন। একইসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিবারের তরফে চুরি যাওয়া গয়না ফেরতের দাবি করা হয়।

পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, এই চাপের মুখেই স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে উত্তম এগিয়ে যান। মৃত্যুর আগে দেওয়ালে রবীন্দ্রনাথদের নাম লিখে যাওয়ার পিছনেও ওই ঘটনার যোগ থাকতে পারে বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন।

তবে আত্মহত্যার ঘটনায় ধৃত চার জনের প্রত্যেকের ভূমিকা ঠিক কতটা, তা এখনও তদন্তাধীন। সোনা চুরির ঘটনা ছাড়াও পরিবারের এই চরম সিদ্ধান্তের পিছনে অন্য কোনও কারণ ছিল কি না, সেটিও পুলিশ খতিয়ে দেখছে। ধৃতদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা করা হয়েছে। শনিবার তাঁদের চুঁচুড়া আদালতে হাজির করানো হয়।


Share