Murder

রাখি পরানোর রাতেই নাতির হাতে খুন ব্যবসায়ী দাদু! ১২ ঘণ্টায় রহস্যভেদ, গ্রেফতার দুই যুবক

প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, অর্ণবকে খুনের ঘটনায় দুই যুবক জড়িত রয়েছে। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁদের গ্রেফতার করা হয়। খুনের নেপথ্যে কী কারণ ছিল এবং ঘটনায় পরিবারের আর কেউ জড়িত কি না, পুলিশ তা খতিয়ে দেখছে।

ব্যবসায়ী অর্ণব সেন।
নিজস্ব সংবাদদাতা, মালদহ
  • শেষ আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৬ ০৩:৩৯

মালদহে ব্যবসায়ী অর্ণব সেন খুনের ঘটনায় ১২ ঘণ্টার মধ্যেই রহস্যের কিনারা করল পুলিশ। ঘটনায় দুই যুবককে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতেরা হল শুভজিৎ ঘোষ এবং কৌশিক ঘোষ ওরফে পচা।

বিয়ে করেননি অর্ণব। নিজের বলতে ছিলেন বোন, ভাগ্নে এবং নাতি-নাতনিরা। কলকাতা থেকে মালদহে পৈতৃক বাড়িতে গেলেই তিনি পরিবারের সঙ্গে হইহই করে সময় কাটাতেন। বৃহস্পতিবারও অর্ণব ব্যবসার কাজে মালদহে গিয়েছিলেন। বাড়িতে নাতি-নাতনিদের হাতে রাখিও পরিয়েছিলেন। কিন্তু সেই রাতেই পরিবারের এক নাতির হাতেই তাঁকে খুন হতে হল। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, অর্ণবকে খুনের ঘটনায় দুই যুবক জড়িত রয়েছে। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁদের গ্রেফতার করা হয়। খুনের নেপথ্যে কী কারণ ছিল এবং ঘটনায় পরিবারের আর কেউ জড়িত কি না, পুলিশ তা খতিয়ে দেখছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ৬০ বছরের অর্ণব সেন হলুদের ব্যবসা করতেন। কলকাতায় থাকলেও তিনি মাঝেমধ্যে মালদহের পৈতৃক বাড়িতে যেতেন। বৃহস্পতিবারও ব্যবসায়ী মালদহে ফিরেছিলেন। ওই রাতেই শুভজিৎ ঘোষ এবং তার বন্ধু কৌশিক ঘোষ ওরফে পচা তাঁর বাড়িতে আসে। শুভজিৎ অর্ণবের দূর সম্পর্কের নাতি বলে জানিয়েছে পুলিশ। দুই যুবক দাদুর সঙ্গে গল্প করতে করতে চা খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। ইন্ডাকশনে চা বসিয়ে অর্ণব দু’জনকে চা খাওয়ান। অভিযোগ, চা খাওয়ার পরই শুভজিৎ দাদুর কাছে কয়েক লক্ষ টাকা দাবি করে। অর্ণব সেই টাকা দিতে রাজি হননি। এরপরই তাঁকে খুনের পরিকল্পনা করা হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান।

শুক্রবার সকালে মালদহ শহরের ২ নম্বর গভর্নমেন্ট কলোনি এলাকার একটি ত্রিতল বাড়ির একতলার ঘর থেকে অর্ণবের দেহ উদ্ধার হয়। তাঁর গলার কাছে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। খোলা অবস্থায় পড়েছিল আলমারিও। প্রথমে লুটের উদ্দেশ্যে খুনের সন্দেহ হলেও তদন্তে উঠে আসে অন্য তথ্য। ঘটনায় পুলিশ অর্ণবের দূর সম্পর্কের নাতি শুভজিৎ এবং তার বন্ধু কৌশিককে গ্রেফতার করেছে।

পুলিশ ঘরে ঢুকে দেখে, তখনও ইন্ডাকশন চালু রয়েছে। টেবিলের উপর চায়ের কষ লেগে থাকা দু’টি কাপ পড়ে রয়েছে। ঘরের জিনিসপত্রও এলোমেলো। ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি দেখে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা হয়, খুনের ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি জড়িত এবং নিহত ব্যবসায়ী অর্ণব সেনের পরিচিতই কেউ এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। শুরু হয় তদন্ত। অর্ণবের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। এর পর তদন্তকারীরা পরিবারের সদস্য এবং অর্ণবের পরিচিতদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। পাশাপাশি এলাকার বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজও খতিয়ে দেখা হয়। তদন্তের মাঝেই পুলিশ জানতে পারে, অর্ণবের মোবাইল ফোনটি পাওয়া যাচ্ছে না। ফোনটির লোকেশন ট্র্যাক করে তদন্তকারীরা দেখেন, সেটি ঘটনাস্থল থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে রয়েছে। সেই সূত্র ধরেই এগিয়ে পুলিশ দুই যুবককে গ্রেফতার করে। তাঁদের কাছ থেকে অর্ণবের মোবাইল ফোনও উদ্ধার হয়েছে।

পুলিশের দাবি, জেরায় ২২ বছরের দুই যুবক অপরাধের কথা স্বীকার করেছেন। তদন্তকারীদের কাছে তাঁরা জানান, অনলাইন গেমে আসক্তির কারণে তাঁদের বাজারে কয়েক লক্ষ টাকা দেনা হয়েছিল। সেই টাকা কী ভাবে শোধ করা যায়, তা নিয়ে তাঁরা চিন্তায় ছিলেন। তখনই শুভজিতের মাথায় আসে তাঁর ব্যবসায়ী দাদুর কথা। এরপর দু’জনে মিলে অর্ণবকে খুন করে টাকা হাতানোর ছক কষেছিলেন বলে পুলিশের দাবি।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ন'টা নাগাদ চা খাওয়া শেষ করে অর্ণব নাতি ও তাঁর বন্ধুকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “তোরা যা, এ বার ঘুমোতে যাব।” এরপর ব্যবসায়ী শোওয়ার ঘরে চলে যান। অভিযোগ, সেই সময়ই তাঁর উপর হামলা চালায় নাতি ও তার বন্ধু। প্রথমে বালিশ দিয়ে অর্ণবের মুখ চেপে ধরে শ্বাসরোধের চেষ্টা করা হয়। পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁকে কোপানো হয় বলে অভিযোগ। খুনের পরও প্রায় এক ঘণ্টা ধরে দুই যুবক বাড়ির বিভিন্ন জিনিসপত্র তল্লাশি করে। সেখান থেকে টাকা বা গয়না নিয়ে তারা পালিয়েছিল কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বিষয়টি জানতে পুলিশ ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

মালদহের পুলিশ সুপার অনুপম সিংহ জানিয়েছেন, ‘‘দুই অভিযুক্তই অনলাইন গেমে আসক্ত। প্রায় তিন লক্ষ টাকা ধার হয়েছিল একজনের। আর এক জনের এক লাখ টাকা দেনা হয়। ব্যবসায়ী দাদুকে খুন করে ওই টাকা শোধ করার ছক কষেছিল তাঁরা।’’


Share