Kolkata Wetland

পুলিশ-প্রশাসনকে তোয়াক্কা না করে পূর্ব কলকাতায় জলাভূমি ভরাট, নাজিরাবাদে অগ্নিকাণ্ডে মৃত ১৬, কাঠগড়ায় প্রশাসনিক ব্যর্থতা

নাজিরাবাদে অগ্নিকাণ্ডের পর স্থানীয়দের অভিযোগ, জলাভূমি ভরাট করে সেখানে ডেকরেটার সংস্থার একাধিক গুদাম ও মোমোর কারখানা তৈরি হয়েছে। খেয়াদহ হাইস্কুল থেকে উচ্ছেপোতা, নাজিরাবাদে জলাভূমি ভরাট করে বড়ো বড়ো গোডাউন তৈরী করা হচ্ছে।

প্রতীকী চিত্র।
নিজস্ব সংবাদদাতা, পূর্ব কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ ০৪:১৩

প্রায় প্রতিনিয়ত জলাভূমি ভরাটের ঘটনা সামনে আসছে। পুলিশ-প্রশাসনকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়েই প্রতিবছর পূর্ব কলকাতার জলাভূমি ভরাট করে বেআইনিভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে বহুতল। অভিযোগ উঠছে, রাজনৈতিক কর্মকর্তাদের একাংশের মদতেই কারখানা-গুদাম তৈরি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা লক্ষ লক্ষ টাকার মুনাফা লুটছেন। এই রকম একই ধরনের ঘটনায় রবিবার গভীর রাতে আনন্দপুরে একটি কারখানা ও সংলগ্ন গুদামে অগ্নিকাণ্ড হয়। গুদামে আগুন লেগে প্রাণ গেল আট জনের, নিখোঁজ অনেকেই। মৃতের পরিবারের পাশাপাশি স্থানীয়দের প্রশ্ন, ‘এত বড় ক্ষতির দায় কে নেবে? প্রশাসনের কেন সঠিক নজরদারি নেই?’

উল্লেখ্য, পূর্ব কলকাতার জলাভূমি রামসার সাইটগুলোর অন্যতম। অর্থাৎ, ১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারিতে ইরানের রামসারে হওয়া আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী, যে জলাভূমিগুলোর আন্তর্জাতিক গুরুত্ব রয়েছে, তাদেরই একটি পূর্ব কলকাতার জলাভূমি। আইন অনুযায়ী, জলাভূমিতে কংক্রিটের পরিকাঠামো, টিনের শেড, গোডাউন বা কারখানা নির্মিত হলেও সেই নির্মাণ ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি মালিকের বিরুদ্ধে জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে। তাকে রক্ষা করার জন্য কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশের পরেও বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে কতটা সঠিক পদক্ষেপ করা হয়েছে, সে প্রশ্ন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের একাংশের। এ রকম রামসার সাইটে কোনও স্থায়ী নির্মাণ সম্পূর্ণ বেআইনি। তবুও ইএম বাইপাস সংলগ্ন আনন্দপুর, নরেন্দ্রপুর, খেয়াদহ, বানতলা, ধাপা-মানপুর, বামনঘাটা, হাদিয়ার মতো তল্লাট জুড়ে জলাভূমিতে গজিয়ে উঠেছে বহু বেআইনি নির্মাণ এবং সে রকম নির্মাণ বন্ধ হয়নি।

রবিবারের রাতে নাজিরাবাদে অগ্নিকাণ্ডের পর পূর্ব কলকাতা জলাভূমিতে বেআইনি নির্মাণ নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছেন দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পুলিশ-প্রশাসন। পাশাপাশি অস্বস্তিতে পড়েছেন ‘ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ডস ম্যানেজমেন্ট অথরিটি’। প্রায় তিন বছর ধরে কলকাতা হাই কোর্টে চলা মামলার প্রেক্ষিতে বিচারপতি অমৃতা সিনহা পূর্ব কলকাতা জলাভূমিতে গড়ে ওঠা বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে দফায় দফায় নির্দেশ দেন। কিন্তু তার পরেও কখনও পরিকাঠামোর অভাব, কখনও লোকবলের অভাবের ‘অজুহাত’ দিয়ে নিজের দায় এড়াতে চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশ-প্রশাসন ও ওয়েটল্যান্ডস ম্যানেজমেন্ট অথরিটির বিরুদ্ধে এবং তার জন্য হাই কোর্টের তোপের মুখে পড়তে হয়েছে তাদের।

তবে বেআইনি নির্মাণ ভাঙা না হলেও হাই কোর্টের নির্দেশে সিইএসসি এবং রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থার তরফ থেকে প্রায় ৫৫০টি বেআইনি নির্মাণের বিদ্যুতের লাইন কেটে দেওয়া হয়। গত ৮ ডিসেম্বর বিচারপতি সিনহা বেআইনি হিসেবে চিহ্নিত ওই ৫৫০টি নির্মাণ সম্পর্কে ওয়েবসাইটে প্রচার এবং সংবাদপত্রে ঘোষণা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এত কিছুর পরেও পূর্ব কলকাতা জলাভূমি কী ভাবে ভরাট করে নির্মাণ হচ্ছে এবং পুরোনো নির্মাণ ভাঙা যাচ্ছে না কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। রবিবার গভীর রাতে নাজিরাবাদের ঘটনার পরে পূর্ব কলকাতার জলাভূমি নিয়ে হওয়া মামলার আইনজীবীরা পুরো বিষয়টি নিয়ে বিচারপতি সিনহার এজলাসে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান।

নাজিরাবাদে অগ্নিকাণ্ডের পর স্থানীয়দের অভিযোগ, জলাভূমি ভরাট করে সেখানে ডেকরেটার সংস্থার একাধিক গুদাম ও মোমোর কারখানা তৈরি হয়েছে। খেয়াদহ হাইস্কুল থেকে উচ্ছেপোতা, নাজিরাবাদে জলাভূমি ভরাট করে বড়ো বড়ো গোডাউন তৈরী করা হচ্ছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, ওই সব বেআইনি গোডাউন ও শেডের বিরুদ্ধে প্রশাসন তেমন ব্যবস্থা নেয়নি। যদিও এ ব্যাপারে স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধান, বিডিও এবং বিধায়কের কাছ থেকে কোন উত্তর মেলেনি।

পরিবেশকর্মীরা জানান, ওয়েটল্যান্ড পরিবেশকে তো রক্ষা করেই, সেই সঙ্গে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও বড়সড় দুর্ঘটনা থেকে শহরকে রক্ষা করারও ঢাল জলাভূমি। আর সেই জলাভূমিকেই ভরাট করে বেআইনি কারখানা, গোডাউন গড়ে তোলার ফল যে কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, নাজিরাবাদের ঘটনা তারই জ্বলন্ত প্রমাণ বলে পরিবেশকর্মী ও স্থানীয়দের একাংশ মনে করছেন।


Share