Amal Kumar Chowdhury

মহালয়ার ভোরের অট্টহাসি স্মৃতির পাতায়, প্রয়াত জীবনের নীরব যোদ্ধা অমলকুমার চৌধুরী

পৌষ সংক্রান্তির দিনে নিঃশব্দেই চলে গেলেন সেই অভিনেতা। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৬বছর। তাঁর প্রস্থান যেন শুধুই একজন অভিনেতার বিদায় নয়, বরং বাঙালির স্মৃতির এক সোনালি অধ্যায়ের পর্দা নামা।

প্রয়াত অভিনেতা অমলকুমার চৌধুরী।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৪৩

মহালয়ার ভোর মানেই বাঙালির ঘুম ভাঙে এক চেনা কাঁপুনিতে। ভোরের নরম আলো, দূরদর্শনের পর্দাআর সেই অট্টহাসি—যা শুনলেই বুকের ভিতর দিয়ে বয়ে যেত এক অদ্ভুত শিহরণ। সেই হাসির সঙ্গেই জড়িয়ে ছিল একটি মুখ, একটি চরিত্র—মহিষাসুর। আর সেই মহিষাসুর মানেই অভিনেতা অমলকুমার চৌধুরী। বাঙালির কাছে যিনি ‘অমল অসুর’। সেই শিহরণ জাগানো হাসি চিরতরে থেমে গেল। ইহলোক থেকে চিরবিদায় নিলেন বিশিষ্ট অভিনেতা।

নয়ের দশকে দূরদর্শনে প্রথম মহালয়ার সম্প্রচার শুরু হয়। তারপর থেকেই অমলকুমার চৌধুরীর অভিনয় আলাদা করে জায়গা করে নিয়েছিল দর্শকের মনে। মহিষাসুরের চরিত্রে তাঁর ভয়ংকর অথচ শক্তিশালী উপস্থিতি মহালয়ার আবহকে করে তুলত আরও গভীর, স্মরণীয়। অট্টহাসির সঙ্গে চোখেরদৃষ্টি, সংলাপ বলার ভঙ্গি—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মহালয়ার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

পৌষ সংক্রান্তির দিনে নিঃশব্দেই চলে গেলেন সেই অভিনেতা। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৬বছর। তাঁর প্রস্থান যেন শুধুই একজন অভিনেতার বিদায় নয়, বরং বাঙালির স্মৃতির এক সোনালি অধ্যায়ের পর্দা নামা।

অশোকনগরের এই মানুষটি এক সময় ছিলেন আলো আর ক্যামেরার কেন্দ্রবিন্দুতে। ঘটনাচক্রে অভিনয়ের জগতে পা রাখা, আর প্রথমবারই পর্দায় আবির্ভাব—মহিষাসুরের মতো শক্তিশালী একচরিত্রে। শুরু থেকেই তাঁর অভিনয় নজর কেড়েছিল দর্শকের। অসুরের রূপ ছাড়াও কখনও যমরাজ, কখনও আবার সেনাপতির চরিত্রে তাঁকে দেখা গিয়েছে পর্দায়— প্রতিটি ভূমিকায় ছিল আলাদা ছাপ।আলোর দুনিয়ার বাইরে অবশ্য তাঁর আরেকটি পরিচয় ছিল। পাড়ার অগণিত ছাত্রছাত্রীকে তিনি ভালোবেসে আঁকা শেখাতেন। শিল্পচর্চার হাত ধরেই গড়ে তুলতেন তাঁদের। অভিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে চলতএই নীরব সাধনা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় সবকিছু। ধীরে ধীরে তাঁর উপর থেকে সরে যেতে থাকে স্পটলাইট। এক সময় যে স্টুডিয়ো পাড়া তাঁকে ঘিরে ছিল ব্যস্ততায়, সেই জায়গাটাই যেন তাঁকেভুলে যেতে শুরু করে। তবু নীরবে, আড়ালে থেকেই তিনি বয়ে নিয়ে চলেছিলেন নিজের শিল্পীসত্তার আলো।

তবে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর সঙ্গী ছিল মূলত অভাব আর নিঃসঙ্গতা। একটা সময় যার জীবনে আলো ছিল সীমাহীন, তাঁকে টিনের চাল দেওয়া ছোট্ট ঘরের অল্প আলোতেই দিনরাত্রি কাটাতে হয়েছে। শরীরের অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করেও মাঝে মাঝে আঁকার কাজে মন ডুবিয়ে রাখতেন তিনি।সেটুকুই ছিল শেষ জীবনের প্রশ্বাস। নীরবে, কারও নজর ছাড়াই নিজের মতো করে লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন। আলো-ঝলমলে দিনের স্মৃতি যেন ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল বাস্তবের কঠিন অন্ধকারে।

আজও মহালয়ার ভোরে, চোখ বন্ধ করলে কানে ভেসে আসে সেই পরিচিত অট্টহাসি। সময় এগিয়েযায়, প্রজন্ম বদলায়, তবু কিছু কণ্ঠ, কিছু চরিত্র থেকে যায় স্মৃতির গভীরে। অমলকুমার চৌধুরীও ঠিক তেমনই—মহালয়ার ভোরে বাঙালির চিরচেনা কাঁপুনির নাম। তিনি রয়ে যাবেন তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে আপামোর বাঙালির হৃদয়ে।


Share