IPAC Case

অমীমাংসিত থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে! আইপ‍্যাক মামলায় কড়া পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের, কী হল শীর্ষ আদালতে?

রাজ্য সরকার এবং রাজ‍্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমারের আইনজীবী অভিষেক মনুসিংভি জানান যে, ইডির দায়ের করা ৩২ ধারার মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তাদের গুরুতর আপত্তি রয়েছে। যদি আদালত নোটিস জারি করেও, তবে রাজ্যের প্রাথমিক যে আপত্তি তা জানানোর অধিকার সংরক্ষণ করে তা করা উচিত।

প্রতীকী ছবি।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ০১:৩৬

এমনটা চলতে পারে না। এই মামলা অমীমাংসিত থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। আইপ‍্যাক মামলায় এমনই পর্যবেক্ষণ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালতের বক্তব‍্য, দেশের বিভিন্ন রাজ‍্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় রয়েছে। এমনটা হতে থাকলে অরাজকতা সৃষ্টি হতে পারে। তাই আদালত মামলটিকে গুরুত্ব সহকারে দেখবে।

গত ৮ জানুয়ারি আইপ‍্যাক-কান্ডের পরে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের হয়। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে সেই মামলাটি বিচারপতি প্রশান্তকুমার মিশ্র এবং বিচারপতি বিপুল মনুভাই পাঞ্চোলির বেঞ্চে দীর্ঘ শুনানি হয়। সুপ্রিম কোর্টের বক্তব‍্য, এই মামলটি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তদন্তে রাজ‍্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা হস্তক্ষেপ করেছে। শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ, কোনও অপরাধীরা নির্দিষ্ট রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার আড়ালে থেকে সুরক্ষা না পায়। তাই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন‍্য প্রতিটি সংস্থাকে স্বাধীন ভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার জন্য বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট এ ক্ষেত্রে মনে করেছে, মামলাটিতে বৃহত্তর প্রশ্ন জড়িত রয়েছে। যা অমীমাংসিত থাকলে পরবর্তীতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন দল ক্ষমতায় রয়েছে। সেই কারণে এক বা একাধিক রাজ্যে অরাজকতার পরিবেশ তৈরি হতে পারে বলেও পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

সুপ্রিম কোর্ট এটাও মনে করছে, কোনও কেন্দ্রীয় সংস্থার কোনও রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী কাজে হস্তক্ষেপ করার এক্তিয়ার নেই। কিন্তু যদি কোনও কেন্দ্রীয় সংস্থা সদ্ভাবনামূলক ভাবে কোনও গুরুতর অপরাধের তদন্ত করে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, দলীয় কার্যকলাপের আড়ালে সুরক্ষা নেওয়ার অজুহাতে সংস্থাগুলিকে তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ থেকে বিরত রাখা যায় কি না বলেও। তাই এটি একটি 'অত্যন্ত গুরুতর বিষয়' যা  আদালতের পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব‍্য করেছেন শীর্ষ আদালতের বিচারপতি।

মামলার শুনানিতে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রীয় সংস্থার কাজকে ধারাবাহিক ভাবে বাধা দেওয়া হচ্ছে। অতীতের প্রসঙ্গ টেনে তুষার মেহতা বলেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ‍্যায় কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির কাজে বাধা দেওয়ার জন্য এই ধরনের কর্মকাণ্ডে আগেও লিপ্ত হয়েছেন। তখন বিচারপতি মিশ্র প্রশ্ন করেন, "এটি কীভাবে গ্রহণযোগ্য?" সলিসিটর জেনারেল সেই উত্তরে বলেন, একটি ইডি এবং ব্যক্তিগত ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত একজন কর্মকর্তা যৌথভাবে মামলা দায়ের করেছেন। তিনি আরও বলেন, আরেকটি মামলা ইডি কর্তারা ব্যক্তিগত ক্ষমতায় দায়ের করেছেন।

তাঁর কথায়, "এখানে এমন প্রমাণ ছিল, যা থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে একটি কোম্পানির এবং একজন ব্যক্তির অফিসে কিছু আপত্তিকর নথি ও সামগ্রী রয়েছে। আর্থির তছরুপ প্রতিরোধ আইনের (পিএমএলএ) ১৭ ধারা অনুযায়ী প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করে ইডি-র আধিকারিকরা সেখানে যান। আমরা স্থানীয় পুলিশকেও জানিয়েছিলাম। মুখ্যমন্ত্রী রাজ‍্য পুলিশের ডিজি এবং বিপুল সংখ্যক পুলিশ বাহিনী-সহ সেখানে পৌঁছোন। এর পরে অফিসে জোর করে প্রবেশ করেন। তার পরেই ফাইল ও ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসগুলি নিয়ে যান মুখ‍্যমন্ত্রী। আমার মতে, এটা চুরি ছাড়া আর কিছুই নয়। যদি এই ধরনের আচরণকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তবে তা আধিকারিকদের নিরুৎসাহিত করা হবে। তাতে তাঁদের মনোবল ভেঙে যাবে।”

এ দিন সলিসিটর জেনারেল রাজ‍্য সরকার এবং সিবিআই-এর মধ্যে অতীতে একটি সংঘাতের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি আদালতকে জানান, বেআইনি চিচফান্ড মামলায় যখন সিবিআইয়ের আধিকারিকেরা তৎকালীন কলকাতা পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গেলে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ তাদের গ্রেফতার করেছিল। সেই পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার বর্তমানে রাজ্যের পুলিশ ডিজি হিসেবে কর্মরত। তিনি উল্লেখ করেন যে, সেই ঘটনার সময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতার সিবিআই অফিসের বাইরে ধর্নাও দিয়েছিলেন।

বৃহস্পতিবার সলিসিটর জেনারেল শীর্ষ আদালতকে জানান, গত সপ্তাহে কলকাতা হাইকোর্টকে ইডি আবেদনটি স্থগিত করতে হয়েছিল। কারণ সেদিন এজলাসে ব্যাপক হট্টগোল সৃষ্টি করা হয়েছিল। সলিসিটর জেনারেলের অভিযোগ, এই হট্টগোল রাজ‍্যের শাসকদল দলের আইনজীবী সেলের সদস্যেরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে সৃষ্টি করেছিলেন। হট্টোগোল করার জন‍্য সদস্যদের এজলাসে জড়ো হতে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ‍্যমে বার্তা পাঠানো হয়েছিল। সেই দিনের ঘটনার পরে গতকালের শুনানিতে বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের এজলাসে অবাঞ্ছিতদের ভিড় এড়াতে প্রশাসনিক নির্দেশ জারি করে কলকাতা হাই কোর্ট, তা-ও সলিসিটর জেনারেল সুপ্রিম কোর্টকে এ দিন বলেছেন।

এই পর্যায়ে বিচারপতি মিশ্র ইডির কাছে জানতে চান, "আপনারা সেখানে কেন গিয়েছিলেন?" সলিসিটর জেনারেল উত্তরে বলেন যে, এটি কয়লা পাচারকান্ডের আর্থিক দুর্নীতি তদন্তের সাথে সম্পর্কিত। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, আইপ্যাক বলে যে সংস্থার কর্ণধারের বাড়ি এবং কার্যালয়ে তল্লাশি চালানো হয়েছিল, তারা এই তল্লাশির বিরুদ্ধে কোনও আবেদন দায়ের করেনি। বিচারপতি মিশ্র বলেন, "এটি একটি গুরুতর বিষয়, আমরা নোটিস জারি করছি। আমরা এটি পরীক্ষা করতে চাই। এটি অত্যন্ত গুরুতর।"

শীর্ষ আদালত, অধীনে ইডির দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার, কলকাতা পুলিশ কমিশনার মনোজ কুমার বর্মা এবং ডেপুটি কমিশনার (দক্ষিণ) প্রিয়ব্রত রায়কে নোটিস দেওয়া হয়েছে। আদালত প্রতিপক্ষদের আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে হলফনামা দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে। আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছে। একই সঙ্গে ৮ জানুয়ারির ঘটনাস্থল এবং তার আশপাশের সিসি ক‍্যামেরার ফুটেজ এবং ডিভিআর সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আদালত পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের দ্বারা ইডি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা তিনটি এফআইআর-এর ভিত্তিতে শুরু হওয়া তদন্তের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে। অথাৎ সেই মামলার ভিত্তিতে কলকাতা পুলিশ এবং রাজ‍্য পুলিশ ইডি আধিকারিকের বিরুদ্ধে তদন্ত করা যাবে না।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী কপিল সিব্বল মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই আপত্তি তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, এই বিষয়টি হাই কোর্টেও শুনানি হতে পারে। তিনি জানান, আইপ্যাক তৃণমূলের ভোটকুশলী সংস্থা। তাদের অফিসে দলের গোপনীয় নির্বাচনী তথ্য সংরক্ষিত থাকে। সিব্বল প্রশ্ন, নির্বাচনের মুখে কেন এই তল্লাশি চালানো হল। তাঁর দাবি, মুখ্যমন্ত্রী শুধুমাত্র দলীয় তথ্য কিছু ফাইল এবং ইলেকট্রনিক্স সরঞ্জাম নিয়েছিলেন। তিনি তদন্তে কোনও বাধা সৃষ্টি করেননি। মুখ‍্যমন্ত্রী যদি ফাইল এবং ডিভাইস নিয়ে গিয়ে থাকেন তাহলে তাহলে ইডি যদি তল্লাশির ভিডিয়ো প্রমাণ পেশ করুক বলেও দাবি করেন তিনি।

রাজ্য সরকার এবং রাজ‍্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমারের আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি জানান যে, ইডির দায়ের করা ৩২ ধারার মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তাদের গুরুতর আপত্তি রয়েছে। যদি আদালত নোটিস জারি করেও, তবে রাজ্যের প্রাথমিক যে আপত্তি তা জানানোর অধিকার সংরক্ষণ করে তা করা উচিত।

অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি আরও বলেন, এটি 'ফোরাম শপিং'-এর একটি উদাহরণ।কারণ ইডি একই সাথে সুপ্রিম কোর্ট এবং কলকাতা হাই কোর্টে সমান্তরাল মামলা দায়ের করেছে। তবে, বিচারপতি মিশ্র ৯ই জানুয়ারি হাই কোর্টের বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের এজলাসে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা নিয়ে যথেষ্ঠ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সিংভি জানান যে তিনিও বেঞ্চের উদ্বেগের সাথে একমত, তবে যোগ করেন যে গতকাল হাই কোর্টে শুনানি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সিংভি বলেন, "শুধু একদিন কিছু হট্টোগোল হয়েছে। সেদিন আবেগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। তাই এটা ধরে নেওয়া যায় না যে একটা ঘটনার পরে সমস্ত শুনানি বন্ধ হয়ে যাবে।"

রাজ‍্যের আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি আরও বলেন যে, পঞ্চনামা অনুযায়ী এটি নথিভুক্ত আছে যে পুরো তল্লাশি শান্তিপূর্ণ ভাবে করা হয়েছিল। এর পরেই অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল এসভি রাজু বাধা দিয়ে বলেন, পঞ্চনামায় এ-ও নথিভুক্ত আছে যে মমতা কিছু সামগ্রী নিজের দখলে নিয়েছিলেন। কখন তল্লাশির হয়েছিল, আর কখন স্থানীয় পুলিশকে জানানো হয়েছে, তা নিয়ে সলিসিটর জেনারেলের বক্তব্যের জবাবে মনু সিঙ্ঘভি বলেন যে, “তল্লাশি অভিযান সকাল ছ'টায় শুরু হলেও, ১১টা ৩০ মিনিটে ইমেল করে পাঠানো হয়েছিল।”

অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি দাবি করেন, অনুমোদনহীন ব্যক্তিরা তাদের সামগ্রী দখলের চেষ্টা করছে। এমন খবর পেয়েই মুখ‍্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ‍্যায় সেখানে গিয়েছিলেন। তিনি আরও, বলেন ইডি কর্মকর্তারা প্রাথমিক ভাবে নিজেদের পরিচয় দিতে অস্বীকার করেছিলেন। মনু সিঙ্ঘভি আরোও জানান যে, মমতা বন্দোপাধ‍্যায়ের সঙ্গে পুলিশ কর্মীরা ছিলেন কারণ তিনি জেড প্লাস ক্যাটাগরির নিরাপত্তা পান।

এই মামলায় ইডিকে কলকাতা হাই কোর্টে পাঠানো উচিত বলে আদালতকে জানিয়েছ্ন কলকাতা পুলিশের কমিশনার মনোজকুমার বর্মা এবং ডেপুটি কমিশনার (দক্ষিণ) প্রিয়ব্রত রায়ের আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান।

ইডি কর্তাদের দায়ের করা আবেদনের শুনানিতে উপস্থিত হয়ে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল এসভি রাজু বলেন যে, স্বীকৃত বক্তব্য থেকেই বোঝা যায় যে অন্তত চুরির অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল আরও বলেন ঘটনাস্থলে ডাকাতির মতো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। কারণ সেখানে অস্ত্র নিয়ে পাঁচজনের বেশি ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।

অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল এই ঘটনায়  সিবিআই দ্বারা তদন্তের জন্য নির্দেশনার আবেদন জানান। তিনি রাজ্য পুলিশ কর্তৃক ইডি কর্তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা এফআইআরগুলির উপর স্থগিতাদেশেরও আবেদন করেন। সিবিআই দিয়ে তদন্ত করার নির্দেশ না দিলেও পুলিশের এফআইআরের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করা হয়েছে।


Share