Debraj Chakraborty

হোর্ডিংয়ে 'দেবরাজনীতি', নেপথ্যে সমান্তরাল ক্ষমতার সাম্রাজ্য! তোলাবাজি, জমি দখল, অর্থ পাচারের অভিযোগ ঘিরে ঘনাচ্ছে রহস্য

কেবল হোর্ডিং বা পোস্টারেই নয়, বাস্তবেও দলের অন্দরে সমান্তরাল ক্ষমতার কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন দেবরাজ এবং তাঁর ঘনিষ্ঠরা। তৃণমূলের অন্দরে তাঁরা ‘দেব-অনুগামী’ বলেই পরিচিত ছিলেন।

দেবরাজ চক্রবর্তী।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২৬ ১০:২৬

ভিআইপি রোডের কেষ্টপুর থেকে কৈখালি পর্যন্ত মাঝেমধ্যেই চোখে পড়ত একাধিক ব্যানার এবং হোর্ডিং। সেখানে দেবরাজ চক্রবর্তীর ছবি-সহ বড় করে লেখা থাকত ‘দেবরাজনীতি-তে বিশ্বাসী’।

বিগত সরকারের আমলে শাসকদলের কোনও নেতার পক্ষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি ছাড়া নিজের ছবি দিয়ে এ ধরনের প্রচার করা কার্যত অকল্পনীয় ছিল। অথচ দেবরাজের ক্ষেত্রে এই হোর্ডিং ঘিরে দলের তরফে কোনও আপত্তি বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপের খবর কখনও সামনে আসেনি। রাজনৈতিক মহলের মতে, দলীয় অন্দরে দেবরাজের প্রভাব ও দাপট কতটা ছিল, এই ঘটনাই তার স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।

কেবল হোর্ডিং বা পোস্টারেই নয়, বাস্তবেও দলের অন্দরে সমান্তরাল ক্ষমতার কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ দেবরাজ চক্রবর্তী এবং তাঁর ঘনিষ্ঠেরা। তৃণমূলের অন্দরে তাঁরা ‘দেব-অনুগামী’ বলেই পরিচিত ছিলেন। দলের একাংশের দাবি, এই শিবিরে ছিলেন বিধাননগর পুরনিগমের অন্তত এক ডজন কাউন্সিলর, পার্শ্ববর্তী দক্ষিণ দমদম পুরসভার কয়েক জন কাউন্সিলর, নিউটাউন সংলগ্ন তিনটি পঞ্চায়েতের অধিকাংশ সদস্য এবং এক প্রাক্তন বিধায়কও। তৃণমূলের অন্দরে গুঞ্জন, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতেই ওই প্রাক্তন বিধায়ক দেবরাজের ঘনিষ্ঠতা গ্রহণ করেছিলেন। অন্য দিকে, প্রাক্তন তৃণমূল কর্মী তথা বর্তমানে বিজেপি নেতা বিশ্বজিৎ বিশ্বাসের অভিযোগ, এই অনুগামীদের নিয়েই দেবরাজ একটি তোলাবাজ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দেবরাজের নাগাল পাওয়ার আগেই তোলাবাজি-সহ একাধিক অভিযোগে গ্রেফতার হন বিধাননগর পুরসভার কাউন্সিলর সুশোভন মণ্ডল ওরফে মাইকেল। তিনি দেবরাজের ঘনিষ্ঠ অনুগামীদের অন্যতম বলে পরিচিত। একইভাবে, দেবরাজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে তাঁর ঘনিষ্ঠদের নাম। অভিযোগ, এই অনুগামীদের মাধ্যমেই দেবরাজ পুরো সিন্ডিকেট পরিচালনা করতেন। এ দিকে, নির্মাণ ব্যবসায়ী অভিজিৎ সাহা গত ২২ মে বাগুইআটি থানায় দেবরাজের বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগেও বিধাননগর পুরনিগমের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলর মণীশ মুখোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

বিভিন্ন ওয়ার্ডে নিজেদের অনুগত কাউন্সিলরদের ব্যবহার করে প্রোমোটারদের নির্মাণকাজে বাধা সৃষ্টি করত এই সিন্ডিকেট। কাজ বন্ধ করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাঁদের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা আদায় করা হতো। এমনকী, টাকা দেওয়ার পরেও মিলত না কোনও রেহাই।

বিক্রির জন্য জমির খোঁজ পেলেই সক্রিয় হয়ে উঠত দেবরাজের সিন্ডিকেট। অভিযোগ, মালিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বাজারদরের তুলনায় অনেক কম দামে জমি কিনতে বাধ্য করা হত। শুধু তাই নয়, বেআইনিভাবে জমি দখলকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে দেবরাজের বিরুদ্ধে। জমি দখল মামলায় ঠিক একই সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘনিষ্ঠ কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন ডেপুটি কমিশনার শান্তনু সিংহ বিশ্বাস, জয় কামদার এবং সোনা পাপ্পু ওরফে বিশ্বজিৎ পোদ্দার। তবে এঁদের সঙ্গে কোনও যোগ রয়েছে কি না তা কী আদৌ খতিয়ে দেখবে পুলিশ? তা নিয়ে এখনও স্পষ্ট ভাবে পুলিশের কোনও সূত্র বলতে পারেনি।

দেবরাজকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তোলা সিন্ডিকেটের শিকড়ে পৌঁছোতে তদন্তকারীরা তাঁর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত একাধিক প্রাক্তন কাউন্সিলরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মণীশ মুখোপাধ্যায়, গোপাল বাগুই, মাইকেল ও বিনু মণ্ডল। পাশাপাশি তালিকায় রয়েছেন দেবরাজের ঘনিষ্ঠ রতন মৃধাও। পুলিশের সন্দেহ, দেবরাজ আত্মগোপনে থাকার সময় রতন তাঁর সঙ্গেই ছিলেন।

দেবরাজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে ‘ডিসি গ্লোবাল’ নামে একটি রহস্যময় সংস্থার নাম। জিএসটি নথি এবং দেবরাজের একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ছাড়া কার্যত এই সংস্থার অস্তিত্বের কোনও প্রমাণ মেলেনি। একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের বাগুইআটি শাখায় সংস্থার নামে একটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যেখানে জমা রয়েছে আড়াই লক্ষ টাকারও কম। সংস্থার ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে দেবরাজের তেঘড়িয়ার বাড়ির ঠিকানা। নথিপত্রে ডিসি গ্লোবালকে সাদা ও বিদেশি মার্বেলের সরবরাহকারী সংস্থা হিসেবে দেখানো হলেও, তদন্তে উঠে এসেছে ভিন্ন ছবি। বাগুইআটি, বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকা এবং দক্ষিণ দমদমের একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে পুলিশ জানতে পেরেছে, এই সংস্থার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। গোয়েন্দাদের সন্দেহ, ডিসি গ্লোবালের আড়ালেই বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচার করা হয়েছে। কারণ, বাস্তবে কোনও ব্যবসার অস্তিত্বের প্রমাণ না মিললেও সংস্থার নামে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা এবং ভিনরাজ্যেও একাধিক সম্পত্তি কেনা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

সিন্ডিকেট থেকে তোলা বিপুল অঙ্কের অর্থের হদিস পেতে তদন্তে নতুন সূত্র পেয়েছেন গোয়েন্দারা। তাঁদের নজরে এসেছে কেষ্টপুরের শুলংগুড়ির ঠিকানায় নথিভুক্ত একটি অর্থলগ্নি সংস্থা। পাশাপাশি, ছত্তীসগঢ়ের একটি পরিকাঠামো নির্মাণ সংস্থার সঙ্গেও দেবরাজের আর্থিক লেনদেনের তথ্য মিলেছে। ওই সংস্থা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে খনি, সড়ক নির্মাণ, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং জল জীবন মিশনের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করে। তদন্তকারীদের দাবি, এই দুই সংস্থার সঙ্গে দেবরাজের বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। সেই অর্থের উৎস, উদ্দেশ্য এবং লেনদেনের প্রকৃত কারণ কী, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ইতিমধ্যেই তল্লাশি চালিয়ে দেবরাজের একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সন্ধান পেয়েছেন তদন্তকারীরা। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসে ওই অ্যাকাউন্টগুলি থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ তোলা হয়েছে। সেই টাকার গতিপথ অনুসন্ধানেই এখন জোর দিচ্ছেন গোয়েন্দারা।

দেবরাজের স্ত্রী তথা প্রাক্তন বিধায়ক অদিতি মুন্সি ২০২২ সালে একটি সংস্থা গঠন করেন। রেজিস্টার অফ কোম্পানিজের নথি অনুযায়ী, সংস্থার ঘোষিত ব্যবসার মধ্যে রয়েছে মেলা, ক্রীড়া ও বিভিন্ন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন। পাশাপাশি, লটারিসংক্রান্ত ব্যবসার সঙ্গেও সংস্থার যোগ রয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ আছে। শ্যামনগর উদ্বাস্তু কলোনির ঠিকানায় নথিভুক্ত এই সংস্থার প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যকলাপ কী, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তদন্তকারী সংস্থার সন্দেহ, এই প্রতিষ্ঠানের আড়ালে সিন্ডিকেটের অর্থ বিনিয়োগ বা পাচারের মতো বেআইনি লেনদেন হয়ে থাকতে পারে।

তদন্তে যুক্ত এক পুলিশ আধিকারিকের দাবি, দেবরাজ ও তাঁর স্ত্রীর ঘোষিত আয়ের তুলনায় তাঁদের সম্পত্তির পরিমাণের অসঙ্গতি চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে, অদিতির নামে থাকা তিনটি বিলাসবহুল গাড়ির দিকে নজর দিয়েছেন তদন্তকারীরা, যার সম্মিলিত মূল্য এক কোটি টাকারও বেশি। তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই এই দুর্নীতির সম্ভাব্য মডেল দেখে বিস্মিত হচ্ছেন গোয়েন্দারা।


Share